এখন খবরকলকাতামহানগর

৫০ পাতার সুইসাইড নোটে থরে থরে সাজানো স্বপ্ন ভঙ্গের যন্ত্রনা আর তার জন্য দায়ীদের সরিয়ে দিয়ে নিজের আত্মহত্যা কাব্য

তিতলী সেনগুপ্ত: স্বামী স্ত্রী দুজনেই থাকবেন উচ্চ উপার্জনের দুনিয়ায়, দু’হাত ভরে তুলে আনবেন ঐশ্বর্য। জীবন হবে চূড়ান্ত বিলাসবহুল কিন্ত মসৃন। নিজের পাশাপাশি স্ত্রীরও সেই যোগ্যতা ছিল কিন্তু পেশা ছেড়ে স্ত্রী হয়ে গেলেন মামুলি গৃহবধূ আর শুধুই সন্তান প্রতিপালক একজন মা। জীবনের প্রথম স্বপ্ন ভঙ্গ। এই স্বপ্নভঙ্গ হয়ত পূরণ করে দিত বিদেশে গিয়ে উপার্জন, নিজেই পূর্ন করতে পারতেন দুজনের উপার্জন। সুযোগও এসেছিল দু’দুবার। কিন্তু দুবারই বাধা দিলেন সেই স্ত্রীই। দীর্ঘ লকডাউনে এই স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রনাই হয়ত কুরে কুরে খেয়েছিল আর সেখান থেকেই এক দীর্ঘ হনন কাব্য রচনা করেছিলেন অমিত আগরওয়াল। ৫০ পাতার সেই হনন কাব্যে অমিত লিখে গেছেন নিজেরও হত্যার কাহিনীকে। যা পড়ে হতবাক হয়ে গেছেন লালবাজারের গোয়েন্দারা।

সোমবার ভর সন্ধ্যায় কাঁকুরগাছির ৩২ নং রামকৃষ্ণ সমাধি রোডের ফ্ল্যাটের নৃশংস হত্যা কান্ডের পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে রহস্য। মাটিতে পড়ে রয়েছে শাশুড়ি ললিতা ঢনঢনিয়ার দেহ। তার পাশে পড়ে আছেন জামাই অমিত আগরওয়াল। অমিতের মৃতদেহের পাশ থেকে মিলেছে ইংরেজিতে টাইপ করা ৫০ পাতার একটি সুইসাইড নোট। যা পড়ে চক্ষু চড়কগাছ ফুলবাগান থানার পুলিশের। চিঠিটির পরতে পরতে রয়েছে অমিতের স্বপ্ন ভঙ্গের কাহিনী৷ স্ত্রী শিল্পী আগরওয়ালের সাথে প্রেম থেকে শুরু করে তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন সব লিখে গিয়েছেন অমিত৷ এমনকি খুনের আগে ঠান্ডা মাথায়, কিভাবে সে তার স্ত্রী শিল্পী সহ শ্বশুর, শাশুড়ী, শালাকে খুন করবেন সে সব আগে থেকে পরিকল্পনা করে সে চিঠিতে উল্লেখ করে গিয়েছেন।

পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট অমিত আগারওয়াল আদতে উত্তর পাড়ার বাসিন্দা৷ বিয়ের আগে ১৭ বছর প্রেমের সম্পর্ক ছিল কাঁকুরগাছির শিল্পী ঢনঢনিয়ার সাথে। শিল্পীও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট ছিলেন। এরপর দুজনে বিয়ে করে বেঙ্গালুরুতে থাকতে শুরু করেন। ১৪ বছরের বিবাহিত জীবন তাদের। তাদের একটি ১০ বছরের ছেলেও রয়েছে। ছেলে হওয়ার পর থেকেই তাদের সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়। শিল্পী চেয়েছিল চাকরি ছেড়ে তাঁর পুরো সময়টা ছেলেকে দেবে। সে মতো চাকরি ছেড়েই দিয়েছিল শিল্পী। অন্যদিকে, ছেলে হওয়ার পর তাকে সুন্দরভাবে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছিল অমিত। বেঙ্গালুরু এমনিতেই খুব দামি শহর। ফলে স্বাভাবিকভাবে ছেলেকে একটা স্বাচ্ছন্দ্য জীবন দিতে চেয়েছিল সে। অমিত ভেবেছিল দুজনে চাকরি করলে হয়তো সে ইচ্ছা পূরণ হবে। কিন্তু বাধ সাধলো শিল্পীর চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত। এমনকি অমিতের দু’বার বিদেশ থেকে চাকরির সুযোগ আসলেও তাকে যেতে দেয়নি তার স্ত্রী। দ্বিতীয়বার ফের চোখের সামনে স্বপ্ন ভাঙতে দেখে অমিত।

এখান থেকেই মূলতঃ তাদের সম্পর্কে চিড় ধরা শুরু। এরপর দিন দিন তাদের সম্পর্ক আরও খারাপ হতে থাকে। ছেলে হওয়ার পর স্ত্রীর সাথে আয়ার মতো ব্যবহার শুরু করেন তিনি। এভাবে সম্পর্কের টানাপোড়েনের জেরে একসময় স্ত্রী শিল্পী ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেন। সেক্ষেত্রে শিল্পীর মা-বাবা অর্থাৎ অমিতের শ্বশুর – শাশুড়ি, শালা তার এই সিদ্ধান্তে মদত দেয়। সেখান থেকেই তাদের ওপর একপ্রকার চাপা ক্ষোভ জন্মায়। গত দু’বছর যাবত ডিভোর্সের মামলা চলছে অমিত-শিল্পীর৷ এরপর থেকে বেঙ্গালুরুর হোয়াইটফিল্ড থানা এলাকার একটি আবাসনে ছেলেকে নিয়ে আলাদা থাকতে শুরু করে শিল্পী। কোর্টের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অমিতকে ছেলের সাথে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি৷ বাবা হিসেবে যে সময়টা ছেলের সাথে কাটানোর কথা, আইনি জটিলতায় সেগুলি থেকে বঞ্চিত হওয়ায় মনে মনে শিল্পী আর তার পরিবারের ওপর ক্ষোভে ফুঁসতে থাকে অমিত৷ সেই ক্ষোভই দিনে দিনে হিংসায় পরিণত হয়েছে।

সোমবার অমিতের মৃতদেহের পাশ থেকে তার ব্যবহৃত একটি ল্যাপটপ ব্যাগ উদ্ধার করে ফুলবাগান থানার পুলিস। ব্যাগের ভিতর ল্যাপটপের পাশাপাশি মিলেছে একটি অব্যবহৃত ম্যাগাজিনও। অমিতের ল্যাপটপ ঘেঁটে পুলিশ জানতে পেরেছে, ২ মাসের লক ডাউনে নিজের ল্যাপটপে অমিত একটানা আগ্নেয়াস্ত্র এবং বুলেট নিয়ে বিস্তারিত পড়াশোনা করে। কীভাবে পিস্তলে বুলেট ভরতে হয়, কীভাবে হ্যামার প্রেস করতে হয়, কীভাবে ট্রিগার করতে হয়, গুগল ও ইউটিউব ঘেঁটে এসব নিয়েই রাতদিন পড়াশোনা করেছে অমিত। তারপর নিজের কিছু ক্লায়েন্টের থেকে নাম্বার জোগাড় করেই অমিত আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করেছে বলে মনে করছে পুলিশ। ম্যাগাজিনটি দেখে পুলিশের অনুমান শাশুড়ির পর শ্বশুরই ছিল অমিতের টার্গেট৷ কিন্তু চিঠিতে লেখা তার ছক অনুযায়ী এখানেই টার্গেট মিস হয়ে যায়।

মূলতঃ সুইসাইড নোট পড়েই পুলিশ জানতে পারেন যে অমিত কলকাতায় আসার এক দিন আগে অর্থাৎ শনিবার বেঙ্গালুরুতে স্ত্রী শিল্পীকে শ্বাসরোধ করে খুন করে এসেছেন। বিষয়টি জানার পর ফুলবাগান থানার পুলিশের সাথে বেঙ্গালুরুর হোয়াইটফিল্ড থানায় যোগাযোগ করা হয়। এরপর তারা শিল্পীর বাড়িতে পৌঁছে শিল্পীর দেহ উদ্ধার করা হয়। সেই সময় তাঁর দেহে পচন ধরতে শুরু করেছে। বেঙ্গালুরু পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা আগে স্ত্রীকে শ্বাসরোধ করে খুন করেছেন তার স্বামী অমিত আগরওয়াল৷

বেঙ্গালুরু পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার বিকেলে হোয়াইটফিল্ড এলাকায় শিল্পীর ফ্ল্যাটে যায় অমিত। সেখানে অমিতকে দেখে প্রথমে ঢুকতে দেননি শিল্পী। জোর করে ঢোকে অমিত। দুজনের মধ্যে বচসা হয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বচসা শুনতে পান ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীরা। গত কয়েকদিন যাবত মাঝে মধ্যেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝামেলা হত বলে এদিন তাঁরা আর কিছু সন্দেহ করেননি। ছেলে সেইসময় ফ্ল্যাটে ছিল না। বচসা চলাকালীনই ফাঁকা ফ্ল্যাটে শ্বাসরোধ করে শিল্পীকে খুন করে অমিত। তবে খুনের আগে যে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়েছিল তা ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা দোমড়ানো বাসন, ভাঙা টব দেখেই স্পষ্ট হয়েছে পুলিশ।

এরপর ছেলে বাড়ি ফেরার আগেই তাকে টিউশন থেকে নিতে যায় অমিত। সে সময় তাকে জানায় যে মা তার কলকাতায় গিয়েছে। একথা বলে শনিবার রাতে ছেলেকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যায় অমিত রবিবারও তাকে নিজের কাছেই রাখে। এরপর সোমবার সকালের বিমানে ছেলেকে নিয়ে কলকাতায় আসে সে। জানা গিয়েছে, সোমবার বিমানবন্দর থেকে বেরনোর পর ছেলেকে নিয়ে দমদমে ভাইয়ের বাড়ি যায় অমিত। সেখান থেকে ফের সকাল ১০টা নাগাদ ভাইয়ের কাছে ছেলেকে রেখে,সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর বিকেল ৫টা নাগাদ ফুলবাগানে শ্বশুরবাড়িতে আসে সে। বাড়িতে ঢুকে বসার ঘরে বসে। সেখানে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি থেকে ঝগড়ায় পৌছিলে জামাই অমিত আচমকা শাশুড়িকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। কিন্তু বন্দুক চালাতে পারদর্শী না হওয়ায় প্রথম গুলিটি আটকে যায়৷ এরপর সোফা থেকে উঠে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে খুব কাছ থেকে শাশুড়ি ললিতা দেবীর কপালে গুলি করে৷ প্রাণের ঝুঁকি আছে বুঝতে পেরে সে সময় শ্বশুর সুভাস ঢনঢনিয়া ও বাড়ির এক পরিচারিকা কোনো ক্রমে ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে থেকে কোনোরকমে দরজা আটকে পাশের ফ্ল্যাটে গিয়ে পুলিশকে ফোন করেন খবর পেয়ে ফুলবাগান থানার পুলিশ আসতে আসতে ততক্ষণে সব শেষ। মাটিতে পড়ে রয়েছে দুটি নিথর দেহ। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেঝে৷ পাশে পড়ে রয়েছে একটি ৫০ পাতার সুসাইড নোট। অমিতের সুইসাইড নোট ও ল্যাপটপ ব্যাগটি বাজেয়াপ্ত করে পুলিশ।

তবে অমিতের চিঠিতে খুনের লিস্টে শুধুমাত্র যে স্ত্রী ও শ্বশুর-শাশুড়ি ছিলেন তা কিন্তু নয়, হেড লিস্টে ছিল নাম ছিল শিল্পীর ভাই বিনীত ঢনঢনিয়ার। অর্থাৎ শিল্পীর ওপর ভালোবাসা দিন দিন এতটাই ঘৃণায় পরিণত হয়েছিল যে গোটা পরিবারকে একসাথে শেষ করে দেওয়ার পণ করেছিল অমিত আগরওয়াল। এবিষয়ে শিল্পীর ভাই বিনীত ঢনঢনিয়া জানিয়েছেন, তিনি কর্মসূত্রে গুরুগ্রামে থাকেন। রবিবার রাতে তাঁকে কলকাতায় আসার জন্য বার বার ফোন করেন অমিত। বারংবার বলেন খুন জরুরী প্রয়োজন৷ অন্তত মিনিট ১৫-র জন্য রামকৃষ্ণ সমাধি রোডের ফ্ল্যাটে আসার জন্য জোর করা হয় তাঁকে। বিনীত ঢনঢনিয়ার দাবি, শিল্পীকে শেষ করার পর অমিতের পরবর্তী টার্গেট ছিলেন মা, বাবা ও তিনি। কারণ অমিতের সুইসাইড নোটে যাদের নাম লেখা ছিল, তাঁরা সবাইকে একদিনেই খুন করতে চেয়েছিল সে। শিল্পীর গোটা পরিবারকে একদিনে একসঙ্গে শেষ করাই ছিল অমিতের উদ্দেশ্য।

সোমবার কলকাতায় আসার পর ছেলেকে দমদমে ভাইয়ের বাড়িতে রেখে অমিত সকাল ১০ টা নাগাদ দরকারি কাজের নামে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান এবং তিনি শ্বশুরবাড়ি যান ৫ টা নাগাদ৷ অর্থাৎ মাঝে প্রায় ৭ ঘন্টার ব্যবধান। মাঝের ৭ ঘন্টা অমিত কোথায় গিয়েছিলেন? আগ্নেয়াস্ত্রটাই বা তাকে কে জোগান দিয়েছিল এইসমস্তটাই এখন মস্তবড় ধোঁয়াশা। অমিতের মোবাইল ল্যাপটপ ঘেটে বর্তমানে সেটাই জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। তবে গোটা ঘটনায় জীবনে চরম স্বপ্নভঙ্গ, ভালোবাসার মানুষের দিন দিন বদলে যাওয়া, উচ্চাকাঙ্খা, সন্তানস্নেহ থেকে বঞ্চিত হওয়া প্রভৃতির কারণে দিন দিন অমিতের অভিমানের পাহাড় জমতে জমতে নৃশংসতায় পরিণত হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
Live Corona Update
error: Content is protected !!
Close
Close