জীর্ণ মন্দিরের জার্নালজীর্ণ মন্দিরের জার্নালসাহিত্য

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল – ৫৩

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল– ৫৩
গোপীনাথ মন্দির, দাসপুর (দাসপুর- ১)
চিন্ময় দাশ






মন্দিরের দেশ মেদিনীপুর জেলার দাসপুর থানা। এক সময় অপরূপ ভাস্কর্য আর অলঙ্করণ নিয়ে কত যে মন্দির গড়ে উঠেছিল, এই থানার গ্রামে গ্রামে, তার ইয়ত্বা নাই। মহাকালের সম্মার্জনীর আঘাত আর উদাসীন মানুষের অবহেলা সয়েও, যে ক’টি মন্দির এখনও কোন রকমে টিকে আছে, আজও শিল্পসুষমার টানে শিল্পরসিকরা যেসব মন্দির প্রাঙ্গণে ছুটে ছুটে যান, তারই একটি আছে দাসপুর থানার সদর দাসপুর গ্রামে।


আছে বলা হল বটে, আদৌ ঠিক নাই মন্দিরটি। থাকবে কী করে? সেবাইত পরিবার সব ছেড়ে চলে গিয়েছে, সে আজ কতদিন হল। দেবতার বিগ্রহও নাই মন্দিরে। তাই আদর করে না কেউ। অনাদরে-অবহেলায়, রৌদ্রে-ঝড়ে, অবাধে বেড়ে চলা গাছপালার শেকড়ে-বাকড়ে আজ ভারী জরাজীর্ণ দশা মন্দিরটির। শ্যাওলা ধরা ক্ষয়াটে ইট, মাকড়সার জাল, ছুঁচো-ইঁদুর, চামচিকে-বাদুড়, সরীসৃপের ফেলে যাওয়া খোলস– এত সব অতিক্রম করে ভেতরে ঢোকা বড় সহজ কাজ নয়।
মন্দিরে ঢোকার চেয়ে, এ মন্দিরের ইতিহাসের ভেতর ঢুকে পড়া অনেক সহজ। প্রথমে সে কাজটাই সেরে নেওয়া যাক বরং।
দাসপুর এবং তার প্রাচীন সমৃদ্ধির কথা উঠলে, প্রথমেই আসে চেতুয়া-বরদার রাজা শোভা সিংহ আর তাঁর এক পত্তনীদার বঙ্গরাম চৌধুরীর নাম।




গঙ্গার পশ্চিম তীরে বিশাল রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন শোভা সিংহ। বেশ কয়েকজন পত্তনিদার ছিল তাঁর। বঙ্গরাম তাঁদের মধ্যে অন্যতমই ছিলেন না, শ্রেষ্ঠও ছিলেন। প্রজাকল্যাণে নানান উদ্যোগ ছিল তাঁর। রাস্তাঘাট সংস্কার ও নির্মাণ, নদীবাঁধ সংস্কার করে বন্যা রোধ, সেচ এবং নিকাশির সুবিধার জন্য খাল সংস্কার ও খনন ইত্যাদি বহু কাজ করেছিলেন বঙ্গরাম। বঙ্গরামের সময়কাল সপ্তদশ শতাব্দীর সাতের দশক থেকে অষ্টাদশ শতকের প্রথম শতক পর্যন্ত।
সেসময় সমগ্র এলাকা জুড়ে রেশম শিল্পের ভারী রমরমা। রেশম সহ অন্যান্য গ্রামীণ শিল্পেরও উন্নতির জন্য প্রভূত ব্যবস্থা নিয়েছিলেন বঙ্গরাম।





বঙ্গরামের তৎপরতায় এলাকার অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়েছে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জনসংখ্যা। বিভিন্ন গ্রামীণ শিল্প ও তার সাথে যুক্ত মানুষেরা এসে হাজির হয়েছিল চেতুয়া জুড়ে। কারা এসেছিলেন? একটি তালিকা করে দেখে নেওয়া যেতে পারে। ১. দেবসেবার গন্ধদ্রব্য প্রস্তুতকারী গন্ধবণিক। ২. শোলা শিল্পের দক্ষ মালাকার। ৩. তাঁতবস্ত্র বয়নের দক্ষ তন্তুবায়। ৪. তুঁতশিল্পের দক্ষ কিছু মুসলমান পরিবার। ৫. রেশমবস্ত্র বয়নের রেশমশিল্পী। ৬. লোহা-কাঁসা-পিতলের দক্ষ কর্মকার। ৭. মৃৎশিল্পের দক্ষ কুম্ভকার। কে আসেনি সেসময়?






তবে আলাদা করে বলতে হয়, দুই সম্প্রদায়ের কথা– ১, স্বর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যে দক্ষ একদল স্বর্ণবণিক। এবং ২. মন্দির-নির্মাতা সূত্রধর সম্প্রদায়। সূত্রধররা টেরাকোটা ফলক তৈরী, আর কাঠখোদাই কাজেও পারদর্শী ছিলেন। এই দুই সম্প্রদায় তাঁদের কীর্তির বহু স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন চেতুয়া তথা আজকের দাসপুর থানায়।
বঙ্গরামের বসত ছিল দাসপুর গ্রামে। তাঁর সময় থেকেই চেতুয়া পরগনায় দাসপুরই প্রধান গঞ্জ হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। এই গ্রামের সিংহ, সেন ইত্যাদি পদবীর সুবর্ণবণিক এবং নন্দী, পাল ইত্যাদি তিলি সম্প্রদায়ের তন্তুবায়রা খুব ধনী হয়ে উঠেছিল। দাসপুর গ্রামে এঁদের প্রাচীন বা ভগ্ন অট্টালিকাগুলির চিহ্ন আজও দেখা যায়। বঙ্গরাম নিজের জন্য গড়খাই দিয়ে বাস্তু, আর তার ভিতর শ্যামচাঁদ জীউর একটি একরত্ন মন্দির প্রতিষ্ঠা (ইং ১৬৯৯ সাল ) করেছিলেন।
গ্রামের সুবর্ণবণিক আর তন্তুবায়রা অনেকগুলি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিল এই গ্রামে। তার ভিতর সিংহদের একটি মন্দির ছিল সকলের সেরা। গরিমা ছিল যেমন তার গড়নে, তেমনই তার টেরাকোটা সজ্জায়। এই মন্দিরটি নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা।


সুবর্ণবণিক সিংহরা দাসপুরে এসেছিলেন ওডিশা থেকে, ইংরেজ আগমণের অর্ধশতাব্দী আগে। বঙ্গরামের গড়বাড়ি থেকে অদূরেই বাস করত পরিবারটি। ১৭১৬ সালে কুলদেবতা গোপীনাথজীউর জন্য এক-রত্ন রীতির মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন তাঁরা। পরবর্তী কালে সিংহ পরিবারটি দাসপুর ছেড়ে কলকাতা চলে গিয়েছেন। তখন থেকে মন্দিরটি পরিত্যক্ত ও জীর্ণতার শিকার।
পূর্বমুখী সৌধে ইমারতি থাম আর দরুণ খিলানে তিনটি দ্বারপথের অলিন্দ। দক্ষিণ এবং পশ্চিমে আরও দুটি অলিন্দ আছে, তবে সেগুলি আবৃত। গর্ভগৃহে একটিই দ্বারপথ। মাথায় বিষ্ণুপুরী ঘরানার চালা ছাউনি। ছাউনির মাথায় একটিই রত্ন, সেটি পশ্চিমের দেওয়াল ঘেঁষে স্থাপিত। এগুলিকে ‘আলগোছ টুঙ্গি’ মন্দির নামে অভিহিত করা হয়। দাসপুর এলাকায় এই রীতির আরও কয়েকটি মন্দির আছে।





সামনের দেওয়াল আর চারটি স্তম্ভ টেরাকোটা ফলক দিয়ে মোড়া। ১. সামাজিক বিষয়ের ফলকের মধ্যে– পাদপীঠের লাগোয়া দেওয়াল আর স্তম্ভের গায়ে আছে ঝাম্পানে চড়া তামাকু সেবনরত জমিদারবাবু, বন্দুকধারী রক্ষী সহ নীলকর সাহেব, হরিণ শিকার, হার্মাদ রণতরী, নৌযুদ্ধের দৃশ্য ইত্যাদি। ২. তিনটি খিলানের মাথায় শিবলিঙ্গ সহ প্রতিকৃতি দেউলের সারি। ৩. তিনটি বড় প্রস্থ, কার্ণিশের নীচের সারি এবং কোণাচের গায়ের ২টি করে সারিতে অনেক ফলক। সেগুলিতে রামায়ণ-কথা, পুরাণ, কৃষ্ণলীলা থেকে রাম-রাবণের যুদ্ধ, কালীয় দমন, দধিমন্থন, ননীচুরি, গোপিনীদের বস্ত্রহরণ, বৈষ্ণবদের সংকীর্তন দৃশ্য ইত্যাদি ফলক দেখা যায়।





তাছাড়াও, গর্ভগৃহে পিছনের দেওয়ালে পঙ্খের রঙ্গীন কাজ এবং দরজার কপাটে কাঠ-খোদাই কাজগুলিও চেয়ে দেখবার মত।তবে মন্দিরটি দীর্ঘকাল বিগ্রহহীন ও পরিত্যক্ত। জীর্ণ হতে হতে সৌধটি এখন মৃত্যুলোকের পথিক।
বন্যা কিংবা কোনও ভূমিকম্পের প্রকোপে মন্দিরটি পশ্চিম দিকে কয়েক ডিগ্রী হেলে গিয়েছে, দেখা যায়।
ঋণ-স্বীকার : শ্রী ত্রিপুরা বসু এবং শ্রী সুগত পাইন, উভয়েই গবেষক ও লেখক — দাসপুর।
যাওয়া-আসা : দ.-পূ. রেলপথের হাওড়া-খড়গপুর লাইনে পাঁশকুড়া স্টেশন। সেখান থেকে উত্তরে ঘাটালগামী রাস্তায় দাসপুর। বাজার থেকে ১ কিমি পূর্বে সিংহদের মন্দির।]


বিজ্ঞাপন
Live Corona Update
error: Content is protected !!
Close
Close