সাহিত্যজীর্ণ মন্দিরের জার্নাল

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল – ৫৪

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল– ৫৪
                  শীতলা-মনসা মন্দির                         জোত কেশব (দাসপুর- ১)
চিন্ময় দাশ

” আয়ুরস্মিন বিদ্যতে অনেন বা আয়ুর্বিন্দতীত্যায়ুর্বেদ “। যাতে বা যার দ্বারা আয়ু লাভ করা যায়, তা-ই হোল আয়ুর্বেদ। তবে, এই শাস্ত্রটি কোন বেদ-এর অন্তর্গত, মতভেদ আছে তা নিয়ে। চরণব্যূহ বলেছেন– আয়ুর্বেদ হল ঋগ্বেদ-এর উপবেদ। এদিকে মহান ঋষি সুশ্রুত বলেছেন– আয়ুর্বেদ অথর্ব বেদের উপাঙ্গ। সেসকল বিতর্ক থাক। আমরা জানি, হাজার হাজার বছর যাবৎ ভারতবর্ষে আয়ুর্বেদের চর্চা এবং প্রয়োগ হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান আর চিকিৎসা শাস্ত্রের উদ্ভব পর্যন্ত, আয়ুর্বেদই রোগ নিরাময়ের নিদান দিয়েছে। অতীতে আয়ুর্বেদই ছিল চিকিৎসার উত্তম মাধ্যম।
মন্দিরের আলোচনার সূত্রপাত আয়ুর্বেদ দিয়ে কেন– এ প্রশ্ন ওঠার আগে, আমরা বলে নিই– আমাদের আজকের আলোচ্য এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন এক লব্ধপ্রতিষ্ঠ আয়ুর্বেদ চিকিৎসক। মাত্রই সোয়া একশ’ বছর আগে।


উনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষ পর্ব তখন। চেতুয়া পরগণার জোত কেশব (জে.এল. নং– ১৫৯) গ্রামে চক্রবর্তী পদবীর একটি পরিবারের বাস ছিল। এঁরা গৌড়াদ্যবৈদিক শ্ৰেণীর ব্রাহ্মণ। যজন-যাজনের পাশাপাশি আয়ুর্বেদ চিকিৎসাই ছিল এঁদের পারিবারিক বৃত্তি। সেই পরিবারে বৈদ্য বৈকুন্ঠ চক্রবর্তীর পুত্র শ্রীরাম চক্রবর্তী ‘বৈদ্যাচার্য্য ‘ হিসাবে খ্যাত হয়েছিলেন। বিংশ শতাব্দীর একেবারে সূচনায় খ্যাতি যেমন বেড়েছিল, দু’হাতে অর্থোপার্জনও করছিলেন শ্রীরাম। সেই অর্থে পরিবারের বাস্তুর ভিতরেই একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। একটি প্রতিষ্ঠা-লিপি আছে মন্দিরে। তা থেকে দেখা যায় ইং ১৯০২ সালে মন্দিরটি স্থাপিত হয়েছিল।


সেসময়েও কলেরা-বসন্তের প্রাদুর্ভাব ছিল মহামারীর মত। নদী-নালার দেশ হিসাবে সাপের উপদ্রবও ছিল খুব। বোধকরি, সেকারণেই দুই লৌকিক দেবীর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মন্দিরে। কোন পৌরাণিক দেব-দেবী নয়।
দাসপুর থানা যেমন মন্দির নির্মাণে দক্ষ সূত্রধর সম্প্রদায়ের বাসভূমি ছিল, তেমনই ছিল মন্দিরের দেশ। রূপনারায়ণ, শিলাবতী, কাঁসাই প্রভৃতি নদ-নদীর জলধারায় পুষ্ট এই থানা। কৃষিজ সম্পদ এই থানার অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছিল। এর সাথে ছিল রেশমশিল্প, নীল চাষ এবং হাজারো হস্তশিল্প। এসবের সুবাদে বহু ধনী পরিবারের উদ্ভব হয়েছিল সারা থানা জুড়ে। অজস্র মন্দির গড়ে উঠেছিল তাদের হাতে।
মুখ্যত ৪টি রীতির মন্দির দেখা যায় এই থানায়– দালান, শিখর দেউল, রত্ন এবং চালা। বৈদ্যাচার্য্য মশাই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন শিখর-দেউল রীতিতে। তবে একটু সংক্ষিপ্ত আকারে।


শিখর দেউল রীতির মন্দির বাংলায় এসেছিল মুখ্যত কলিঙ্গ প্রদেশ থেকে। সেখানে আদর্শ এই রীতির একটি শিখর মন্দিরের মোট ৫টি অংশ– পিছন দিক থেকে সেগুলি হোল– বিমান বা মূল মন্দির (যার ভিতরে থাকে গর্ভগৃহ এবং দেবতার আসন), অন্তরাল, জগমোহন, ভোগমন্ডপ এবং নাটমন্দির। পুরীর জগন্নাথ মন্দির এই রীতিতে নির্মিত। তবে বাংলা তথা মেদিনীপুর জেলায় আদর্শ শিখর মন্দিরের সংখ্যা বেশি নয়। অধিকাংশই সংক্ষিপ্ত আকারে নির্মিত হয়েছে।
চক্রবর্তীদের এই মন্দির সংক্ষিপ্ত আকারেই নির্মিত। সামনে জগমোহন এবং পিছনে বিমান। বিমানটি বর্গাকার– দৈর্ঘ্য প্রস্থ ১৩ ফুট হিসাবে। জগমোহন আয়তাকার– দৈর্ঘ্য ১৬ ফুট, প্রস্থ সাড়ে ৭ ফুট। মন্দিরের উচ্চতা ৪৫ ফুট।


কলিঙ্গ শৈলীর দুটি বৈশিষ্ট আছে এই মন্দিরে। বিমানটিতে সপ্ত-রথ বিভাজন করা। আর, জগমোহনের গন্ডী (মাথার ছাউনি অংশ) ভূমির সমান্তরালে পীঢ়া রীতিতে পঞ্চদশ পীঢ়ায় ভাগ করা হয়েছে।
সামনে জগমোহন অংশে খিলান-রীতির তিনটি দ্বারপথ। খিলানগুলি দরুণ-রীতির আর স্তম্ভগুলি কলাগেছ্যা রীতির ৮টি করে থামের গুচ্ছ। উত্তর এবং দক্ষিণে দুটি অতিরিক্ত দ্বার আছে। নির্মিত হয়েছে ‘প্রতিকৃতি জগমোহন’ হিসাবে। জগমোহনের সিলিং হয়েছে টানা-খিলান করে। উল্লেখ করবার বিষয় হল– বিমান কিংবা এর গর্ভগৃহটি চতুর্ভুজ হলেও, এর সিলিং হয়েছে অষ্ট-ভূজ (অক্টাগোনাল) বা আট-কোণা গম্বুজের সাহায্যে। শীর্ষক অংশটি বড় আকারের আমলক, কলস এবং চক্র নিয়ে বেশ সুরচিত এবং সুদর্শন।


মন্দিরের প্রতিষ্ঠালিপিটি একটু বিশিষ্টভাবে রচিত। বানান, যতিচিহ্ন, লাইন ইত্যাদি সংশোধন না করে, সেটি হুবহু উল্লেখ করা যেতে পারে– ” শ্রীশ্রী মনসা মাতা শ্রীশ্রী সীতলা মাতা / ষুনহ সর্ব্বজন মোন্দিরনির্মণকথা দাসপুরে বাস / মিস্ত্রী যদুরথ সিল পদবীতে গাথা। / মিস্ত্রী সঙ্গে ১২ জন কোরে মন্দির গঠন / সকলে ক্ষেমতা পর্ণ .. / সন ১৩৯ / পরিচারক শ্রীযুত ভাগবৎচন্দ্র মাইতি / সাং জোৎকেসব ইতি “।
আমাদের অনুমান, লিপির ভিতর ‘সন ১৩৯’ সংখ্যাটি ১৩০৯ বঙ্গাব্দ হতে পারে। কেননা, বৈদ্যচার্য্যের জীবনকালের সাথে এটি সঙ্গতিপূর্ণ।
অলংকরণের কিছু কাজ করা হয়েছিল টেরাকোটা ফলকে। সবই জগমোহন অংশে। চতুর্মুখ ব্রহ্মা, বিষ্ণুর কয়েকটি অবতার, দেব-কারিগর বিশ্বকর্মা ইত্যাদি পৌরাণিক মোটিফ। সামাজিক বিষয়ের মোটিফে ঘোড়সওয়ার, মালাজপরত সাধু, তামাকু সেবনরত গৃহস্থ, ছাতা মাথায় পুরুষ ইত্যাদি দেখা যায়।


এছাড়া, গর্ভগৃহে দ্বারপথের দু’পাশে দুটি ভিনিশীয় রীতির দরজা রচিত আছে। এবং জগমোহনের শীর্ষে বেদীর দু’পাশে ব্যাদিত-বদন দুটি সিংহমূর্তি রচিত। তবে পরিতাপের কথা, বারংবার রঙের প্রলেপে মূর্তিগুলি বড্ড শ্রীহীন হয়ে উঠেছে। এগুলি ছাড়া, জ্যামিতিক নকশায় পঙ্খের কিছু কাজও রয়েছে জীর্ণ হয়ে ওঠা মন্দিরটিতে।


সাক্ষাৎকার : শ্রী প্রণব চক্রবর্তী, শ্রী শঙ্কর চক্রবর্তী– জোত কেশব।
যাওয়া-আসা : দক্ষিণ-পূর্ব রেলপথের পাঁশকুড়া স্টেশন থেকে ঘাটালগামী রাস্তায় গৌরা। সেখান থেকে পলাশপাই খালের উত্তর পাড় ধরে আজুড়িয়া ঢাল নেমে, সামান্য উত্তরে মন্দিরটি অবস্থিত। সমস্ত রাস্তাটাই মোটর চলাচলের উপযোগী।

বিজ্ঞাপন
Live Corona Update
error: Content is protected !!
Close
Close