খড়গপুরে ২৬২ জনকে দলিল প্রদান, আবেগ মথিত শতায়ু তরুবালা বললেন, শেকড় ছড়িয়ে গেলাম

1331
Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা: কত বছর আগে এদেশে এসেছিলেন মনে করতে পারেননা তরুবালা দে। ওপারে বাংলাদেশের স্মৃতি এখন ঝাপসা। নদী নালা নারকেল সুপারি গাছ এখন মনের মধ্যে জমে গিয়ে ফসিল। বয়স ১০০ পেরিয়ে গেছে ২বছর আগে। কচুরিপানার মত এই ক্যাম্প সেই ক্যাম্প হয়ে কবে এসে পড়েছিলেন খড়গপুরে। তারপর রবীন্দ্রপল্লী।

Advertisement

না তখন রবীন্দ্রপল্লী নাম হয়নি, লোকে বলত টুরিপাড়া, জবরদখল কলোনি। জবরদখল, কারন সরকার অনুমোদিত নয়। সরকার অনুমোদিত কলোনি হল পাশের তালবাগিচা। সেখানে সরকারের করে দেওয়া চওড়া রাস্তা, ইট বিছানো গলি, আলো, জল এমনকি কংক্রিটের দেওয়াল আর টিনের চালায় মস্ত বাজার। আজ সেই সব স্মৃতি ভিড় করে আসে, কাঁচা পাত কুয়োয় ছলাৎ ছলাৎ করে ভাসে অবহেলা, অবজ্ঞা আর উদ্বাস্তু নাম।

Advertisement
Advertisement

২৫শে মার্চ, ২০২০, বুধবার। নিজের নিকানো উঠোনে একটা কাগজ হাতে নিয়ে থর থর করে কাঁপেন তরুবালা। সরকারের দলিল! তাঁর নিজের ঘর, নিজের উঠোন আর ছড়ানো সংসারের নীচে এই প্রথম শেকড়! এতদিন ভোটার কার্ড ছিল, আধার কার্ড ছিল এমনকি রেশন কার্ড ছিল কিন্তু ছিলনা দলিল। মাটির নিচের ছড়ানো সেই শেকড়ের ছবি। বুধবার সেই শেকড়ের স্বীকৃতি। আছে, শেকড় আছে। ফোকলা দাঁত, তোবড়ানো গাল, হাতের মধ্যে কুঁচকে যাওয়া চামড়ার অজস্র আঁকিবুকি। সেই হাত দুটিতে দলিল খানা বাড়িয়ে দেন নাতির দিকে। বলেন, এই নে, তোদের শেকড় দিয়ে গেলাম। এবার মরেও শান্তি।

বুধবার ২৬২ জনের হাতে নিঃশর্ত দলিল তুলে দিয়েছে সরকার। তালবাগিচা, রবীন্দ্রপল্লী, দীনেশনগর আর রেলকলোনির বাসিন্দারা পেয়েছেন সেই দলিল। মোট দুটি ক্যাম্প করা হয়েছিল। ছিলেন খড়গপুর রেভিনিউ অফিসার দীপায়ন গুপ্ত, সার্ভেয়ার সমরেন্দু আদক আর ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের কো-অর্ডিনেটর তথা খড়গপুর পৌরসভার প্রাক্তন পুরপ্ৰধান জহরলাল পাল।

জহরলাল পাল জানালেন, “তালবাগিচায় প্রায় ১৫০০পরিবার আর বাকি তিনটি কলোনিতেও আরও প্রায় ১০০০পরিবার রয়েছেন। এখনো অবধি সব মিলিয়ে প্রায় ১১০০পরিবারের হাতে দলিল তুলে দেওয়া সম্ভব হল। কয়েকদিনের মধ্যে ফের কিছু পরিবারের হাতে দলিল তুলে দেওয়া হবে।”

উল্লেখ্য উদ্বাস্তুদের হাতে দলিল তুলে দেওয়ার কাজটি শুরু হয়েছিল বাম সরকারের আমলেই কিন্তু অজস্র জটিলতার কারনে সেই কাজটি পরের দিকে খানিকটা অবহেলার শিকার হয়ে পড়ে। জহরলাল পাল জানান, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে দু’হাজার সাল থেকে সরকারের টনক নড়িয়ে কিছু কিছু দলিল দেওয়ার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছিলাম তবে ২০১১র পরে কাজের গতি বেড়েছে। ২০১৬ সালে ডেবরার সভা থেকে মমতা ব্যানার্জী, আমাদের মূখ্যমন্ত্রী কিছু দলিল বিতরণ করেন। কিছুদিন আগে পরিবেশ মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী খড়গপুর শহরে এসে কিছুজনকে দলিল প্রদান করেছিলেন তবে সেসব কিছু ছাপিয়ে গেছে বুধবার। এত পরিমান দলিল একই সাথে সারা জেলাতেও দেওয়া হয়নি।”

তরুলতা বাম ডান কিছু বোঝেনা। অনেক উত্থান পতনের দিন পেরিয়ে এখন পারের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। যাওয়ার আগে উত্তরাধিকারের হাতে তুলে যেতে পারছেন এক টুকরো কাগজ যে কাগজে ছড়িয়ে আছে অজস্র শেকড়। আর তার উপড়ে যাওয়ার, ভেসে যাওয়ার ভয় নেই।