দিনভর হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে বিনা চিকিৎসায় মেডিক্যালেই মৃত্যু হল ইছাপুরের করোনা আক্রান্ত কিশোর

43

তিতলী সেনগুপ্ত : অসুস্থ ছেলের চিকিৎসার জন্য সারাদিন কলকাতার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসাপাতালের দরজায় দরজায় ঘোরেন বাবা-মা৷ যেভাবেই হোক একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতেই হবে, এই আর্তি নিয়ে চিকিৎসকদের কাছে কাকুতিমিনতি করলেও আখেরে লাভ হয়নি। দিনভর হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে বিনা চিকিৎসায় মেডিক্যালেই মৃত্যু হল ইছাপুরের করোনা আক্রান্ত কিশোর 1কোথাও বেড নেই, কোথাও আবার করোনা রোগী ভরতি নেওয়া যাবে না এই অজুহাতে ভরতি নিতে অস্বীকার করে কামারহাটি ইএসআই, কামারহাটি নার্সিংহোম, সাগর দত্ত হাসপাতাল, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ সহ কলকাতার চার চারটি হাসপাতাল। এভাবে ১২ ঘন্টা বিনা চিকিৎসায় হাসপাতালগুলিতে ঘোরাঘুরির পর অবশেষে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই মৃত্যু হল উত্তর ২৪ পরগণার ইছাপুর নেতাজীপল্লীর বছর ১৮-র কিশোরের।

জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকেই সামান্য অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন সদ্য উচ্চমাধ্যমিক দেওয়া বছর ১৮-র কিশোর। রাতে বাবা-মাকে না জানালেও ভোর ৪টে নাগাদ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে ওই কিশোর। শুরু হয় শ্বাসকষ্ট৷ আচমকা এভাবে শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ায় প্রথম অবস্থায় কি করা উচিত তা বুঝে উঠতে পারেনা পরিবারের সদস্যরা৷ কিন্তু তরুণের শারীরিক অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে শুরু করলে ভোর ৫ টা নাগাদ প্রথমে তাঁকে কামারহাটির ইএসআই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে সেই সময় তার রক্তে শর্করার মাত্রা অত্যন্ত বেশি থাকায় চিকিৎসা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এরপর সেখান থেকে বেলঘরিয়ার মিডল্যান্ড নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানেও চিকিৎসার জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করিয়ে রাখা হয়। অভিযোগ, রোগীর অবস্থা সংকটজনক বলা সত্ত্বেও কোনো হেলদোল ছিলনা নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষের। অবশেষে পুলিশি সহায়তায় নার্সিংহোমের তরফে কিশোরের নমুনা সংগ্রহ করে করোনা পরীক্ষা করানো হয়। এরপর রিপোর্টে জানা যায় সে করোনায় সংক্রমিত। কিন্তু রিপোর্ট পজিটিভ জানার পরে মিডল্যান্ড নার্সিংহোমের তরফে ভরতি নিতে অস্বীকার করে। এরপর ফের তাকে কামারহাটি ইএসআই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখান থেকে সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়৷ সেখানেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয় বেড নেই। এরপর আবারও কামারহাটির ইএসআই হাসপাতালে ফিরে যান তাঁরা। হাসপাতালে পৌঁছে অসুস্থ সন্তানকে ভরতি নেওয়ার জন্য রীতিমতো কাকুতিমিনতি করতে থাকে বাবা-মা। কিন্তু তাতেও বরফ গলেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।

এরপর কি করবেন বুঝতে না পেরে অবশেষে তাঁরা লালবাজারে যোগাযোগ করেন। পুলিশের সহযোগিতায় কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ছেলেকে নিয়ে যায় বাবা-মা। কিন্তু সেখানেও বেড না থাকার কথা জানিয়ে দেওয়া হয়৷ একেই প্রত্যেকটি হাসপাতাল একইভাবে ভরতি নিতে অস্বীকার করছে, তার ওপর ছেলের শারীরিক অবস্থা ক্রমশ অবনতি হচ্ছে। ছোট হয়ে আসছে শ্বাস। এই পরিস্থিতিতে মেজাজ হারিয়ে ফেলেন মা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রীতিমতো তর্কাতর্কি শুরু হয়ে যায়। এমনকি ছেলের চিকিৎসা না করে তাকে ফিরিয়ে দিলে সেখানেই আত্মহত্যা করবেন বলে হুমকিও দেন তিনি। এরপরই টনক নড়ে হাসপাতালের৷ স্ট্রেচারে করে ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু অভিযোগ, সেই সময় কোনও স্বাস্থ্যকর্মী তাঁদের সহযোগিতা করেননি, এমনকি তাদের ধারে কাছেও আসেননি। কিন্তু ভরতি করেও আর লাভ হলনা দীর্ঘ ১২ ঘন্টা কলকাতার নানা সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ঘুরে অবশেষে বিনা চিকিৎসাতেই মৃত্যু হয় ১৮ বছরের কিশোরের।

আরও পড়ুন -  মৃত্যুর কাউন্টডাউনে বাংলাও , রাজ্যে প্রথম করোনা আক্রান্তের মৃত্যু, দ্রুত পোড়ানোর নির্দেশ, মোট আক্রান্ত ৭

পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালগুলির গাফলতিতেই মৃত্যু হয়েছে তাদের ছেলের। তারা যদি এভাবে ভরতি নিতে অস্বীকার না করতেন তবে সঠিক সময়ে চিকিৎসায় সন্তানকে প্রাণে বাঁচানো যেত। কিশোরের মায়ের অভিযোগ, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বারংবার অনুরোধ করলেও তাদের জানানো হয় বেড নেই কিন্তু শেষমেশ ভরতি করা গেলে ভেতরে দেখা যায় ৪ টে বেড খালি পরে রয়েছে অথচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৪ ঘন্টা ধরে তাদের মিথ্যে বলে গেছে৷ এদিকে যেহেতু বেসরকারি হাসাপাতালে করোনা পজিটিভ রিপোর্ট এসেছিল তার ওপর ভিত্তি করে দেহ দেবে না বলে জানিয়ে দেয় মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু মৃত কিশোরের বাবার অভিযোগ, সাধারণত সরকারিভাবে করোনা টেস্টের রিপোর্ট আসতে অন্তত ১ দিন সময় লাগে। কিন্তু বেলঘরিয়ার ওই বেসরকারি হাসপাতাল ৫ মিনিটেই করোনার রিপোর্ট পজিটিভ বলে দিল। এমনকি কোনো রোগী করোনা পজিটিভ হলে তা সরকারিভাবে স্বাস্থ্যভবনে জানানো বাধ্যতামূলক। কিন্তু কিশোরের বাবা স্বাস্থ্যভবনে ফোন করে জানার চেষ্টা করলে স্বাস্থ্যভবনের তরফে তাদের জানানো হয় ওই নার্সিংহোম থেকে এদিন করোনা পজিটিভের রিপোর্ট জমা পড়েনি৷ এদিকে এই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই দেহ দিতে অস্বীকার করেন মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ।

আরও পড়ুন -  পি.কে নজর কাড়তে কাউন্সিলের বিরুদ্ধে অভিনব পোষ্টার দলেরই একাংশের, 'সৌজন্যে কাটমানি, কলকাতা টু মন্দারমনি

করোনা সংক্রমণের পর থেকেই বারংবার রোগী প্রত্যাখ্যানের অভিযোগ আসছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলির বিরুদ্ধে৷ এর আগে রাজ্যের মুখ্যসচিব রাজীব সিনহার সাথে বেসরকারি হাসপাতালগুলির সাথে বৈঠকে সরকারের তরফে তাদের বারংবার বোঝানো হয় যাতে কোনোভাবেই রোগী প্রত্যাখ্যান না করা হয়। এমনকি কোনো পরিস্থিতিতেই যাতে রোগী না ফেরানো হয় সেবিষয়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে গত মাসেই হুশিয়ারী দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু তাতেও কোনও লাভ হয়নি। মুখ্যমন্ত্রীর কথার তোয়াক্কা না করে  পথে চলছেন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল গুলি। অন্তত শুক্রবার রাতে ইছাপুরের বিনা চিকিৎসায় ওই কিশোরের মারা যাওয়ার ঘটনায় সেই প্রমাণই মিললো।

দিনভর হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে বিনা চিকিৎসায় মেডিক্যালেই মৃত্যু হল ইছাপুরের করোনা আক্রান্ত কিশোর 2