করোনা আক্রান্ত হলেও বেতন কাটা যায় করোনা যোদ্ধাদের! সমাজের আশা হয়েও হতাশায় আশা কর্মীরাই

870
করোনা আক্রান্ত হলেও বেতন কাটা যায় করোনা যোদ্ধাদের! সমাজের আশা হয়েও হতাশায় আশা কর্মীরাই 1

অশ্লেষা চৌধুরী: করোনা কালে চিকিৎসক, নার্সদের মতো করে পরিষেবা দিয়ে যাচ্ছেন তারাও, নিজেদের কাজে ত্রুটি রাখেননি কখনই, এর সাথেই এ রাজ্যে মা এবং শিশুদের স্বাস্থ্য পরিষেবা দিয়ে চলেছেন সমান তালে, যা তাদের নিত্য দিনের কাজ। অথচ সেই আশা কর্মীই অসুস্থ হয়ে পড়ায় তার প্রাপ্য ন্যুনতম বেতনও কেটে নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি এমনই এক করুণ কাহিনী সামনে এসেছে এক আশা কর্মীর।

পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরা থানার কোতাই সাব সেন্টারের আশা কর্মী অনিতা কর শর্মা। তিনি আমাদের জানান, করোনা পরিস্থিতিতে এলাকায় এলাকায় কাজ করার পর তিনি নিজেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে যান। এরপর প্রায় ১২ দিন শালবনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। এই অবস্থায় কাজে যোগ না দিতে পারার জন্য মাসিক ভাতা থেকে কিছু অর্থ কেটে নেওয়া হয়। প্রায় এক মাস কাজ করার পর আবারও অসুস্থ হয়ে পড়েন অনিতা। ফলে মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজে তাকে ভর্তি হতে হয় এবং তার শরীরে অস্ত্রোপচার হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ মতো বাড়ীতে এক মাস বিশ্রামে থাকতে হয়। পরে চেকআপে গেলে আরও দুই সপ্তাহ বিশ্রামে থাকার নির্দেশ দেন চিকিৎসক।

করোনা আক্রান্ত হলেও বেতন কাটা যায় করোনা যোদ্ধাদের! সমাজের আশা হয়েও হতাশায় আশা কর্মীরাই 2

এই সময়কালে কাজে যোগ না দিতে পারায় ফিক্সট অনারিয়াম ৪৫০০ টাকা এবং ফরমেটের ভিত্তিতে ইন্সেন্টিভ সম্পূর্ণ রূপে কেটে নেওয়া হয়। এই সময়কালে অনিতা কর শর্মাকে এক টাকাও দেওয়া হয় না। এইভাবে আশাকর্মীরা নিজের চিকিৎসার কারণে কিছুদিন ছুটি নিলে সে ক্ষেত্রেও তার প্রাপ্য অর্থ কেটে নেওয়া হচ্ছে। এরকম অনেক উদাহরণ রয়েছে। ডেবরা থানার আরো এক আশা কর্মী চিকিৎসার জন্য কিছুদিন ছুটি নিয়েছিলেন। তার ক্ষেত্রেও অর্থ কেটে নেওয়া হয়।

স্থানীয় আশা কর্মীদের সংগঠনের এক নেত্রী কাজল চক্রবর্তী জানান,” সারাদেশ এবং এ রাজ্যে মা এবং শিশুদের স্বাস্থ্য পরিষেবা ছাড়াও কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমস্ত রকমের কাজ করে চলেছেন। বহু আশা কর্মী করোনায় আক্রান্ত। বেশকিছু জন প্রাণও হারিয়েছেন। বহু আন্দোলনের পর অক্টোবর মাস থেকে ১০০০ টাকা বাড়িয়ে রাজ্য সরকার মাসে ৪৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া শুরু করেছে। এর সাথে দেওয়া হয় ফরমেটের ভিত্তিতে সামান্য কিছু অর্থ। বলা হয়েছে, দিনে ২৪ ঘন্টা ডিউটি। নিয়মিত কাজ ছাড়াও যে কোনও সময় কাজের হুকুম আসতে পারে। সারা বছরে কোনও ছুটি নেই। একদিনও যদি বাড়ীর বাইরে চিকিৎসা কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়ী যেতে হয় তাহলে লিখিত দরখাস্ত দিয়ে অনুমতি নিয়ে তবেই যেতে হয়। স্থায়ী স্বাস্থ্যকর্মীর নয়, নেই ডিএ, পেনশন কিংবা সরকারি কর্মচারীদের সুবিধা। কিন্তু দায়িত্ব-কর্তব্য, কাজ সর্বক্ষণের জন্য। দিনের-পর-দিন হাজার কাজের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার পর অধিকাংশ আশা কর্মীরা আজ নিজেরাই রোগীতে পরিণত হয়েছেন।”

কিন্তু এত কিছুর পরেও তাঁদের নিজেদের চিকিৎসার জন্য ছুটি পাওয়ার কোন অধিকার নেই, অন্য কাজ তো দূরের কথা। চিকিৎসার কারণে ছুটি নিলেও কেটে নেওয়া হচ্ছে তাদের সামান্য প্রাপ্য অর্থ। মা ও শিশুর মৃত্যু হ্রাস এবং বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতে সামনের সারির যোদ্ধা হিসেবে সরকারি তরফ থেকে বহু প্রশংসা এবং সম্মান প্রদর্শনের কথা আপনারা শুনে থাকবেন, তবে তার সাথে সাথে এই করুণ চিত্রটিও তুলে ধরা প্রয়োজন। আসলে অনিতার মতো আশা কর্মীরা অনেকটা প্রদীপের মতো; তারা নিজেদের জ্বালিয়ে সকলকে আলোকিত তো করেন, অথচ তাঁদের জীবনটাও প্রদীপের নীচে আঁধারের মতই।