জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল– ২৭ চিন্ময় দাশ

670
Advertisement

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল– ২৭

চিন্ময় দাশ

(জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল আজ ২৭ পর্বে এসে পাঠক হয়ত হোঁচট খাবেন কারন এই সংখ্যার আলোচ্য মন্দিরটি সে অর্থে জীর্ণ নয়। জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল প্রকাশ হওয়ার শুরুতেই মন্দির গবেষক তথা লেখক শ্রী চিন্ময় দাশ প্রশ্নটি উত্থাপন করেই ছিলেন যে, এখানে কি শুধুই ধ্বংসায়মান বিলুপ্তপ্রায় মন্দির গুলির কথাই আলোচ্য হবে ? শ্রী দাশ কাজ করেছেন বাংলার চার শতাধিক মন্দির সৌধ নিয়ে যার প্রায়  নব্বই ভাগই বিলুপ্ত প্রায়। কিছু মন্দির টিকে রয়েছে বা সংস্কার হয়েছে পরবর্তী পুরুষদের দ্বারা। শতাধিক বছর পেরিয়েও সেই সব মন্দির যাঁরা সংস্কার করে মন্দিরের মুল কাঠামোটি ধরে রেখেছেন অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগ করে,  জীর্ণ হয়নি এই দোহাই দিয়ে যদি সেগুলি আলোচনার বাইরে থেকে যায় তবে তাঁদের সদিচ্ছাকে, পরম উদ্যোগকে অস্বীকার করা হয়। আলোচনার পর স্থির হয় জীর্ন মন্দিরের জার্নালে আলোচ্য মন্দির প্রসঙ্গ আসবে প্রাচীনত্ব বা সময়ের নিরিখেই। জীর্ণতা  এক্ষেত্রে সময়ের, মন্দির গাত্রের নয়।)

Advertisement

শ্রীধর মন্দির, জামনা (পিংলা)
সওয়া দু’শ বছর আগের কথা। দিন্ডা পদবীর এক পত্তনীদার পরিবারের বসবাস ছিল পিংলা থানার জামনা গ্রামে। কুলদেবতার জন্য পঞ্চ-রত্ন রীতির সুদর্শন একটি মন্দির গড়েছিলেন তাঁরা।
এঁদের অতীত কথা বেশি জানা যায়নি। লোকশ্রুতি হিসাবে, এক শোলাঙ্কি বীরপুরুষ বীরসিংহের কথা জানিয়েছেন সেবাইতগণ। দিল্লী অধিকারের পর, সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজী যখন বারংবার সৌরাষ্ট্র এলাকা আক্রমন করছিলেন, তখন বহু শোলাঙ্কি পরিবার দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তেমনই একটি বাহিনী প্রথমে জগন্নাথ ক্ষেত্র পুরী, সেখান থেকে রেমুনা হয়ে, মেদিনীপুরের কেদারকুন্ড পরগণায় উপস্থিত হয়েছিল।

Advertisement
Advertisement

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
বাহিনীর প্রধান ছিলেন বীরসিংহ নামের এক বীরপুরুষ। ময়ূরভঞ্জ রাজার ” তসেলা ” বা আবাদী সনন্দ নিয়ে বড় মাপের জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। বেশ কয়েকজন জমিদার ছিলেন তাঁর অধীনে। দাস পদবীর তেমনই এক জমিদারবংশ ছিল জামনা গ্রামেই।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
পরবর্তী কালে দাস বংশের কিছু সম্পত্তি পত্তনি নিয়ে দিন্ডা পরিবার একটি জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেই বংশেরই কোনও এক পূর্বপুরুষ কুলদেবতা শ্রীধরের জন্য মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর নামটি জানা যায় না। তবে সময়কাল সম্ভবত উনিশ শতকের একবারে গোড়ার দিক। 

অনুপম সৌন্দর্যের অধিকারী মন্দিরটি পঞ্চ-রত্ন শৈলীতে নির্মিত। সামনে প্রশস্ত প্রাঙ্গন রেখে, গড়া হয়েছে দক্ষিনমুখী মন্দিরটি।পাদপীঠ স্বল্প উঁচু। তার উপর একটি প্রদক্ষিণ পথ, সেটি মন্দিরকে বেষ্টন করে আছে। দুটি অংশ মন্দিরের– সামনে অলিন্দ, পিছনে গর্ভগৃহ।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
তিনটি দ্বারপথ গড়া হয়েছে অলিন্দে প্রবেশের জন্য। অন্য দুটি অপেক্ষা কেন্দ্রীয় দ্বারপথটি বেশি প্রশস্ত। ইমারতি রীতির থাম আর দরুণ-রীতির  খিলানের সাহায্যে দ্বারপথগুলি রচিত হয়েছে। গর্ভগৃহে প্রবেশের দ্বারপথ একটিই।

অলিন্দের ভিতরের ছাদ বা সিলিং হয়েছে টানা-খিলান করে। গর্ভগৃহের সিলিং দু ‘পাশে খিলান গড়ে, তার মাথায় গম্বুজ স্থাপন করে গড়া হয়েছে।
এবার আসা যাক উপরের ছাউনি এবং রত্নগুলির কথায়। নিচের চার দেওয়ালের মাথায় চালা-রীতির ছাউনি দেওয়া। ছাউনিগুলির জোড়মুখ হস্তীপৃষ্ঠের মত উত্তল নয়. বরং বিষ্ণুপুরী ছাউনির সদৃশ। ছাউনির নিচের প্রান্তের বঙ্কিমভাবটি বেশ মনোরম। তাতে কার্নিশগুলি বেশ রমণীয় হয়ে উঠেছে।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
রত্নগুলি গড়া হয়েছে শিখর দেউল রীতিতে। নিচে একটি চতুস্কোণ বেদী, তার উপর ঋজু কাঠামোর রত্ন। প্রতিটির বাঢ় এবং গন্ডী জুড়ে রথ বিভাজন করা। কোণের রত্নগুলিতে ত্রি-রথ এবং কেন্দ্রীয় রত্নে পঞ্চ-রথ বিভাজন। এর সাথে আছে গন্ডী অংশে পীড় রীতির প্রয়োগ। কেন্দ্রীয় রত্নে ২০টি এবং কোণের রত্নগুলিতে ১৩টি করে ঘণসম্বদ্ধ থাক কাটা। এই দুটি রীতির প্রয়োগে সৌন্দর্য বেশ প্রকট হয়েছে মন্দিরটিতে।
প্রতিটি রত্নের একেবারে উপরে, শীর্ষক অংশে ক্রমান্বয়ে বেঁকি, আমলক, কলস, দন্ড এবং বিষ্ণুচক্র স্থাপিত।

মন্দিরটি যেমন মাটি পোড়ানো ইট দিয়ে তৈরী, তেমনই পোড়ামাটির (টেরাকোটা) ফলক দিয়ে সাজানো। ছোট ছোট প্যানেলে বহুসংখ্যক ফলক। কার্নিশের নিচে ২টি সারি এবং দুই কোনাচ বরাবর দুটি খাড়া সারিতে ফলকের বিন্যাস। রামায়ণ এবং কৃষ্ণকথার মোhটিফ ফলকগুলিতে।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
মুখ্য দ্বারপথের মাথার উপরে একটি রাসমন্ডল চক্র। সেটির উপরে সীতাদেবী সহ সিংহাসনে উপবিষ্ট রাজা রাম। প্রজাপতি ব্রহ্মা, বিষ্ণুর দশ অবতার, সন্তান কোলে জননী ইত্যাদির সাথে, একটি মিথুন মূর্তিও আছে।

সমস্ত ফলকসজ্জা হয়েছে মন্দিরের সামনের দেওয়ালে, অর্থাৎ দক্ষিণ দিকে। তবে পূর্বদিকের দেওয়ালে কার্নিশের নীচে একটি নিরাবরণা নারীমূর্তি স্থাপিত আছে। জানা যায়, এই মূর্তির সন্নিবেশ মন্দিরকে বজ্রপাতের হাত থেকে রক্ষা করে। প্রাচীন একটি লোকবিশ্বাসকে রূপায়িত করা হয়েছে এখানে। একেবারেই এক বিরল দৃষ্টান্ত।
মন্দিরসৌধটি ভারি সুদর্শন। তাছাড়া, দেবালয় রক্ষায় সেবাইত পরিবারটি যে বিশেষ যত্নবান, তা বেশ বোঝা যায়।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
যাওয়া-আসা : বালিচক রেলস্টেশন কিংবা ৬ নং ন্যাশনাল হাইওয়ের ডেবরা বাজার থেকে দক্ষিণ মুখে, সবং-পটাশপুর গামী রাস্তায় জামনা। সেখান থেকে সামান্য পূর্বমুখে দিন্ডা পরিবারের বসতবাটি এবং মন্দিরটি অবস্থিত।
                       প্রচ্ছদ-রামকৃষ্ণ দাস