জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল– ১৯ ॥ চিন্ময় দাশ

74

             

  জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল– ১৯

                                       চিন্ময় দাশ 

সীতারাম মন্দির,বলরামপুর(ডেবরা)

মাত্রই শ’দেড়েক একর জমি নিয়ে গড়ে ওঠা গ্রাম। নাম– বলরামপুর, – -ডেবরা। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা।
গ্রামের প্রবীণ জনেরা বলেন, একদিন পুরোটা জুড়েই ছিল এক জমিদারের বাস্তুভিটে। প্রাসাদের সাথে তুলনা করা যায়, বিশাল অট্টালিকা ছিল জমিদারের। হাতিশাল-ঘোড়াশাল ছিল, কাছারিবাড়ি ছিল, গোলাঘর, পাইকদের কুঠি, তোষাখানা– ছিল যে আরও কত কিছু। মল্লিক পদবি ছিল জমিদারদের।  তা থেকেই নাম হয়েছিল– মল্লিকবেড়।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
একবার কলেরা আর ম্যালেরিয়ার প্রকোপ দেখা দিয়েছিল। কংসাবতী নদীর এপার ওপার জুড়ে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে গিয়েছিল সেই মড়কে।   সদর কোতোয়ালি থানার পাথরা, বালিপোতা; কেশপুর থানার গোপীনাথপুর, বাদাড়– তেমনই সব গ্রাম।
মল্লিকবেড় ছিল নদীর আর খানিক নিম্ন স্রোতে। মল্লিকবেড়েও যখন মড়ক লাগল, জমিদার চলে যান গ্রাম ছেড়ে। ইংরেজদের হাতে কলকাতা তখন পূর্ণ বিকশিত। মল্লিকবাবুরা কলকাতাতেই চলে গেলেন চিরকালের মতো.
সেদিন থেকে ঝোপ-ঝাড়, বন-জঙ্গল গ্রাস করতে লাগল মল্লিকবেড়কে।

বহু বহু বছর পরে, পরিত্যক্ত গ্রামটিতে মানুষজনের আসা যাওয়া শুরু হয়. শুরু হয় বন কেটে বসত গড়া. ডেবরা থানারই গণ্ডত গ্রাম থেকে গুঁড়ায় সামন্ত নামের এক কৃষক চলে আসেন গ্রামটিতে। কিছু জমি কিনে নতুন করে বসতি পাতেন সেখানে। 
একদিন রাতে দেবতার স্বপ্নাদেশ পান গুরাই সামন্ত– তোর জমিতেই আছি আমি। উদ্ধার করে পূজা শুরু কর।

আরও পড়ুন -  জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-- ৫৯

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
সত্যিই তাই। বিশাল বিশাল সব মহীরুহে ঢাকা পুরো এলাকা। ঘন জঙ্গল, সূর্যের আলো ঢোকে,এমন ফাঁক-ফোকরটিও নাই। বিষাক্ত স্যাপ-খোপের আখড়া। কী আশ্চর্য, তার ভিতর থেকেই ফুটে উঠল দু’-দুটো মন্দির। সর্বাঙ্গে গাছপালার বিস্তার। পলেস্তারা নাই বললেই চলে. অতি জীর্ণ অবস্থা তাদের।

সাফ-সুতরো করে দেখা গেল, একটি মন্দিরে শিবের লিঙ্গমূর্তিটি দিব্যি বহাল আছে। অন্যটিতে কিছুই নাই। দেবতার কোনও চিহ্নই নাই গর্ভগৃহে। শেষমেশ মন্দিরের চূড়ার ভাঙা চক্র-চিহ্ন দেখে, সেটি নারায়ণ মন্দির বলে স্থির হয়।
বাজার থেকে রাম-সীতার ছবি এনে রাখা হয়েছে মন্দিরে।  মন্দিরের নাম হয়েছে– সীতা-রাম মন্দির। পূর্ণিমা তিথির দিনগুলিতে পুরুত ঠাকুর আসেন। শাঁখ-কাঁসর বাজিয়ে পূজা হয়। বছরের বাকি দিনগুলি বাড়ির মেয়ে-বৌরা জল-তুলসী দিয়ে প্রণাম করে যান দেবতাকে।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
এমন যে অখ্যাত, অবজ্ঞাত এক মন্দির, তার কথা আমরা কেন বলতে বসেছি! বসেছি এজন্য যে, একদিন জেলার অন্যতম সেরা মন্দিরের শিরোপা ছিল এই দেবালয়ের মাথায়। গড়নে, অলংকরণে, কারুকাজে বিপুল গরিমা ছিল দেবালয়টির। হবে না-ই বা কেন? এ মন্দিরের স্থপতি ছিলেন ঠাকুরদাস শীল। গঙ্গার পশ্চিমে সেরা মন্দির-স্থপতির মুকুট ছিল ঠাকুরদাসের মাথায়।

মেদিনীপুরের জমিদাররা ঠাকুরদাসের খাতায় নাম লিখিয়ে বছরের পর বছর বসে থাকতেন, তাঁকে দিয়ে একটি মন্দির গড়াবেন বলে। সেই ঠাকুরদাসের হাতেই মন্দিরটি গড়া হয়েছিল। 
কলিঙ্গ-শৈলীর ‘ শিখর-দেউল ‘ রীতিতে নির্মিত এই মন্দির ।  দীর্ঘ দিনের অযত্নে অবহেলায় অতি করুণ দশা। পাদপীঠ আছে কি নাই। প্রায় সবটাই ভূমিগত। পিছনে বিমান বা মূল মন্দির। সামনে জগমোহন। মাঝখানে কোন অন্তরাল অংশ নাই এখানে। বিমানটি প্রায় ৪০ ফুট উচ্চতার বর্গাকার সৌধ। বাড় ও গন্ডী জুড়ে রথ-বিভাজন করা। প্রশস্ত রাহাপাগ, দু ‘দিকে দুটি করে অনুরথ আর দুই কোণে দুটি কোণাপাগ– এই নিয়ে সপ্তরথ বিন্যাস।

আরও পড়ুন -  জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-- ২৭ চিন্ময় দাশ

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জগমোহনটি আয়তাকার। উচ্চতা প্রায় ফুট পঁচিশেক। এর বাড় অংশটি দালান-রীতির। গন্ডী বা মাথার ছাউনি অংশ চালা-রীতিতে নির্মিত। তার নিচের প্রান্ত বা কার্নিশে বেশ বঙ্কিম গড়ন। চালায় কলিঙ্গ-শৈলীর পীড়-রীতি প্রয়োগ করা হয়েছে। ১৭টি সমান্তরাল সরু থাকে ভাগ করা। থাকগুলি চিকন হওয়ায়, বেশ সুন্দর একটি সুষমা ফুটে উঠেছে মন্দিরে।

দালানের মাথায় আলসের উপর তিনটি শীর্ষক। প্রতিটিতেই বেঁকি, কলস, আমলক। চক্রগুলি কবেই লুপ্ত হয়েছে। টিকে আছে কেবল নিশান-দন্ডগুলিই। জগমোহনের ভিতরের ছাদ বা সিলিং হয়েছে টানা-খিলান করে। গর্ভগৃহের সিলিং চারটি পাশ-খিলানের মাথায় গম্বুজ স্থাপন করে নির্মিত।
মন্দিরের বায়ুকোণ বরাবর একটি চাতালের চিহ্ন দেখা যায়। সেখানে দেখা যায়, দুটি ভাঙা স্তম্ভের নীচের একটু করে অংশ দেখা যায় কেবল। পঙ্খের সুন্দর মসৃন পলেস্তারায় চিকন প্রলেপ ঠাকুরদাসের কাজের ইঙ্গিত দেয় আজও।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জগমোহনের দেওয়াল জুড়ে টেরাকোটার অলংকরণ ছিল। একটি-দুটি জীর্ণ ফলক ছাড়া, কিছুই আর টিকে নাই। তস্কর আর অসাধু প্রত্ন-গবেষকের দল সেসব লোপাট করে দিয়েছে। দাসপুর থানার সুরতপুর গ্রামের শীতলা মন্দির বা খড়্গপুর থানার চমকা গ্রামের শ্রীধর মন্দিরের ঠাকুরদাসের শিল্পকর্মের নমুনা দেখা যায়। অনুরূপ পারঙ্গমতা এখানেও দেখিয়েছিলেন তিনি।

তিনটি বিশেষ বিষয় জানানো প্রয়োজন। ১. প্রতিষ্ঠা-ফলকটি এখনও আছে মন্দিরে। সুন্দর একটি  পদ্য রচনা করা হয়েছে তার প্রতিপাদ্যে। ছবি দেওয়া হোল–পাঠক-পাঠিকাগণ তা থেকে রসের সন্ধান করতে পারবেন।  ২. মন্দিরের বিমান অংশেরপশ্চিমের দেওয়ালে একটি ঘড়ি এঁকেছিলেন ঠাকুরদাস। মন্দিরে ঘড়ির ছবি কমই দেখা যায়। সেটি এখনও প্রায় অক্ষতই আছে। তারও ছবি দিলাম আমরা। ৩. বজ্রপাত নিবারণের জন্য, মন্দিরের মাথায় লৌহদন্ড বা উলঙ্গ নারী-মূর্তি স্থাপন করা হয়। এই মন্দিরে তা না করে, কেবল একটি বাক্য লিখে দিয়েছিলেন ঠাকুরদাস– ” বিদ্যুদগ্নিভয়ং নাস্তি পতিতে চ গৃহোদরে “। এটিও একান্তই বিরল নজির।

আরও পড়ুন -  জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল - ৫৪

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
মন্দিরের পূর্ব এবং পশ্চিমের দেওয়ালে দুটি ‘ প্রতিকৃতি জগমোহন’ রচিত আছে। সেগুলিও অলংকৃত।  দুটি দ্বারপাল মূর্তি দেখা যায় মন্দিরে। গর্ভগৃহের দ্বারপথের দুদিকে স্থাপিত। তবে একেবারে অন্তিম দশা সেগুলির।
যাওয়া-আসা : যে কোনও দিক থেকে হাওড়া বা খড়্গপুর হয়ে (৬ নং জাতীয় সড়ক মুম্বাই রোড ধরে) আষাড়ী বাঁধ। সেখান থেকে উত্তরমুখে কিছু দূরে লোয়াদা বাজার। লোয়াদার ২কিমি পশ্চিমে বলরামপুর গ্রাম ও মন্দির। দ. পূ. রেলপথের বালিচক স্টেশন থেকেও লোয়াদা আসা যাবে। সব দিক থেকেই মন্দির পর্যন্ত মোটরেবল রাস্তা আছে।
            প্রচ্ছদ-রামকৃষ্ণ দাস