করোনায় জয়ী হয়েও মায়ের পথেই মেদিনীপুর শহরের শিক্ষক! ফের আত্মীয় বিয়োগের অশ্রু ডেবরায়

214
Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা: তাঁর মৃত্যুর খবর পৌঁছাতেই মাড়তলা সত্যেশ্বর ইনস্টিটিউশনের এক প্রাক্তন ছাত্র দেবব্রত দত্ত তাঁর ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘জানিনা এ মৃত্যু মিছিল থামবে কবে! হে ঈশ্বর এবার তুমি ক্ষান্ত হও!” বুধবার দুপুরেই এসেছে সেই মর্মান্তিক দুঃসংবাদ, মারা গেছেন ছাত্রছাত্রীদের প্রিয় পদার্থবিদ্যার শিক্ষক স্বপন ভূঁইয়া স্যার।একের পর এক প্রিয়জন বিয়োগের ধাক্কায় বিপর্যস্ত সারা দেশ, সারা রাজ্যের মতই পশ্চিম মেদিনীপুরের এই জনপদ ডেবরা। ৫দিন পের হয়নি এই মাড়তলারই বাসিন্দা কেশপুর ঘোষডিহা উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মনোরঞ্জন চ্যাটার্জীর মৃত্যু হয়েছে। পরের দিনই মারা গেছেন রাধামোহনপুর উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন সম্পদক শিক্ষাব্রতী দেবাশিস হুই। আর দিন ২০আগে এই মাড়তলারই পার্শ্ববর্তী পাঁচগেড়িয়া উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভূগোলের শিক্ষিকা মিতালী ত্রিপাঠী চলে গেছেন সেই করোনাতেই।

Advertisement

করোনাকে জয় করে ফিরেও ছিলেন স্বপনবাবু। করোনা উত্তর চিকিৎসার জন্য ভর্তি ছিলেন মেদিনীপুর শহরের একটি নার্সিংহোমে। মেদিনীপুর শহরের অরবিন্দ নগরের বাসিন্দা স্বপনবাবু যখন ভালো হওয়ার পথে, পরিবার, ছাত্রছাত্রীরা তাঁর অধীর আগ্রহে ফেরার অপেক্ষায় তখনই এল সেই দুঃসংবাদ! বুধবার, দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ প্রয়াত হয়েছেন তিনি। তাঁর প্রাক্তন ছাত্র দেবব্রত দত্ত মাড়তলা সত্যেশ্বর ইনস্টিটিউশন এক্স স্টুডেন্ট ফেসবুক পেজে লিখেছেন, “এই দুঃখ রাখার জায়গা নেই, আপনার চলে যাওয়া আমাদের কাছে নক্ষত্র পতন স্যার! মারণ ভাইরাসের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের আজই শেষ দিন ছিল। মনের মধ্যে আশা একটা ছিলই স্যার আপনি ফিরে আসবেনই, কিন্তু না সবকিছুকেই মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়ে আপনি পাড়ি দিলেন অজানার দেশে, আর আমাদের মধ্যে দিয়ে গেলেন একবুক হাহাকার। আপনি ভালো থাকুন স্যার, যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন। আর কিছু ভালো লাগছে না”

Advertisement
Advertisement

বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক রাধাশ্যাম মান্না বলেছেন, ” এবছরের শেষেই অবসর নেওয়ার কথা ছিল তাঁর। অবসরকালীন সুবিধা, পেনশন ইত্যাদির জন্য তাঁর কাগজপত্র, সার্ভিসবুক ইত্যাদি তৈরি করছিলাম আমরা কিন্তু তিনি যে তার আগেই জীবন থেকেই অবসর নিয়ে নেবেন ভাবতেই পারিনি।” ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয় স্বপন ভূঁইয়ার ফিজিক্স ক্লাশকে মিস করতনা ক্লাশের দুরন্ত ছাত্রটিও। পদার্থবিদ্যার মত জটিল বিষয়কে মনোগ্রাহী করে তুলতেন তিনি। এমনই দাবি করে এক প্রাক্তন ছাত্র বলেছেন, ” এই গ্রামগঞ্জ, মফঃস্বল থেকেও যখন একেকটি রত্ন বেরিয়ে দেশকে চমকে দেয় তখন জানবেন তার পেছনে এরকমই একেকজন স্বপন স্যার থাকে। কী সম্পদ যে হারালাম আমরা তা ভাষায় বোঝানোর নয়।”

যদিও স্বপন ভূঁইঞা স্যারের পরিবারের ট্র্যাজেডিটা আরও একটু বেশি। ১০দিনও হয়নি করোনায় প্রয়াত হয়েছেন মা। একমাত্র পুত্র সন্তান হিসেবে পারলৌকিক ক্রিয়া করতে পারেননি তিনি কারন তিনি নিজে তখন করোনা যুদ্ধে। ওদিকে বৃদ্ধ বাবা এখনো করোনার সাথে লড়াই করছেন। আক্রান্ত স্বপনবাবুর বোনও। স্বপনবাবুর গ্রামের বাড়ি শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই মহাতাপনগরে। সেখানকার প্রতিবেশী সাইদুল হক বলেছেন, “ভূঁইয়া পরিবারের একের পর দুঃসংবাদে উদ্বিগ্ন পুরো গ্রাম। স্বপন বাবু শিক্ষক হিসেবে এতটাই দক্ষ ছিলেন যে একটি নামকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে দিয়ে পড়াতেন। আমরা ভাবতেই পারছিনা তিনি এভাবে চলে যাবেন। পরিবারের বাকিরা সুস্থ হয়ে উঠুন এই কামনা করি।”

ডেবরার বাসিন্দা তথা শিক্ষক দুরন্ত কুমার দাস জানিয়েছেন, ” করোনায় বহু প্রিয়জন হারাচ্ছি আমরা কিন্তু পরপর এই শিক্ষকদের মৃত্যু গোটা জাতির জন্যই বড় ক্ষতি। আর আমাদের মত মফঃস্বলের ছেলেমেয়েদের যাঁরা ভিত গড়ে দেন তাঁদের মৃত্যু আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।”
শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী-শিক্ষানুরাগী ঐক্যমঞ্চের রাজ্য সম্পাদক কিংকর অধিকারী বলেন, ‘ প্রতিদিন এই দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর খবরগুলোর পাশাপাশি সহকর্মীদের মৃত্যু আমাদের আরও যন্ত্রনা বাড়িয়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে আমি আমার প্রতিবেশী, সহকর্মী সবার কাছেই আবেদন করব বিন্দুমাত্র অসুস্থ হলেই চিকিৎসকের কাছে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যান। শুরুতেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে অনেক মৃত্যুই এড়ানো সম্ভব। অবহেলা করবেননা। করোনা মানেই কিন্তু মৃত্যু নয়। একমাত্র সচেতনতাই আমাদের এই ভয়ঙ্কর অতিমারি থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করতে পারে।”