নেই পূবালি হওয়া, নেই ত্রহ্যস্পর্শ যোগ! ইলিশ, তুমি কী পথ হারিয়েছ

192

নরেশ জানা: ১লা মার্চ থেকে ৩০শে জুন, ৬১ দিনের ব্যান পিরিয়ড বা প্রজননকালীন নিষেধাজ্ঞা। এ সময়ে জেলেদের সমুদ্রগামী হওয়া বারণ। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল কোভিড জনিত নিষেধাজ্ঞা। স্থানীয় মানুষ নিলামের বাজার খুলতে দেয়নি সংক্রমনের ভয়ে। সব মিলিয়ে ৯০ দিন বা তারও বেশি অপাপবিদ্ধ ছিল সমুদ্র। গায়ে গতরে বেড়েছে ইলিশ। মৎস বিজ্ঞানীরা বলছেনও যে বড় মাপের ইলিশ রয়েছে সমুদ্রে কিন্তু বাংলার পাতে ইলিশ নেই! আগস্টের ৭/৮ তারিখে মেরে কেটে ৭০ থেকে ১০০ টন ইলিশ মিলেছে বঙ্গোপসাগর মোহনায়, দিঘা, পেটুয়াঘাট, ডায়মন্ড হারবারে। মরুভূমিতে এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ার মত সেই ইলিশ উবে গিয়েছে বাজার থেকে, বাঙালির রসনা তৃপ্তি হয়নি।

বর্ষা প্রায় শেষ। আলকানন্দাপুরী তে যক্ষপ্রিয়ার কাছে শেষ চিঠি পৌঁছে দিয়ে কেরল, সিংহল হয়ে ফিরে যাবে মরশুমের শেষ মেঘদূত। কিন্তু এখনও বাঙালির পাতে পড়ল না ইলিশ। দেখাও মিলছে না জলের রুপোলি শস্যের। বাজারে হাতেগোনা ইলিশ এলেও, তাতে হাত দেওয়া যাচ্ছে না। এ বছর লকডাউনে দূষণ কম ছিল। বিধিনিষেধের জেরে মাছ ধরাও ছিল বন্ধ। তাই বর্ষার শুরুতে বিশেষজ্ঞ থেকে সাধারণ মানুষ বেশ জোর দিয়েই দাবি করেছিলেন, এ বছর প্রচুর ইলিশ মিলবে। কিন্তু কই?‌ কোথায় গেল সব ইলিশ?‌ এ পার বাঙালি যে পাতে মাথা খুঁড়ে মরছে। ইলিশ ভাপা, ইলিশ পাতুরি, সর্ষে ইলিশ, তেঁতুল দিয়ে ইলিশের মাথার টক, চিতল পেটি দিয়ে তেল ঝাল, গাদা দিয়ে স্রেফ কালো জিরে ছড়িয়ে পাতলা নলেন ঝোল। আর তারপরও তেলটুকু কাঁচের বোতলে যত্নে ধরে রেখে ইলিশ ছোঁয়া চচ্চড়ি!

করুণ সুর রাজ্য মৎস্য দপ্তরের এক আধিকারিকের গলায়। তিনি বলছিলেন, ‘‌পশ্চিমবঙ্গে প্রতি বছর গড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার ইলিশ পাওয়া যায়। সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে বেশি ইলিশ পাওয়া যায় ২০১৬ সালে। বর্ষার সময় মাছ যখন প্রজননের তাগিদে নদী ছেড়ে সমুদ্রে যায় তখনই ইলিশ মেলে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু অদ্ভুতভাবে এ বছর হাতে এসেছে মাত্র ১০০ টন ইলিশ। যদিও ওপার বাংলায় এবারও ইলিশ ভাল ধরা পড়ছে।’‌

আরও পড়ুন -  এবার লকডাউন বলবৎ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু পুলিশ আধিকারিকের

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিভাগীয় মৎস আধিকারিক কাঁথি, সমুদ্র উপকূলের দায়িত্বে থাকা সুরজিৎ বাগ এবছরের পথ হারানো ইলিশের তত্ত্বটা খোলসা করলেন। বললেন, “একেই বলে উপরওয়ালার মর্জি। এবছর সত্যি গুনগত ও পরিমানগত ভাল ইলিশের আশা করেছিলাম আমরা কিন্তু ইলিশ ধরার সেই মন্ত্রগুপ্তি কাজ করেনি এখনও।” কী সেই মন্ত্রগুপ্তি? বাগ বললেন, ” পুবালি বাতাস, ঝিরে ঝিরে বৃষ্টি আর শান্ত সমুদ্র। শান্ত সমুদ্রে মৎস শিকারিরা জাল পেতে বসে থাকবেন, ঝির ঝিরে বৃষ্টি হবে, পুবালি বাতাসের দিকে মুখ করে ইলিশের ঝাঁক উঠে আসবে বঙ্গোপসাগরের খাঁড়িতে। এবছর সমুদ্র উত্তাল হয়েছে বারবার ফলে প্রচন্ড জলের মোচড়ে স্থির হয়ে জাল পাতার সুযোগ প্রায় মেলেনি। বর্ষার সেই টানা ঝিরে ঝিরে বৃষ্টি নেই আর পুবের বদলে বয়েছে উত্তুরে বাতাস, যাকে দিক নির্দেশ করে ইলিশের ঝাঁক ছুটছে বাংলাদেশ আর মায়ানমারের পথে।”

আরও পড়ুন -  গভীর দুর্নীতি সবংয়ের ১০০দিনের কাজে, খতিয়ে দেখছেন প্রধান

বাগ আরও জানিয়েছেন,” আমরা সমুদ্রে ইলিশের অস্তিত্ব পেয়েছি। ইলিশ আছেও। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ওই যে সমুদ্র অস্থির হওয়ায় ট্রলার গুলি এক জায়গায় স্থায়ী হতে পারছেনা, জাল ফেলে ফের জাল গুটিয়ে নিয়ে অন্য জায়গায় জাল ফেলতে হচ্ছে এরই মধ্যে বেরিয়ে যাচ্ছে প্রচন্ড দ্রুতগামী ইলিশের ঝাঁক।”                                     ইলিশ যে বাংলাদেশে যাচ্ছে তার প্রমানও মিলেছে হাতে নাতে। সেখানকার বাজারে ইলিশের যোগান এতটাই বেশি যে, দাম না মিলছেনা দেখে চোরা পথে ভারতের বাজারে ইলিশ ঢুকছে বেশি দামের আশায়। ৫ অগস্ট বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচার করার সময় উত্তর ২৪ পরগনার পেট্রাপোল সীমান্তে ১২৬ কিলো পদ্মার ইলিশ বাজেয়াপ্ত করে বিএসএফ। যার আনুমানিক বাজারদর ১১ লক্ষ টাকারও বেশি।

এত গেল সমুদ্রের কথা কিন্তু নদী কথা কী বলছে? অগভীরতায় ডিম পেড়ে যে ইলিশের দল হলদিয়ার খাঁড়ি ছুঁয়ে রূপনারায়ন বা গঙ্গা বেয়ে কোলাঘাট কিংবা বাগবাজার ঘাটে গিয়ে দেখা দেন? মৎস বিজ্ঞানীরা বলছেন সে পথে পলির কুড়াল অনেক দিন আগেই মেরেছে বাঙালি। নদীবক্ষে জমে থাকা পলি তার অন্তরায়। বিজ্ঞানীদের মতে নদীগর্ভে ৮০–৯০ ফুট গভীরতা পেলেই স্রোতের অভিমুখে যেতে পারে ইলিশ। কিন্তু বছরের পর বছর পলি জমতে থাকায় পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাগ নদীর গভীরতা এখন এসে দাঁড়িয়েছে ২০–৩০ ফুটে। বর্ষায় ভাল বৃষ্টিপাত হলে গভীরতা খুব বড়জোর ৫০–৬০ ফুট পর্যন্ত হয়। তবে তাতে বিশেষ লাভ হয় না। ফলে ইলিশের ভাটা রূপনারায়ন, ভাগীরথীতে।

আরও পড়ুন -  ভোটের মুখে রাজ্য সমবায় সমিতি গুলিতেও এবার একগুচ্ছ পদে নিয়োগ, স্নাতক হলেই আবদেন করুন, সুযোগ ৩ এপ্রিল অবধি

দিঘা ফিশারমেন এন্ড ফিসট্রেডার্স আ্যশোসিয়েশনের সাধারন সম্পাদক শ্যামসুন্দর দাস জানিয়েছেন, ‘সত্যি বিষয়টা রহস্যের। আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, মৎসবিদদের পরামর্শ জানিয়েছিল ভাল ইলিশ মিলবে। কিন্তু গুনে কি পরিমানে অঙ্ক মেলেনি। তবুও ভরসা যে এখনও সময় আছে। কারণ, বাংলায় ইলিশ–মরশুম অক্টোবর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। অগস্ট, সেপ্টেম্বরে যদি ভাল বৃষ্টিপাত হয়, তবে বাঙালির পাতে প্রিয় মাছ পড়ার একটা সম্ভাবনা থাকছেই।’‌
মৎস অধিকর্তা বাগও তাই বলেছেন, ” পরিস্থিতি একটু বদলেছে পুবালি বাতাস বইতে শুরু করেছে। সমুদ্রও শান্ত আর মাঝে মধ্যে বৃষ্টি হচ্ছে। দেখা যাক এই ত্রহ্যস্পর্শ যোগে কপাল ফেরে কিনা। ঘরে ফিরে কিনা পথ ভোলার দল। অক্টোবরের ১৫ অবধি হাতে এখনও ২মাস !” বাঙালি এখন হাপুস নয়নে ছড়া কাটছে ,” ইলিশ ইলিশ করে মায়, ইলিশ গেছে কাদের নায়? পাতের ভাত বৃথাই যায়, ইলিশরে তুই দিঘায় আয়!

নেই পূবালি হওয়া, নেই ত্রহ্যস্পর্শ যোগ! ইলিশ, তুমি কী পথ হারিয়েছ 1