স্কুলের মধ্যেই প্রেম নিবেদন, মালাবদল আর জড়িয়ে ধরা! সতীর্থরাই ভিডিও করে ছড়িয়ে দিল! কোথায় যাচ্ছে ছাত্রছাত্রীরা

571
স্কুলের মধ্যেই প্রেম নিবেদন, মালাবদল আর জড়িয়ে ধরা! সতীর্থরাই ভিডিও করে ছড়িয়ে দিল! কোথায় যাচ্ছে ছাত্রছাত্রীরা 1

 

অশ্লেষা চৌধুরী: প্রথমে টুকটুকে লাল গোলাপ দিয়ে হাটু গেড়ে বসে প্রেম নিবেদন, এরপর পরস্পরকে আলিঙ্গন করে মালা পড়ানো থেকে শুরু করে একেবারে চুম্বন- কী ভাবছেন কোনও চলচ্চিত্রের শ্যুটিং সেট! একেবারেই নয়। স্কুল পোশাকে স্কুল প্রাঙ্গণে এমনই চরম অশালীনতায় মেতে বিতর্কের ঝড় তুললেন দুই পড়ুয়া। বাকরুদ্ধ করে দেওয়ার মতন এই ঘটনাটি ঘটেছে, উত্তর দিনাজপুর জেলার ইটাহার ব্লকের বানবোল উচ্চ বিদ্যালয়ে।

স্কুলের মধ্যেই প্রেম নিবেদন, মালাবদল আর জড়িয়ে ধরা! সতীর্থরাই ভিডিও করে ছড়িয়ে দিল! কোথায় যাচ্ছে ছাত্রছাত্রীরা 2

 

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলার পাশাপাশি সমগ্র শিক্ষামহলে বইছে নিন্দার বন্যা। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারদের অনুপস্থিতিতে বানবোল স্কুলের দুই পড়ুয়া মেতে উঠেছে চরম অশ্লীলতায়। আর সেই নোংরা মুহুর্তের ভিডিও রেকর্ড করে দিচ্ছে তাদেরই সহপাঠীরা। কীভাবে স্কুল প্রাঙ্গণে স্কুল পোশাকে এমন জঘন্য কাণ্ড তারা ঘটালো সেই নিয়ে ক্ষোভ জমেছে স্কুলের অন্যান্য বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী সহ অভিভাবকদের মধ্যে। অভিভাবকদের প্রশ্ন, স্কুল প্রাঙ্গণে যদি এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে ছেলে মেয়েদের কিভাবে স্কুলে পাঠাবো? এই বিষয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিপুল মৈত্র জানান,” আমি স্কুলের বাইরে আছি। আমি বিষটি শুনলাম। আমি স্কুলে গিয়ে অভিযুক্ত ছাত্র ছাত্রী সহ তাদের সাথে যারা ছিল তাদের সনাক্ত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহন করবো স্কুলের পক্ষ থেকে। অভিযুক্ত দের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। যাতে অন্য কোন ছাত্র ছাত্রী স্কুলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে এই ধরনের কাজ কোনদিন করতে না পারে।

 

তবে ঘটনা ঘিরে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে আরও একটি বিষয়- কিছুদিন আগেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পড়াশোনার সুবিধার্থে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের ট্যাব কেনার টাকা দিয়েছেন, এবারে সেই টাকা দিয়েই ট্যাব কিনে পড়ুয়ারা এমন অশ্লীল ভিডিও তৈরি করছে, তাও সহপাঠীদের সহযোগিতায়, যা কখনই কাম্য নয়, অর্থাৎ কাঠগড়ায় রাজ্য সরকারের দেওয়া ট্যাব।

 

তবে এমন ঘটনা কী সত্যিই এবারেই প্রথম হয়? না, শুরুটা হয়েছিল গত বছর রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। সেবার ক্যাম্পাসে বসন্ত উৎসবের সময় দেখা গিয়েছিল কিছু এই ধরণের চিত্র, যেখানে তিন তরুণীর পিঠে এবং দুই তরুণের বুকে লেখা ছিল আপত্তিকর কিছু শব্দ। সেই সময় ছবিটি হয়ে যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। তারপরই সমালোচনা ঝড় বয়ে যায় সর্বত্র। যদিও পাঁচ অভিযুক্তের কেউই রবীন্দ্রভারতীর ছাত্রছাত্রী ছিলেন না। হুগলি, চন্দননগর ও চুঁচুড়ার বিভিন্ন কলেজের পড়ুয়া ছিলেন তারা। তবে ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরেই কর্তৃপক্ষ সিঁথি থানায় অভিযোগ দায়ের করে এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ঘটনা ঘটার জন্য নৈতিকভাবে দায় স্বীকার করে ইস্তফা দেন।

 

তবে সেদিনের সেই ঘটনার আঁচ গিয়ে পৌঁছেছিল মালদায়। সেখানকার নামকরা একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের গাওয়া অশ্লীল গানের ভিডিও ভাইরাল হয়। সেই গানের শব্দগুলো এতটাই কুরুচিকর ছিল যা মুখে আনা একপ্রকার দায়। এই ঘটনার ফলে সেই সময় চরম অস্বস্তিতে পড়ে যায় স্কুল কর্তৃপক্ষ। ভাইরাল ভিডিওটিতে দেখা যায় একটি অতি পরিচিত গানকে অশ্লীলভাবে পরিবেশন করছে স্কুলের ইউনিফর্ম পরা চার ছাত্রী। স্কুল পোশাকে বিদ্যালয় চত্বরে হাতে মোবাইল নিয়ে তারস্বরে অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করে গান করছে ওই চার ছাত্রী। যে গানের শব্দের প্রতিটি অক্ষরে অত্যন্ত অশ্লীল এবং কুরুচিকর বাক্য প্রয়োগ করা হয়েছে। মোবাইল সেলফি কায়দায় ভিডিওটি তৈরি করে তারা। স্বাভাবিক ভাবেই ইন্টারনেটের দৌলতে অশ্লীল গানের ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যেতে সময় নেয় না। সেই ঘটনা শোরগোল ফেলে দেয় জেলা থেকে শুরু সর্বত্রই। ওই ছাত্রীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীও ওঠে। সেইসাথেই স্কুলের শিক্ষক- শিক্ষিকাদের দিকেও ওঠে আঙুল। অনেকেই বলেছিলেন, স্কুল চত্বরে গলা ফাটিয়ে যখন এই ধরনের অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করে গান করা হচ্ছিল, তখন কি স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকারা কেউ ছিলেন না? স্কুল কর্তৃপক্ষরা শুনতে পান নি কেন? সেই সময় তাদের বাধা দেওয়া হল না কেন? এই ধরনের ঘটনায় অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যেও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে । তার দায়ভার কে নেবে? শুধু তাই নয়, চলতি বছরে সরস্বতী পুজোর দিন বালুরঘাট কলেজে একটি নাচের ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় বিতর্ক ছড়ায় বালুরঘাটে। চটুল গানে উশৃঙ্খল নাচ এবং অশ্লীল আচরণ দেখতে পাওয়া যায়। জানা যায় তারা কোনও স্কুলের ছাত্রছাত্রী ছিল। যদিও কলেজের পক্ষ থেকে এমন ঘটনার কথা সেভাবে স্বীকার করা হয়নি।

 

আর এই সকল ঘটনার দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে ট্যাবের টাকাকে দায়ী করা যায় না। তাহলে বাকি দুটো কারণের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া যাক। বর্তমান যুগ ইন্টারনেটের যুগ, সবাই চায় আধুনিকতার চাদর জড়িয়ে উচ্চতার শিখরে পৌঁছাতে। এখন সবাই মত্ত নিজের পরিচিতি গড়তে, কত কম সময়ে নিজেকে জনপ্রিয় করা যায় সেই চেষ্টাই দেখা যায় অনেকের মধ্যে, বাদ নেই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও। আধুনিকতার ছোঁয়াতে যেন গা ভাসিয়ে এগিয়ে যেতে চায় তারাও। আর সেটা করতে গিয়েই হয়তো বারবার এই ধরণের কাণ্ড ঘটিয়ে বসছে তারা। আর এহেন সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে সকলকেই। অভিভাবক স্কুল কর্তৃপক্ষের নজর রাখা বা বোঝানোর পাশাপাশি পড়ুয়াদেরও হতে হবে সচেতন। উল্লেখিত প্রতিটি ঘটনাতেই শিক্ষার্থীরা ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে নিজেদের আচরণের জন্য ( সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনাটি নিয়ে পড়ুয়াদের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি), তারা নিজেদের ভুল স্বীকার করে নিয়েছে। অতএব শিক্ষার্‌থীদের সকলকেই মনে রাখতে হবে তারাই দেশের ভবিষ্যৎ, আধুনিকতা মানে নিজের ভাষা শালীনতা, সংস্কৃতি বিসর্জন দিয়ে নয়, এগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়াতেই তাদের আসল জয়।