৪দিনের লড়াই শেষে পরাজিত বাঁকুড়ার মইদুল! পুলিশের বেপরোয়া মারেই মৃত্যু তিন কন্যার পিতার

437
Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা: বাম ছাত্র-যুবদের নবান্ন অভিযানের দিন পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল নৃশংসভাবে লাঠি পেটা করার। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ফুটে উঠেছিল সেই বেপরোয়া মারের ছবি। আর সেই ছবির মধ্যে একটি ছবি ছিল বাঁকুড়ার মইদুল ইসলামের। মাথায় মারাত্মক ক্ষত নিয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়তে দেখা গিয়েছিল মইদুলকে, দেখা গিয়েছিল সেই মইদুলকে ঘিরে কয়েকজন পুলিশের উদ্যত লাঠি। সোমবার সকালে কলকাতার বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যু হল সেই মইদুল ইসলাম মিদ্যার। বাম নেতৃত্বের অভিযোগ, পুলিসের লাঠির আঘাতেই মৃত্যু হয়েছে যুব নেতার। ঘটনায় রাজ্য জুড়ে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে বামেদের তরফে। রাজ্য সরকারের নিন্দায় সরব হয়েছে বাম-কং-বিজেপি নেতারা। তাঁরা দাবি করেছেন, পুলিশের মারে পেটের ভেতরে মারাত্মক আঘাত লেগেছিল যার পরিনতিতে কিডনি সহ বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে গিয়েছিল। শাসকদলের পক্ষে কেউ কেউ দাবি করেছে আগে থেকেই কিডনি খারাপ ছিল ।
এই দাবিকে কটাক্ষ করে সিপিএম নেতা ফুয়াদ হালিম জানিয়েছেন, ‘‌৩১ বছরের ছেলের হঠাৎ কিডনি বিকল হয়ে গেল— এটা মারধর ছাড়া অন্য কোনও কারণে হতে পারে না। ‌ইতিমধ্যে আমরা পুলিশকে সবটা জানিয়েছি। পুলিশ এসে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। একটা এফআইআরও নথিভুক্ত করা হয়েছে। আশা করছি, মৃতদেহের ময়নাতদন্ত হবে। আর তাতেই পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার করে সামনে আসবে।’‌
সুজন চক্রবর্তী বলেন, “এটা একটা খুন। বাঁকুড়া গ্রামের ছেলে চাকরি চাইতে এসেছিলেন। বুকে-পিঠে- ঘিরে মেরেছে। সরকার তার ইতরতার সীমা ছাড়িয়েছে। খুনি সরকার। মানুষের কথা শোনার মতো কোনও সুযোগই রাখে না এই সরকার”। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আর এক বাম যুব কর্মী বলছিলেন, ‘‌ডোরিনা ক্রসিংয়ের সামনে পুলিশ আমাদের মিছিল আটকানোর সাথে সাথেই লাঠিচার্জ করতে শুরু করে। সঙ্গে ছোঁড়া হয় টিয়ার গ্যাস, জলকামান। সুস্থ, সবল মইদুলকে বিভৎসভাবে মারে পুলিশ। ও রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। আমরা এ ঘটনার তীব্র ধিক্কার জানাচ্ছি।’‌
ঘটনার জন্য সিপিএম নেতৃত্বকেই দায়ি করেছেন মন্ত্রী সুব্রত মুখার্জী। বলছেন, ‘যে কোনও মৃত্যু দুঃখজনক৷ যেভাবে গন্ডগোল পাকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল তাতে এরকম দুর্ঘটনা ঘটাই স্বাভাবিক৷ ওরা ডেড বডি চাইছিল৷ আমি পঞ্চাশ বছর লড়াই করছি৷ সিপিএম নেতাদের আমি হাড়ে হাড়ে চিনি৷ পুলিশ সেদিন প্রায় কিছু করেনি৷ কেউ যদি আত্মহত্যা করে তাহলে কিছু বলার নেই৷’
সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর অভিযোগ, ‘মইদুলকে ঘিরে ধরে মেরেছে পুলিশ৷ এটা মৃত্যু নয়, এটা খুন৷ কত লাশ চাই সরকারের? একটা জ্বলজ্য়ান্ত ছেলেকে লাশ বানিয়ে দিল৷ মানুষ এর জবাব দেবে।’

Advertisement

এদিন পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরা-সবং-পিংলায় পরিবর্তন যাত্রায় অংশ নিয়ে ঘটনার জন্য সিপিএমকেই দায়ী করে বিজেপি নেত্রী লকেট চ্যাটার্জী বলেন, যে কোনই মৃত্যুই খারাপ খবর। আমরা জানি তৃণমূল, সিপিএম,কংগ্রেস এক হয়ে আছে৷ নবান্নের ১৪ তলায় ফিস ফ্রাইয়ের আসরে সবাই বসে। শুধু এরা মাঠে এরা কর্মীদের নামিয়ে দেয়। আগামী দিনে দেখবেন এরা একদিকে আর বিজেপি একদিকে লড়ছে। এই ভাবে আন্দোলন করে মানুষকে মৃত্যুর পথে এগিয়ে দেওয়া এটা ঠিক না৷ সময়ে মানুষ জবাব দিয়ে দেবে।

Advertisement
Advertisement

মইদুলের মৃত্যুতে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন চলচ্চিত্র পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ও। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘ছাত্র যুবদের নবান্ন অভিযানে সরকারের ভাড়াটে গুন্ডাদের (পুলিশের) লাঠির ঘায়ে যুবক ফরিদ মিদ্যা শহিদ হলেন। যাঁরা রাজনীতিকে ‘খেলা’ মনে করছেন, তাঁদের উপরি রোজগার আছে। তাঁরা জানেন না যে বেকারত্বের জ্বালা, প্রতিবাদের মিছিল আর শহিদের মৃত্যু— এর কোনওটাই কিন্তু ছেলেখেলা নয়। নিঃস্ব জনগণ সে কথা জানেন। তাঁরাই সময়মতো এই অন্যায়ের জবাব দেবেন।’

বাঁকুড়ায় মইদুলের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তাঁর বিধবা মা তাহমিনা বিবি ও স্ত্রী আলেয়া বিবি ছাড়াও বাড়িতে রয়েছে তিন কন্যাসন্তানও। সোমবার ভোরবেলা তাঁর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে শোকস্তব্ধ গোটা পরিবার। সেই সঙ্গে মনের কোণে উঠে আসছে নানা আশঙ্কাও। বাড়ির এক মাত্র উপার্জনকারীর মৃত্যু যেন আচমকাই খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে গোটা পরিবারকে। প্রিয় ফরিদের মৃত্যুতে শোভে ভেঙে পড়েছে গোটা গ্রাম।