কয়লা মাফিয়া অনুপ মাঝি, জয়দেব মন্ডলের অনুগ্রহ কারা পেত? তালিকা ধরে ধরে তল্লাশি সিবিআইয়ের, সারদা নারদার পর এবার কয়লা কেলেঙ্কারি

654
কয়লা মাফিয়া অনুপ মাঝি, জয়দেব মন্ডলের অনুগ্রহ কারা পেত? তালিকা ধরে ধরে তল্লাশি সিবিআইয়ের, সারদা নারদার পর এবার কয়লা কেলেঙ্কারি 1

নিজস্ব সংবাদদাতা: শনিবার পশ্চিম বর্ধমান সহ রাজ্যের প্রায় ৪০টি ডেরায় তল্লাশির পর আরও কিছু তথ্য হাতে পেয়েছেন সিবিআই কর্তারা। যার সূত্র ধরেই নতুন করে জাল বিছাচ্ছেন তাঁরা আর এবার এই জালের লক্ষ্য কিছু হোমড়া চোমড়া রাজনৈতিক নেতা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সিবিআই সূত্র মোতাবেক আসানসোল-রানীগঞ্জের কয়লা মাফিয়া কাণ্ডে যে টাকার অঙ্ক জড়িত আছে তার পরিমান সারদা-নারদার চেয়ে কিছু কম নয়। সিবিআইয়ের হাতে ধরা পড়া পশ্চিম বর্ধমানের দুই শীর্ষ কয়লা মাফিয়া অনুপ মাঝি ওরফে লালা এবং জয়দেব মন্ডলকে জেরা করে এমনই লোমহর্ষক তথ্য মিলেছে।

এই মুহূর্তে অনুপ মাঝি আর তার সাকরেদ বা সহকারি জয়দেব মন্ডলকে গোপন একটি জায়গায় রেখে তল্লাশি চালাচ্ছেন সিবিআই আধিকারিকরা। শুধু বেআইনি কয়লার কারবারি নয় তারই সঙ্গে জানা গেছে তাঁদের অজস্র বেআইনি কারখানা, রিসোর্ট ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা। যার মধ্যে ২০টি অফিসে একযোগে তল্লাশি চালিয়েছেন Central Bureau অof Investigation (CBI), Enforcement Directorate(ED) এবং Directore of Revenue Intelligence (DRI) আধিকারিকরা। জানা গেছে এই হানায় যে কাগজপত্র ও তথ্যাদি পাওয়া গেছে তার সম্পত্তি মূল্য ২০হাজার কোটি টাকা!

কয়লা মাফিয়া অনুপ মাঝি, জয়দেব মন্ডলের অনুগ্রহ কারা পেত? তালিকা ধরে ধরে তল্লাশি সিবিআইয়ের, সারদা নারদার পর এবার কয়লা কেলেঙ্কারি 2

গত ১৪বছর ধরে অবিশ্বাস্য উত্থানের কয়লার কালো সাম্রাজ্যের এই দুই অধীশ্বরের টিকি এতদিন ছুঁতে পারেনি পুলিশ। বছরের পর বছর ধরেই পলাতক তাঁরা। তাঁদের বাজেয়াপ্ত করা পাসপোর্ট থেকে দেখা গেছে তাঁরা গেছেন কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর,বার্লিন, মিউনিখ,জেনেভা, লন্ডন এবং দুবাইতে। কিন্তু ১৯শে অক্টোবর ২০২০, দিনটা খারাপ ছিল মাঝি আর মন্ডলের জন্য। ধানবাদের পুলিশ সুপার অসীম বিক্রান্ত মিনজ অদ্ভুদ জাল বিছিয়ে ছিলেন সেদিন। ভারতের দীর্ঘতম সড়ক গ্র্যান্ট ট্যাংক রোড যা কিনা ভারতের সাথে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে জুড়েছে সেই পথে পড়ন্ত বিকেলে এক কৃত্তিম জ্যাম তৈরি করেন পুলিশ সুপার মিনজ। সন্ধ্যে গড়ানোর পর একে একে সেই জ্যামে ফাঁসতে থাকে বেআইনি কয়লা বোঝাই লরি ৫০,১০০,১৫০ লরি! হ্যাঁ এই পরিমাণ বেআইনি কয়লা চলে যেত দেশ এবং বিদেশেও। আটক করা হয় চালকদের। তাঁদের কাছ থেকে মেলে এক ধরনের কার্ড আর সেই কার্ডই ছিল বেআইনি কারবারের ছাড়পত্র। যা দেখিয়ে অবলীলায় কয়লা পাচার চলত, কেউ আটকাতো তাঁদের আসানসোল, দূর্গাপুর,ধানবাদের সেই কয়লাবহনকারী লরি চালকদের সূত্র ধরেই ৫০জন আধিকারিকের দলটি পৌঁছে যায় মাঝি আর মন্ডলের গোপন ডেরায়। দু’জনকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি প্রচুর নথি , জিনিসপত্র আর নগদ সহ ওইদিনই হাতে আসে ৪০কোটি !

সিবিআই সূত্র জানাচ্ছে ২জনই তদন্তকারী আধিকারিকদের যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন। লিখিতভাবে মাঝি এবং মন্ডল জানিয়েছেন যে, বিপুল পরিমাণ টাকা তাঁরা জেলার ও রাজ্যের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের পৌঁছে দিতেন যাতে তাঁদের এই কারবার অব্যাহত, মসৃন থাকে। সিবিআইয়ের এক সূত্র দাবি করেছে, ‘আমরা তাঁদের কাগজপত্র, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ইত্যাদি পরীক্ষা করে দেখেছি যে ১০০ থেকে ১৫০কোটি টাকা প্রতিমাসে পৌঁছে যেত বাংলার শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা এমনকি তাঁদের পরিবারের সদস্যদের কাছেও।’

সিবিআই জানাচ্ছে, সামান্য একজন মাছ বিক্রেতা থেকে গুঁড়ো কয়লার গুল বানিয়ে বিক্রি করা থেকে শুরু করা লালা এখন ২২টি প্রতিষ্ঠানের মালিক। আসানসোল, রানীগঞ্জ এলাকার সাড়ে তিনহাজার বেআইনি কয়লা খাদানের ওপর নিয়ন্ত্রন তাঁর আর প্রতি টন ১০হাজার টাকা মূল্যের এই কয়লা যা এলাকায় ডিস্কো কয়লা (রাজস্ব বিহীন) নামে পরিচিত প্রতিদিন ৬ থেকে ৭হাজার টন চালান হয় ২০০থেকে ২৫০লরিতে। লালা বা মাঝির সব মিলিয়ে দৈনিক ব্যবসার পরিমান ২০০কোটি টাকা। দুজনে মিলে টাকা বিনিয়োগ করেছেন মিনি স্টিল প্ল্যান্ট, বাইক কোম্পানি ছাড়াও নেপাল,হংকং ও থাইল্যান্ডের জুয়ার ক্যাসিনোতেও। মন্ডল একবার গ্রেপ্তার হলেও ২০১১তে জামিন পেয়ে যায়। বেআইনি অস্ত্রকারবারি হিসাবেও অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে।

শুধুই রাজনৈতিক যোগ নয় পাশাপাশি রয়েছে বিশাল আধিকারিক যোগ। আর এই যোগের কারণেই মূলত ইসিএলের পরিত্যক্ত বেআইনি কয়লাখনির দখল নিত এরা। সিবিআই নাম সংগ্ৰহ করেছে তাঁদেরও। শনিবার সেই তালিকা ধরেই রেড করে সিবিআই। সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার পশ্চিম বর্ধমানে ইসিএলের তিনটি এরিয়ায় হানা দিয়ে প্রয়োজনীয় নথি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তদন্তকারীরা কথা বলেছেন পরাশকোলে ইসিএলের এক উচ্চ পদস্থ আধিকারিক এবং কুনস্তরিয়া গেস্ট হাউসে এরিয়ার এক শীর্ষ কর্তার সঙ্গেও। এই রেড করার আগে শুক্রবার ইসিএলের পাঁচ আধিকারিকের বিরুদ্ধে এই তদন্তকারী সংস্থার দুর্নীতিদমন শাখায় (Anti Corruption bureau) অভিযোগ দায়ের করা হয়। তার পরে, এ দিন তদন্তকারী সংস্থার প্রতিনিধিদল অভিযান চালিয়েছে।

এই রেড চালানোর সময়ই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় এক অভিযুক্ত আধিকারিক ধনঞ্জয় রায়ের। সিবিআই তাঁর দপ্তরে হানা দিয়েছে জানার পরই বুকের ব্যথা নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরই তাঁর মৃত্যু হয়। সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, ইসিএলের পাণ্ডবেশ্বর ও কাজোড়া এরিয়ার দুই শীর্ষ আধিকারিক ছাড়াও এবং ইসিএলের তিন নিরাপত্তা আধিকারিক ও কর্মীর বিরুদ্ধে মাফিয়াদের মদত দেওয়ার অভিযোগ অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে যার মধ্যে সদ্য মৃত ধনঞ্জয় রায়ও ছিলেন। এছাড়া রেলের অজানা কিছু আধিকারিকও এই চক্রে যুক্ত বলে অভিযোগ সিবিআইয়ের। যদিও এই বিষয়ে অভিযুক্তদের কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে রাজ্য রাজনীতি এবার তোলপাড় হতে চলেছে সিবিআই আধিকারিকদের পরবর্তী ভূমিকায়। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী দলটি এবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সিংহের গুহায় হাত ঢোকানোর জন্য। জাল পাতার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে কয়েকজন রাজনীতিককে ধরার জন্য। এ বিষয়ে তালিকা প্রস্তুত করাও হয়েছে বলে জানা গেছে। বলা বাহুল্য পশ্চিম বর্ধমান থেকে কলকাতার তাবড় তাবড় ব্যক্তিত্ব রয়েছে তালিকায়। যদিও তাঁরা কতটা সফল হবেন তা দেখার। কারন বাংলার মানুষ আবার সারদা থেকে নারদা মামলায় সিবিআইয়ের সময়ে সময়ে তৎপরতার পাশাপাশি হঠাৎ করে চুপ হয়ে যাওয়াও দেখেছে। অভিযোগ উঠেছে ২০২১য়ের নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার খেলা চলছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করে, জবাবটা অবশ্য সিবিআইকেই দিতে হবে।