১৫ দিন বাদে ১২০০কিমি পেরিয়ে মেয়ের মুখ দেখলেন মা, শ্মশান দিলনা জঙ্গলমহলের গ্রাম

489
Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা: মেয়ের মৃত্যু হয়েছিল ৩১শে মার্চ। মৃত্যু হয়েছিল মাত্র একদিনের জ্বরে। দক্ষিন ২৪পরগনার বিষ্ণুপুর থানা এলাকার একটি আবাসিক স্কুলে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল ক্লাশ ফাইভে পড়া ওই জঙ্গলকন্যা। চিত্তরঞ্জন মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়ার পর সব শেষ! আর পাঁচটা শবর পরিবারের মেয়ের মতই নন্দিতা শবরেরও বড় হওয়ার স্বপ্ন থেমে গেছিল ১৩বছরে। বাবা ছেড়ে যাওয়া মা তখন অন্ধ্রপ্রদেশের বিজয়ওয়াডার গান্নাভরমের বরফ কলে লকডাউনে থমকে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিক। মেয়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে আছাড়ি পিছাড়ি কান্না ছাড়া গতি নেই।

Advertisement

ঝাড়গ্রাম জেলার প্রান্তিক জঙ্গল পাহাড় বেষ্টিত বেলপাহাড়ী থানার আরও প্রান্তিক এলাকা পুন্নাপানী গ্রাম। উষর পাথুরে মাটি ভেদ করে জে জল মেলে তাই পুণ্য মানু্ষের কাছে আর তাতেই গ্রামের নাম পুন্নাপানী। সেই গ্রামের ফুলমনী শবরকে বিয়ে করার পর ২কন্যা সন্তানকে মায়ের জিম্মায় ফেলে বাপ ফিরে গেছে নিজের গাঁ ঠাকুরান পাহাড়ীতে। আর দুই মেয়েকে নিখরচার হোস্টেলে রেখে ফুলমনী হয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশের বরফকলের শ্রমিক। শুধু ফুলমনী নয়, জঙ্গলমহল বদলে দেওয়ার দাবির রাজ্যে এখন ঘরে ঘরে ‘চল মিনি আসাম যাব’র দল। ফুলমনীর সাথে তাঁর ভাই, ভাইয়ের বউ, আরও অনেকে।
মেয়েকে শেষ দেখা দেখতে চায় ফুলমনী কিন্তু লকডাউনে অতটা পথ আসবে কী করে? আর লাশই বা থাকবে কোথায় ? এগিয়ে এসেছিলেন জঙ্গলমহলের সমাজকর্মী ঝরনা আচার্য্য। যাঁদের কেউ নেই তাঁদের ভগবান আছে কিনা জানা নেই তবে ঝরনা আছেন।

Advertisement
Advertisement

ডায়মন্ডহারবার পুলিশ, ঝাড়গ্রাম পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে ঝরনা আচার্য্যর কথা ও চিঠি চালাচালির পর এগিয়ে এসেছিলেন পুলিশ কর্তারা। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কথায় ফুলমনীকে বিশেষ পাশ ইস্যু করে ছাড়তে রাজি হলেন অন্ধ্রের পুলিশ কর্তারা কিন্তু ফিরবেন কিসে ? অনেক চেষ্টা করেও মেলেনি মাছ বা সবজির গাড়ি। অবশেষে ভাড়া গাড়ি করেই মঙ্গলবার ভোরে ১৫দিনের মাথায় চিত্তরঞ্জন মেডিক্যাল কলেজের মর্গে আছড়ে পড়ার সুযোগ পেলেন ফুলমনী।
কিন্তু পরের লড়াইটা যে আরও কঠিন  বুঝতে পারেননি মা । লড়াই মেয়েকে নিজের গ্রামের শ্মশানে দাহ করার। গ্রামের কিছু মানুষ শ্মশানে সাজিয়ে রেখেছিল চিতা।

ঝাড়গ্রাম পুলিশের সহযোগিতায়, বেলপাহাড়ী পুলিশের তত্বাবধানে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেহ ফিরেছিল পুন্নাপানীর দিকে কিন্তু গ্রামে দেহ ঢুকতেই দিলনা মানুষ। করোনায় মৃত্যু হয়েছে এই আভিযোগ তুলে ঘন্টার ঘন্টা রাস্তা ঘিরে রাখলেন আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারা। শত শত গ্রামবাসীর অবৈজ্ঞানিক ধারনার কাছে মায়ের কান্না, পুলিশের আশ্বাস কিছুতেই কোনও কাজ হলনা। গভীর রাতে দেহ ফিরিয়ে নিয়ে আবার ফেরা কলকাতায় তারপর বুধবার ভোরে মহানগরেরই এক শ্মশানে মায়ের কাছে বোনকে রেখে চির বিলীন হয়ে গেল জঙ্গলের কন্যাশ্রীর দেহ ।