আকাশমনির ওপারে চাঁদ হয়েই থেকে যাবেন হিমাংশু

148

মধুসূদন পাত্র: ২১শে জুলাই,২০২০ রাত তখন সাড়ে এগারোটা। পরিবার পরিজন বিনিদ্র প্রহর গুণে চলেছেন। জীবনের অন্তিম কাল স্পর্শ করে ফেললেন সবার প্রিয়, চোখের মণি হিমাংশু। নিঃশব্দে নীরবে নিজের অনেক কাজ, সাধের সাধনা অসমাপ্ত রেখে আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন তিনি। রেখে গেলেন এক উজ্জ্বল অধিকার। গরীব মেহনতি মানুষের বাঁচার লড়াইয়ে সহযোদ্ধা হিশাবে প্রেরণা যোগানোর মশালটি হাতে নিয়ে পথ হেঁটেছেন অক্লান্ত।

আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে কমরেড হিমাংশু দোলুই যোগ দেন গণনাট্য সংঘের ‘সংহতি’ শাখায়। সুদূর জকপুর থেকে শাখার সদর দপ্তর বুড়ামালাতে আসতেন সাইকেল করে। প্রায় দশ কি.মি. রাস্তা আপ ডাউনে ২০ কি.মি. কতটা মনের জোর থাকলে যাতায়াত করা যায়। রিহার্সাল হ’ত (গান বা নাটকের ) অধিকাংশ দিনই হরিনাতে। ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বাজতো। যদু, উৎপল, শিবানী, লক্ষীকান্তদের নিয়ে মহা উৎসাহে এভাবেই গণনাট্য সংঘের নেতৃস্থানীয় সদস্য হিশাবে দিনের পর দিন কাজ করেছিলেন। পরে জকপুর ডুবগোহালে এমন কি নিজের বাড়িতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন। জেলার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন বেশ কয়েকবছর। গান রচনায় নজর কেড়েছেন স্বনামধন্য বাসুদেব দাশগুপ্ত তথা শ্রীজীব গোস্বামীর।

জানতেন জমি জরিপের কাজ। ছুটির দিনে সাংস্কৃতিক কোন প্রোগ্রাম না থাকলে বেরিয়ে পড়তেন। জরিপের সুবাদে কত মানুষের দ্বন্দ্ব সমস্যা যে মিটিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই! মানুষের কাছাকাছি থাকবার পরিসরে মানুষের বিশ্বাস আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলেন। কত নিষ্ঠায় কত সাধারণ জীবন প্রবাহে ভালবেসে জয় করতে পেরেছিলেন তাঁর চারপাশের আবালবৃদ্ধবনিতাকে তাঁর জীবনই তার প্রমাণ।

আরও পড়ুন -  বাড়ি থেকে ডেকে খুন তৃনমূল নেতাকে, দলীয় কোন্দলেই খুন দাবি পরিবারের

ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রথম সারিতে তাঁর অবদান। তাঁর লেখা গান স্থান পেয়েছিল রাজ্যস্তরের রেকর্ডেড ক্যাসেটে। জনপ্রিয় হয়েছিল তাঁর অমর সৃষ্টি ‘চাঁদ উঠলো আকাশমনির গাছে’। কয়েকটি একাঙ্ক নাটকও লিখেছিলেন তিনি। ভাল অভিনয় করতেন। ‘সংহতি’ শাখার পর ‘সম্প্রীতি’ শাখার কর্ণধার ছিলেন। অসাধারণ সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল। ভালবেসে কাছে টেনে নিতে পারতেন সবাইকে। নিরহংকার গুণী মানুষ হিমাংশু উঠে এসেছিলেন
সাধারণ কৃষক পরিবার থেকে।

আরও পড়ুন -  এনআরসি আতঙ্কে পেটে ছুরি মেরে আত্মহত্যার চেষ্টার দাবি পূর্ব মেদিনীপুরে

একবছরও হয়নি তিনি অবসর গ্রহণ করেছিলেন সেলস্ ট্যাক্স ডিপার্ট্মেন্টের প্রধান করণিক (বড়বাবু) পদ থেকে। সবার প্রিয় ছিলেন সেখানেও। তাঁকে হারিয়ে খড়্গপুর গ্রামীণ এলাকার সাংস্কৃতিক আন্দোলন এক বড় ধাক্কা খেল, সন্দেহ নেই। রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক পরিসর যখন অত্যন্ত প্রতিকূল তখনো তিনি হাল ছাড়েননি। এই সেদিনও তিনি ঐকতান ক্লাবে(জকপুর) রবীন্দ্রজন্মোৎসবে অসুস্থতা সত্বেও যোগদান করেছেন। জকপুরে অনুষ্ঠিত বিদ্যাসাগরের দ্বিশতবর্ষ উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন। তারিখ ছিল মার্চের ৮। বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন তারপর থেকেই।
মৃত্যুকালে স্ত্রী, দুই কৃতী সন্তান ও পুত্রবধূকে রেখে গেলেন। এলাকার সমস্ত মানুষ তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারকে গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

আকাশমনির ওপারে চাঁদ হয়েই থেকে যাবেন হিমাংশু 1