ডেপুটি স্পিকার তথা বিধায়কের দেহ সৎকারকে ঘিরে নজির বিহীন বিক্ষোভ ঝাড়গ্রামে, চিতায় জল ঢেলে দেওয়ার হুমকি! শ্মশানের জন্য জমি দান করে দাহ করার অনুমতি মিলল

1919
Advertisement

পলাশ খাঁ: ঝাড়গ্রাম : এ যাবৎ কালের নজির বিহীন ঘটনার স্বাক্ষী রইল ঝাড়গ্রাম তথা সমগ্র রাজ্য। রাজ্য বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার তথা ঝাড়গ্রামের বিধায়ক সুকুমার হাঁসদার মৃতদেহ সৎকার কে কেন্দ্র করে শুক্রবার গ্রামবাসীদের সঙ্গে মন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বচসায় প্রায় ৬ ঘন্টা থমকে যায় সৎকারের কাজ। বচসা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে সৎকারের জন্য প্রস্তুত চিতায় জল ঢেলে দেওয়ার হুমকি দেন উপস্থিত মহিলারা। হাতে রীতিমত জল ভর্তি বালতি নিয়ে হাজির থাকতে দেখা যায় তাঁদের। বিরোধ মেটাতে প্রয়াত প্রাক্তন মন্ত্রীর পরিবারের তরফে সৎকার স্থলে স্থায়ী শ্মশানের জন্য ৫ ডেসিমেল বা ৩কাটা পরিমান জায়গা গ্রামকে দান করার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর প্রয়াত বিধায়কের সুকুমার হাঁসদার মৃতদেহ সৎকার করতে দেন গ্রামবাসীরা ।

Advertisement

উল্লেখ্য বৃহস্পতিবার কলকাতার একটি হাসপাতালে মৃত্যু হয় সুকুমার হাঁসাদার। ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। তার ওপর কোভিড সংক্রমনে মৃত্যু তরান্বিত হয় তাঁর। সন্ধ্যায় কলকাতা থেকে ঝাড়গ্রাম পৌঁছায় সুকুমার হাঁসদার মৃতদেহ। বৃহস্পতিবার রাতে ঝাড়গ্রাম শহরের রঘুনাথপুরের বাড়িতে এসে পৌঁছায়। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথমে স্থির হয় মন্ত্রীর ইচ্ছানুসারে তাঁর দেহ সৎকার হবে গ্রামের বাড়ি ঝাড়গ্রাম থানার সাপধরা গ্রাম পঞ্চায়েতের দুবরাজপর গ্রামের দেশেরবাড়িতে সৎকার ও পারলৌকিক কাজ হবে। রঘুনাথপুর থেকে দুবরাজপুরের দূরত্ব প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার। সেই মত প্রশাসনকে জানানো হয়। প্রশাসন উদ্যোগ নেয় সেইমত গ্রামের বাড়িতেই গান স্যালুট দেওয়ার।

Advertisement
Advertisement

যদিও বিধায়কের ছেলে সুরজিৎ হাঁসদা জানান, দুবারাজপুরের শ্মশানে দাহ কার্য হলেও পারলৌকিক কাজ ঝাড়গ্রামের বাড়িতেই হবে। কিন্তু এই নিয়ে মতবিরোধ হয় রঘুনাথপুর গ্রামের গ্রামবাসীদের সাথে। তাঁরা দাবি করেন সৎকার এই গ্রামের শশ্মানে করলে পারলৌকিক ক্রিয়াও এই গ্রামের বাড়িতেই করতে হবে। কিন্তু যে কোনও কারনেই হোক দুবারাজপুরে পারলৌকিক ক্রিয়া করতে রাজি হননি বিধায়কের পরিবার। তাঁরা ঠিক করেন রঘুনাথপুর থেকে আরও বেশ কিছুটা দূরত্বে ঝাড়গ্রাম শহর থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দুরে মন্ত্রীর পরিবারের একটি ৫ একরের রায়তি সম্পত্তি রয়েছে জাড়ালাটা মৌজায় একটি সেচ ক্যানেলের পাশে। সেখানেই দাহকার্য সম্পন্ন হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেই মত গান স্যালুট ও অন্যান্য প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হয়।

দুপুর ১১টা নাগাদ জাড়ালাটায় পৌঁছে যায় বিধায়ক তথা ডেপুটি স্পিকারের দেহ। ঝাড়গ্রামের জেলা শাসক আয়েশা রানী, পুলিশ সুপার অমিত কুমার ভরত রাঠোর ছাড়াও রাজ্যের জলসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী সৌমেন মহাপাত্র, রাজ্য সভার সাংসদ মানস ভুঁইয়া ছাড়াও পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা পরিষদের সভাধিপতি উত্তরা সিংহ হাজরা প্রমুখরা উপস্থিত হন। কিন্তু এর সাথে সাথে স্থানীয় গ্রামবাসীরাও জমায়েত হতে শুরু করেন। তাঁরা এখানে সৎকারের আপত্তি তোলেন। ঝাড়গ্রামের আইসি, বিডিও, এসডিপিও দফায় দফায় আলোচনার মাধ্যমে বোঝানোর  চেষ্টা করেন। প্রাথমিক ভাবে গান স্যালুটের কাজ শেষ হলেও মৃতদেহ চিতায় তুলতে গেলে তীব্র বিরোধ শুরু হয়। তাঁদের বক্তব্য, কেন গ্রামের বাড়ির শ্মশান ছেড়ে মৃতদেহ এখানে নিয়ে আসা হল? দ্বিতীয়ত: কেন এখানে মৃতদেহ আনার আগে গ্রামের সমাজের সঙ্গে কথা বলা হলনা এবং তৃতীয়ত: আদিবাসী রীতিনীতি মানা হচ্ছেনা সৎকারের সময়। বিশেষ করে যে জায়গা ঘোষিত ভাবে শ্মশান নয় সেই জায়গায় মৃতদেহ দাহ করা যায়না।

গ্রামবাসীরা দাবি করেন, আগে এই পুরো জায়গাটিকে শ্মশান বলে ঘোষনা করতে হবে তারপরই দাহ কার্য করতে দেবেন তাঁরা। এরই মধ্যে কেউ কেউ সাজানো চিতা থেকে কাঠ নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। পুলিশ তাঁদের সরানোর চেষ্টা করে। জেলাশাসক আয়েশা রানী তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করেন, এটি রায়তি জমি এখানে শ্মশান করা যায়না সরকার গ্রামের জন্য খাস জায়গায় উপযুক্ত পরিকাঠামো সহ শ্মশান বানিয়ে দেবে। কিন্তু তাতেও নিবৃত্ত হননি বিক্ষুব্ধরা। তাঁরা বিধায়ক পুত্রের সাথে বচসায় জড়িয়ে পড়েন। তাঁদের বলতে শোনা যায়, ‘ সমাজকে বিক্রি করে দিসনা, রাজনীতি করছিস বাবার মৃতদেহ নিয়ে।’
ইতিমধ্যেই প্রায় ২৪ঘন্টা পেরিয়ে যাওয়ায় মৃতদেহে মারাত্মক পচন শুরু হয়ে গেছিল। উদ্বেগ বাড়ছিল প্রশাসনের। মৃতদেহ চিতায় তোলার উদ্যোগ নিতেই ফের টানা হেঁচড়া শুরু হয়ে যায় দেহ নিয়ে।

পুলিশ সুপার অমিত কুমার ভরত রাঠোর যথেষ্ট ধৈর্য্য সহকারে পরিস্থিতির উত্তাপ সামাল দেন। বারংবার চেষ্টা করেন পরিবার বনাম সমাজের এই বিরোধ থেকে পরিস্থিতিকে বের করে আনার এবং পুলিশকে সংযত রাখার। এরপরই মৃতদেহ চিতায় তুললে একাংশের গ্রামবাসী জানিয়ে দেন, জোর করে মৃতদেহ সৎকারের চেষ্টা হলে জ্বলন্ত চিতায় জল ঢেলে দেবেন তাঁরা। জলের বালতি নিয়ে হাজিরও হয়ে যান মহিলাদের একটি দল।
প্রায় ঘন্টা খানেক চিতাতেই পড়ে থাকে মৃতদেহ।

গ্রামবাসীদের সঙ্গে ফের আলোনা করেন এসপি, ডিএম আলোচনা করেন। মন্ত্রী, সাংসদ হাত জড়ো করে দেহ সৎকারের জন্য গ্রামবাসীদের অনুমতি প্রার্থনা করেন। জাড়ালাটা গ্রামের বাসিন্দারা সেই একই বক্তব্য পেশ করেন, ‘গ্রামের যেখানে সেখানে দাহ করা যাবে না। শশ্মান থাকা দরকার। যেহেতু উনি দুবরাজপুরের বাসিন্দা। সেখানে বংশভিটা ছেড়ে কি করে দাহ করতে এসেছে। এখানে জায়গা থাকতে পারে। কিন্তু এখানে শশ্মান করা যাবেনা।’ এরপরই সুকুমার হাঁসদার পরিবার গ্রামবাসীদের শ্মশান নির্মাণের জন্য তিন কাটা জমি দেওয়ার মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিলে দিলে দেহ সৎকার করতে দেন গ্রামবাসীরা। শুধু তাই নয় সৎকার কার্যে হাত লাগান তাঁরাও। প্রায় বিকাল ৫টা নাগাদ অগ্নিসংযোগ করা হয় চিতায়।