Homeএখন খবরজীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-৮৫, চিন্ময় দাশ

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-৮৫, চিন্ময় দাশ

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল                                                             চিন্ময় দাশ
শিব মন্দির, বাসুদেবপুর হাটতলা (দাসপুর থানা, মেদিনীপুর)
মেদিনীপুর জেলার দাসপুর হল মন্দিরময় থানা। রূপনারায়ণ, শিলাবতী, কংসাবতী ইত্যাদি ছোট-বড় অনেকগুলি নদীর জলধারায় পুষ্ট দাসপুর। একদিকে উর্বরা ভূমির কারণে কৃষিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। অপরদিকে, এর সাথে যুক্ত হয়েছিল রেশম শিল্প। ওলন্দাজ, আর্মেনিয়াণ, ইংরেজ আর ফরাসিরা এই শিল্পে অংশগ্রহণ করায়, আর্থিক বিকাশ হয়েছিল দৃষ্টান্তস্বরূপ। রেশমশিল্পের দৌলতে, স্থানীয় অধিবাসী বহু পরিবারই বিশেষ সম্পন্ন হয়ে উঠেছিল।
অন্যদিকে ছিল থানা জুড়ে সুত্রধরদের বসবাস। টেরাকোটা ফলক নির্মাণে তাঁরা ছিলেন দক্ষ। তেমনই দক্ষতা ছিল দারুতক্ষণ বা কাঠখোদাইয়ে। কাঠের রথ, দেবতার সিংহাসন, দরজার পাল্লা ইত্যাদিতে তাঁদের খোদাই কাজের উৎকৃষ্ট নমুনা আজও দেখা যায়। ধনী পরিবার আর দক্ষ সূত্রধর– এই দুইয়ের মেলবন্ধনে থানা জুড়ে অজস্র দেবালয় গড়ে উঠেছিল এক সময়।
দাসপুর থানার বিখ্যাত এক গ্রাম বাসুদেবপুর। মেদিনীপুর জেলায় বিদ্যাসাগর মশাই যে ৪টি মডেল স্কুল স্থাপন করেছিলেন, তার একটি ছিল এই গ্রামে। অপরদিকে, বাসুদেবপুর হল মন্দিরময় গ্রাম। সপ্তদশ, অষ্টাদশ আর উনবিংশ শতাব্দী জুড়ে বহু দেবালয় নির্মিত হয়েছিল এই গ্রামটিতে। তার অধিকাংশই আজ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। চিহ্নটুকুও নাই আর। বহুসংখ্যক অতিশয় জীর্ণ বা বিলুপ্তির পথিক। তারই একটি জীর্ণ মন্দির নিয়ে আমাদের আজকের প্রতিবেদন।
দত্ত পদবীর একটি বনেদি পরিবারের ইতিবৃত্ত এটি। তাঁদের আদি বসবাস ছিল মুর্শিদাবাদ জেলায়। সরিষপুর মৌজার ঠেঙাপুর গ্রামে। নবাব দরবারের সাথে সুসম্পর্ক ছিল দত্তদের। সেই সুবাদে একটি জমিদারী সনন্দ, আর ‘ রায় ‘ খেতাব নিয়ে মেদিনীপুর চলে আসে পরিবারটি। রূপনারায়ণের পশ্চিমের এলাকা তখন অর্থসমৃদ্ধ। চেতুয়া পরগণার এই বাসুদেবপুর এসে বসত গড়েছিল পরিবারটি। জনৈক মূরলীধর দত্ত ছিলেন পরিবারের কর্তা।
পূর্ববর্তী গবেষকগণ তাঁদের বিবরণে বলেছেন, এই মন্দিরটি নির্মাণ করিয়েছিলেন জনৈক গুলাব রায়। কিন্তু আমরা সমীক্ষাকালে রায়বংশের প্রবীণ সদস্যদের যে সাক্ষাৎকার নিয়েছি, এবং এই বংশের যে পূর্ণ বংশলতিকা সংগ্রহ করেছি, তাতে গুলাব রায় নামে কোনও ব্যক্তির নামই নাই। আমরা নিঃসন্দেহ যে, পূর্বোক্ত মূরলীধরই বাসুদেবপুর গ্রামে এই রায়বংশ এবং কয়েকটি মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা।
বাসুদেবপুরে নিজের বসতবাড়ি নির্মাণের সাথে, কুলদেবতা রাধারমণের মন্দির, একটি বড় মাপের দুর্গাদালান এবং মহাদেব শিবের এই মন্দিরটিও মূরলীধরই নির্মাণ করিয়েছিলেন। রায়বংশের একাদশ পুরুষের কুলপঞ্জী মিলিয়ে হিসাব করলে, মুরলীধরের সময়কালটিই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নিম্ন বাংলা তথা মেদিনীপুর জেলায় দেবালয় দেখা যায় মুখ্য ৪টি রীতির– দালান, শিখর, রত্ন এবং চালা। দাসপুর থানাই নয় কেবল, এই বাসুদেবপুর গ্রামটিতেও চার রীতিরই মন্দির দেখতে পাওয়া যায়। মূরলীধর রায় যে তিনটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন, তিনটিই পৃথক পৃথক রীতির– দালান, শিখর এবং চালা। আমাদের বর্তমান আলোচ্য শিবের মন্দিরটি শিখর রীতিতে গড়া হয়েছে। কেবল তা-ই নয়, আরও একটি বৈশিষ্ট আছে মন্দিরটির, যা একান্তই বিরল।
বাসুদেবপুরের উল্লেখযোগ্য মন্দিরগুলি আমরা সমীক্ষা করেছি। প্রথমে সংক্ষেপে একটু বিবরণ দিয়ে রাখা যাক। গ্রামের চক্রবর্তীদের স্বরূপনারায়ণ ধর্ম মন্দির, মাসান্তদের রঘুনাথ মন্দির, মূরলীধরের দুর্গামন্দির দালান-রীতিতে নির্মিত। কামারনালা পাড়ায় চক্রবর্তীদের নব-রত্ন রীতির মহাপ্রভু মন্দির ছাড়াও, পঞ্চ-রত্ন রীতির অনেকগুলি মন্দির দেখা যায়। আর চালা-মন্দির তো গুণে শেষ করা যায় না। চক্রবর্তী পাড়ায় রণরামের আট-চালা মন্দির, চুড়ামণিডাঙার আট-চালা শিবমন্দির তার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
বাকি রইল শিখর-রীতি। এই গ্রামে শিখর-রীতির তিনটি মন্দির উল্লেখ করবার মতো। ন্যায়ভূষণ পাড়ার ২টি শিবমন্দির, আর বর্তমান আলোচ্য হাটপাড়ার এই শিবমন্দিরটি।
মেদিনীপুর জেলায় নির্মিত শিখর মন্দিরগুলিকে ৩টি ভাগে ভাগ করা যায়– ১. বিমান, অন্তরাল, জগমোহন, ভোগমন্ডপ এবং নাটমন্দির– এই পাঁচটি সৌধ সমন্বিত আদর্শ শিখর মন্দির। ২. সামনে জগমোহন, কিংবা ‘ প্রতিকৃতি জগমোহন ‘ সহ নির্মিত অধিকাংশ মন্দির। ৩. কেবলমাত্র বিমান (যে সৌধের গর্ভগৃহে দেবতার বিগ্রহ অধিষ্ঠিত থাকেন) সৌধটি নিয়ে নির্মিত একক একটি মন্দির। এই রীতির মন্দিরও জেলায় কম নাই।
মূরলীধরের নির্মিত আলোচ্য মন্দিরটি একক সৌধ হিসাবে নির্মিত হয়েছে। ইটের তৈরী, পশ্চিমমুখী, বর্গাকার মন্দির। আয়তনে তেমন বড় নয়– দৈর্ঘ্য-প্রস্থ সাড়ে ৮ ফুট, উচ্চতা ২৮ – ৩০ ফুট। এই মন্দির বিরল বৈশিষ্টের অধিকারী– এমন মন্তব্য আমরা করেছি। সে বিষয়ে কয়েকটি কথা বলা যাক।
একটি শিখর মন্দিরের বিমান সৌধের ৪টি অংশ। একেবারে নীচ থেকে সেগুলি হোল– পাদপীঠ বা ভিত্তিবেদী, বাঢ় (মানবদেহের সাথে তুলনা করলে, পায়ের পাতা থেকে কোমর পর্যন্ত অংশ), গন্ডী (কোমর থেকে কাঁধ পর্যন্ত) এবং শীর্ষক বা চূড়া (গলা থেকে মাথার উপর পর্যন্ত)।
বাঢ় এবং গন্ডী দুই অংশের গড়নের সাধারণ বৈশিষ্ট হোল– পাদপীঠের উপর থেকে বাঢ় অংশের দেওয়াল সরলরেখায় খাড়াভাবে উঠে, গন্ডীতে পৌঁছয়। এই অংশের নাম বরণ্ড, এখান থেকে গন্ডীর সূচনা। গন্ডীর দেওয়াল ক্রমশ কেন্দ্রাভিমুখী হয়ে, বেঁকিতে পৌঁছয়। অর্থাৎ বেঁকি অংশের প্রস্থের পরিমাপ ক্রমশ কমতে থাকে। এই হল সাধারণ নিয়ম।
কিন্তু এই মন্দিরের গড়ন ভিন্নতর এবং বিশিষ্ট। বরণ্ড থেকে গন্ডীর দেওয়াল কিছুটা পথ ক্রমশ বাইরের দিকে স্ফীত হয়ে অগ্রসর হয়েছে। (ছবিতে স্পষ্ট উপলব্ধি করা যাবে।) তারপর পূর্বোক্ত নিয়মে, কেন্দ্রাভিমুখী হয়ে বেঁকিতে মিলিত হয়েছে।
মন্দিরের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটিও আছে এই গন্ডী অংশেই। গন্ডীর বাইরের দেওয়াল গড়া হয়েছে একটি কলিঙ্গ-ধারা অনুসরণ করে। বিখ্যাত ‘ পীঢ় ‘ রীতির প্রয়োগ করে, দেওয়ালকে ভূমির সমান্তরালে, সরু সরু থাকে ভাগ করে, গড়া হয়েছে। এই রীতি সাধারণভাবে শিখর মন্দিরের সামনের জগমোহন সৌধের মাথার অংশে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। এখানে সেটি সরাসরি বিমান সৌধের মাথাতেই প্রযুক্ত হয়েছে। বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূম ইত্যাদি জেলায়, এই রীতির কিছু মন্দির দেখা যায়। কিন্তু মেদিনীপুর জেলায় এমন মন্দির বিরল। আমরা এখনও প্রত্যক্ষ করিনি।
মন্দিরের তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটি হল বাঢ় অংশের চার দেওয়ালে চারটি ‘ প্রতিকৃতি জগমোহন ‘ রচনা করা হয়েছে। অলংকরণ হিসাবে সামান্য কয়েকটি টেরাকোটার ফুল এবং কিছু পঙ্খের কাজ ছাড়া, তেমন কিছু নাই মন্দিরে। কিন্তু এই ‘ প্রতিকৃতি জগমোহন ‘গুলি বেশ গরিমা সৃষ্টি করেছে সৌধটিতে।
মন্দিরের চতুর্থ বৈশিষ্ট্যটি হল রথ-বিভাজন। বাঢ় এবং গন্ডী অংশ জুড়ে ‘পঞ্চ-রথ’ বিভাজন করা। একটি রাহাপাগ, দু’পাশে দুটি অনর্থপগ, এবং দুই কোণে দুটি কনকপগ। কিন্তু, অনর্থপগ এবং কনকপগ অংশগুলি অতি সংক্ষিপ্ত করে, প্রশস্ত করে গড়া হয়েছে রাহাপাগটিকে, যা চোখে পড়বার মতো।
পঞ্চম বৈশিষ্ট্য এই মন্দিরের বিগ্রহ। কষ্টিপাথরে গড়া বিগ্রহটি মন্দির বা গর্ভগৃহের অনুপাতে বেশ বড় আকারের।
জমিদারি উচ্ছেদের পর পরই সেবাপূজা থেমে গিয়েছিল মন্দিরে। বিগত প্রায় ৫০ বছর যাবৎ মন্দিরটি পরিত্যক্ত। তিল তিল করে অবলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে। ঐতিহ্য রক্ষায় কোনও তাগিদ নাই আমাদের।
সফর-সঙ্গী : শ্রী সুগত পাইন, প্রাবন্ধিক– দাসপুর।
সাক্ষাৎকার : সর্বশ্রী নবীন রায়, সুব্রত দাস– বাসুদেবপুর। অলোক রায়– চুঁচুড়া, হুগলি।
যাওয়া-আসা : দ. পূ. রেলপথের পাঁশকুড়া স্টেশন, কিংবা ৬ নং জাতীয় সড়ক মুম্বাই রোডের মেচগ্রাম থেকে উত্তরে ঘাটালমুখী পথে বৈকুণ্ঠপুর। সেখানে নেমে সামান্য পুবমুখে হাটতলা এবং মন্দির।

RELATED ARTICLES

Most Popular