জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-৮৭, চিন্ময় দাশ

209
Advertisement

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল                                                                           চিন্ময় দাশ
বিষ্ণু মন্দির                                        গড় কৃষ্ণপুর। বেলদা, পশ্চিম মেদিনীপুর
” বর্গী এলো দেশে “– এই শব্দবন্ধের সাথে আমরা সকলেই পরিচিত। কিন্তু সেই বর্গীবাহিনীকে মোকাবিলা করতে কী হয়রানি হয়েছিল বাংলার নবাবের, তার বিশদ কথা মনে নাও থাকতে পারে। সময়ও তো কম নয়। পৌনে তিনশ’ বছরেরও আগের কথা। সেকারণে, গোড়াতেই বরং একটু পিছন ফিরে দেখে নিই আমরা।
বাংলায় বর্গী আক্রমণের সূচনা ভোঁসলে রাজার দেওয়ান ভাস্কর পন্ডিতের নেতৃত্বে। ৪০ হাজার অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে, বিহারের পঞ্চকোট পাহাড় হয়ে, বাংলায় ঢুকে পড়ত বাহিনী। তাদের মোকাবিলায়, ১৭৪০, ‘৪২, ‘৪৪ সালগুলিতে বারংবার যুদ্ধ করেছেন আলীবর্দী। শেষে তিতিবিরক্ত হয়ে, ছলনা করে ভাস্কর পন্ডিতকে হত্যা করেছেন। তারই প্রতিশোধ নিতে, বিপুল সৈন্য নিয়ে, স্বয়ং রঘুজী ভোঁসলে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বাংলায়। মেদিনীপুর, শাহবন্দর, ভোগরাই, জলামুঠা, পটাশপুর ইত্যাদি পরগণাগুলি দখল করে নিয়েছিল বর্গীরা।
১৭৫০-৫১ সাল। তরুণ সিরাজ-উদ-দৌলাকে নিয়ে আলীবর্দী মেদিনীপুর দুর্গে এসে ঘাঁটি গেড়ে বসলেন। সিরাজ গেলেন যুদ্ধে। ধাওয়া করতে করতে, সুবর্ণরেখা পার করে একেবারে বালেশ্বর পৌঁছে, তখনকার মত, বর্গীদের পরাস্ত করলেন সিরাজ।
আমাদের আজকের জার্নালের ইতিহাস শুরু সিরাজের ফিরতি পথে। নবাবের বাহিনীতে এক সৈনিক ছিলেন মহাবীর দেও। রাজপুতানার অধিবাসী মহাবীর নবাবের সেনাবাহিনীতে ঢুকেছিলেন ১৭৪১ সালে, মাত্র ২০ বছর বয়স তখন। টানা ১০ বছর যুদ্ধ করে করে ক্লান্ত। হানাহানি কাটাকাটিতে হাঁপিয়ে উঠেছেন। বালেশ্বর থেকে সিরাজ যখন ফিরে আসছেন, সুবর্ণরেখা পার হয়ে, দেউলী (বর্তমান– বেলদা) পৌঁছে, বাহিনী থেকে বেরিয়ে গেলেন মহাবীর।
গভীর তিতিক্ষায়, সৈনিকের জীবনধারা চিরকালের মত ভাসিয়ে দিয়ে এলেন সুবর্ণরেখার স্রোতে। সৈনিক থেকে গৃহীজীবন বেছে নিলেন মহাবীর। জীবিকা হিসাবে বাছলেন মহাজনীকে।
মহাজনী কারবার জমে উঠল অচিরেই। স্থানীয় বাঙালি কন্যাকে বিবাহ করলেন। বাংলা ভাষা বলা শুরু হল। কুলপদবী ‘রাও’ কবে ‘দেব’ হয়ে উঠল, কিংবা রাজপুতানার ‘শোলাঙ্কি’ কখন নির্ভেজাল ‘বাঙালি’ হয়ে গেলেন, সেসব খবর রাখেনি কেউ। হয়ত তিনি নিজেও না।
যাক সেসব। মহাবীরের পুত্রের নাম হয়েছিল– ভরত চন্দ্র। ভরতের পুত্র আনন্দরাম। এইভাবে চার-পাঁচ পুরুষ কেটে গিয়েছে। পদবীও হয়ে গিয়েছে– দেব। ফুলে ফেঁপে উঠেছে মহাজনী ব্যবসাও। সেসময় দেব-বংশে এক পুরুষের আবির্ভাব হয়। তিনি রাধামোহন দেব, জন্ম ১৮৭১ সাল। যেমন ক্ষুরধার বুদ্ধি, তেমনই দূরদৃষ্টি তাঁর।
সেসময় মেদিনীপুর জেলার দক্ষিণ অংশে খ্যাতিমান জমিদার ছিলেন নারায়ণগড়ে পালবংশের রাজারা। বেশ কিছু ছোট-বড় ইজারাদার ছিলেন তাঁদের অধীনে। তেমনি একজন ইজারাদার ছিলেন স্থানীয় সৎপতি বংশ। একবার রাধামোহনের কাছে ঋণ নিয়েও, শোধ করতে পারছিল না সৎপতিরা।
রাধামোহন ভুলেও তাগাদা দেননি। তারপর? দেশে তখন ‘সূর্যাস্ত আইন’ প্রচলিত। কড়ার মত, টাকা শোধের শেষ দিনেও চুপ করে রইলেন। যেই সূর্যদেব অস্ত গেলেন, অমনি উদিত হলেন রাধামোহন। কৃষ্ণপুর, দেউলী (আজকের বেলদা), দেশন্দা, আসন্দা, সালাজপুর সহ কয়েকটি মৌজা নিয়ে সৎপতিদের পুরো জমিদারিটাই রাধামোহন অধিকার করে নিলেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৬ বছর।
তেজারতির চেয়ে জমিদারী চালানো অনেক বড় দায়। দোতলা কাছারিবাড়ি গড়লেন। বসবাসের জন্য বিরাট অট্টালিকা। সামনেই গড়লেন শিখর দেউল রীতির একটি দেবালয়। পুরোটাই প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। ব্যাদিত-বদন দুটি সিংহলাঞ্ছিত দেউড়ী। তার মাথায় নহবতখানা। দু’বেলা আরাধনার সময় সানাই আর পাখোয়াজের সুর ছড়াতে লাগল বাতাসে। বাস্তুর বাইরে থেকে বিশাল এলাকা ঘেরা হোল গড়খাই কেটে। সেদিন থেকে গ্রামের নাম হোল– গড় কৃষ্ণপুর।
জমিদারের কথা অনেক হোল। এবার আমরা মন্দির আর তার গঠন-রীতিটি একবার দেখে নিতে পারি।
ইটের তৈরী দক্ষিণমুখী মন্দির। সামনে একটি জগমোহন, আর পিছনে বিমান বা মূল মন্দির– এই দুটি অংশ নিয়ে ‘শিখর-দেউল’ রীতিতে দেবালয়টি নির্মিত হয়েছে। মেদিনীপুর জেলায় এই শিখর-দেউল রীতিটি এসেছে পড়শী রাজ্য ওডিশা থেকে। একটি আদর্শ শিখর-দেউল মন্দিরের মোট ৫টি অংশ থাকে। সামনের দিক থেকে– নাটমন্দির, ভোগমন্ডপ, জগমোহন, অন্তরাল এবং বিমান বা মূল মন্দির। তবে, ৫টি অংশ নিয়েই নির্মিত হয়েছে, এমন মন্দির সংখ্যায় বেশি নয়। অন্তত মেদিনীপুর জেলায়।
এই জেলায় দেখা যায়, বেশ কিছু মন্দির একক বিমান সৌধটি নিয়েই নির্মিত হয়েছে। আবার, বেশ কিছু মন্দির আছে, যেগুলি নির্মিত হয়েছে পিছনের তিনটি অংশ নিয়ে। সেক্ষেত্রে মাঝখানে ‘অন্তরাল’ নামের ক্ষুদ্র একটি সৌধ, জগমোহন এবং বিমানকে জুড়ে রাখে। কিন্তু কয়েকটি মন্দির আছে, যেগুলি কেবল জগমোহন আর বিমান– এই দুটি অংশ নিয়ে নির্মিত। এক্ষেত্রে দেখা যায়, মাঝখানের অন্তরাল নাই। সেকারণে, দুটি সৌধের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব থাকে না। সামনের জগমোহনটি পিছনের বিমান সৌধের সাথে লেপ্টে থাকে। অর্থাৎ, জগমোহনের পিছনের দেওয়ালটি নির্মিতই হয় না। কৌতূহলীরা ছবিতে সেটি প্রত্যক্ষ করতে পারবেন। যাকগে, এতসব কারিগরী তত্ত্বকথা পাঠক-পাঠিকার পছন্দ নাও হতে পারে। আমরা মন্দিরটির দিকে তাকাই বরং।
জগমোহনটি পীঢ় রীতি মেনে নির্মিত। এর মাথার তিনদিকের ছাউনি ২৬টি ঘণ ‘থাক’ কেটে রচিত হয়েছে। নীচে বাঢ় অংশে ‘কলাগেছ্যা’ রীতির গুচ্ছ থাম, আর খিলান-রীতির তিনটি দ্বারপথ। দুর্গাপূজার জন্য, দালান-রীতির একটি দুর্গাদালান নির্মাণ করা হয়েছিল, বিষ্ণুমন্দিরের লাগোয়া পূর্বদিকে। সামনে খিলান- রীতির তিনটি দ্বারপথ যুক্ত অলিন্দ। পিছনে এক-দ্বারী গর্ভগৃহ। সেই দালানেরও ভারী জীর্ণদশা। জগমোহন এবং দুর্গাদালান– দুটিতেই পূর্ব ও পশ্চিমে একটি করে দ্বার আছে।
বিমানটি শিখর রীতির। সেটির বাঢ় ও গন্ডী অংশ জুড়ে ‘নব-রথ বিন্যাস’ করা। মাঝখানে ‘রাহাপাগ’, দুই কোণে দুটি ‘কনকপগ’ বা কোণাপাগ এবং এই দুয়ের মধ্যবর্তী দু’দিকে তিনটি করে ছ’টি ‘অনর্থপগ’ বা অনুরথ– এই নিয়ে নব-রথ। গর্ভগৃহের একটিই দ্বারপথ, খিলান রীতির। অবশ্য পশ্চিম দিকে আরও একটি দ্বারপথ আছে।
বিমান এবং জগমোহন দুটি অংশেরই শীর্ষক বা চূড়াটি বেশ সুরচিত। প্রলম্বিত বেঁকি, সুদৃশ্য আমলক, খাপুরি, দুটি করে কলস এবং উপরে একটি পদ্মকোরক। তবে, মাথার ‘চক্র’টি বর্তমানে নাই, বিলুপ্ত।
তেমন কোনও অলঙ্করণ নাই মন্দিরে। ৬৩টি টেরাকোটা ফলক দেখা যায়। জগমোহনের সামনের অংশে ছোট ছোট খোপে সেগুলি লাগানো। এছাড়া, অনুরূপ ফলক ছিল গর্ভগৃহের দ্বারপথের দু’দিকেও। তবে বর্তমানে ভারী জীর্ণ দশা সেগুলির। এছাড়া, বিমান সৌধের পূর্ব ও পশ্চিম দিকে বরন্ডীর উপরে, একটি করে প্রতিকৃতি দ্বারপথ এবং গবাক্ষ রচিত আছে। অনুরূপ নির্মাণ আছে গর্ভগৃহের পূর্বদিকের দেওয়ালেও। এগুলিও মন্দিরে সৌন্দর্য সৃষ্টির উদাহরণ।
সাক্ষাৎকার : সর্বশ্রী প্রবীর চন্দ্র দেব। হৃষিকেশ মিশ্র, গোবিন্দ মিশ্র (২ পুরোহিত)– গড় কৃষ্ণপুর।
পথ-নির্দেশ : মেদিনীপুর কিংবা খড়্গপুর থেকে দক্ষিণে, সোনালী চতুর্ভুজ-এর ৬০নং জাতীয় সড়কে, বেলদার ২ কিমি আগে, শ্যামপুরা স্টপেজ। বেলদা স্টেশন হয়েও, এখানে আসা যাবে। শ্যামপুরা থেকে ২ কিমি পশ্চিমে গড় কৃষ্ণপুর গ্রাম ও জমিদারবাড়ির সাথে মন্দির। এটিও মোটরেবল রাস্তা।

Advertisement

Advertisement
Advertisement