জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-৯৬ ।। চিন্ময় দাশ

122
জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-৯৬ ।। চিন্ময় দাশ 1

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল– ৯৬                                                                             চিন্ময় দাশজীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-৯৬ ।। চিন্ময় দাশ 2মুক্তেশ্বর শিব মন্দির, পানিপারুল                                                       (এগরা, পূর্ব মেদিনীপুর)

মেদিনীপুর জেলার দক্ষিণের এলাকা পার্শ্ববর্তী ওডিশা রাজ্যের সীমান্তবর্তী। দ্বাদশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ– দীর্ঘ সাড়ে চার শ’ বছর। বর্তমান মেদিনীপুর জেলার সিংহভাগ এলাকা ওডিশার শাসকদের অধীনে ছিল। সেই সময়কালে ওডিশার বহু সম্পন্ন আর সাধারণ পরিবার ওডিশা থেকে মেদিনীপুর জেলায় চলে এসে, এই জেলার স্থায়ী অধিবাসী হয়ে গিয়েছিলেন।
ওডিশার পুরী জেলার এক বর্ধিষ্ণু জনপদ কাঁশবাঁশ গ্রাম। সপ্তদশ শতকের শেষভাগ তখন। জনৈক নারায়ণ দাস মহাপাত্র ছিলেন কাঁশবাঁশ গ্রামে একটি ধনী পরিবারের কর্তা। তিনি সপরিবারে ওডিশা লাগোয়া মেদিনীপুর জেলার শীপুর পরগনায় চলে এসেছিলেন। পাঁচরোল নামের একটি গ্রামে বসবাস শুরু করেন তিনি।
কেউ বলেন, তিনি জাতিতে ছিলেন করণ সম্প্রদায়ভুক্ত। কেউ বলেন, রাজপূত ক্ষত্রিয় ছিলেন তিনি। জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-৯৬ ।। চিন্ময় দাশ 3যাইহোক, মেদিনীপুরে এলেন যখন, জেলাজুড়ে চৈতন্যদেব প্রবর্তিত গৌড়ীয় প্রেমধর্মের প্রবল স্রোত বহমান। তাতে অবগাহন করল তাঁর পরিবার। বৈষ্ণবীয় দেবসেবার প্রচলন করা হল। তিন-তিনটি বড় আকারের মন্দির গড়া হল– শিখর-দেউল রীতির রাধাবিনোদ মন্দির, দালান-রীতির ষড়ভূজ মন্দির এবং মদনমোহন মন্দির।

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-৯৬ ।। চিন্ময় দাশ 4

শ’-দুই বছর আগের কথা। পাঁচরোল জমিদারি মহালের ভিতরের এক প্রাচীন গ্রাম– পানিপারুল। সেখানে মহাদেবের স্বপ্নাদেশ পেয়ে, মাটির ৭/৮ ফুট নিচে একটি বড় আকারের শিবলিঙ্গ-এর সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু শত চেষ্টাতেও, লিঙ্গবিগ্রহটিকে তুলে আনা সম্ভব হয় না। তখন গ্রামবাসীদের সিদ্ধান্তে, বিগ্রহটিকে নিজের অবস্থানে রেখেই, পূজার প্রচলন করা হয়। গ্রামবাসীগণই দেবতার নামকরণ করেন– বাবা মুক্তেশ্বর শিব।জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-৯৬ ।। চিন্ময় দাশ 5
সেসময় জমিদার বংশে ক্ষমতায় ছিলেন জনৈক গোপীমোহন দাস মহাপাত্র। সংবাদ জেনে, জমিদার স্বয়ং আসেন মুক্তেশ্বর-এর দর্শনে। মাটির অস্থায়ী মন্দির বদল করে, জমিদারি কোষাগার থেকে, বড়সড় একটি স্থায়ী মন্দির নির্মাণ করে দেন তিনি। আজও সেই মন্দির নিজের মহিমা নিয়ে বিরাজমান।

নিত্যপূজা ছাড়াও, লাগাতার ভক্তদের পূজা লেগেই থাকে মন্দিরে। চৈত্রের শেষ চার-পাঁচ দিন থেকে বৈশাখের প্রথম সপ্তাহ জুড়ে, বিপুল আড়ম্বরে গাজনের আয়োজন হয় এখানে। গ্রামবাসীরাই সমস্ত কর্মকান্ডের ধারক-বাহক। ‘শ্রীশ্রী মুক্তেশ্বর সেবাইত ট্রাস্ট ‘ নামে বিধিবদ্ধ কমিটি আছে সেবাপূজা পরিচালনা এবং মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য।জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-৯৬ ।। চিন্ময় দাশ 6
৪ ফুট উঁচু আর ২৫ ফুট দৈর্ঘ্য-প্রস্থের প্রশস্ত পাদপীঠের উত্তর মন্দিরটি স্থাপিত। শিখর-দেউল রীতিতে নির্মিত ইটের তৈরী পূর্বমুখী মন্দির। মন্দিরের দুটি অংশ– জগমোহন এবং বিমান বা মূল মন্দির। দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ২০ ফুট। বিমানের উচ্চতা আনুমানিক ৬০ ফুট, জগমোহনটির উচ্চতা ৩০ ফুট। আড়াই ফুট প্রশস্ত একটি প্রদক্ষিণ-পথ মন্দিরকে বেস্টন করে আছে।
জগমোহনে প্রবেশের জন্য পূর্বদিকে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণে একটি করে– মোট পাঁচটি দ্বারপথ। গর্ভগৃহে দ্বারপথ একটিই। ৬টি দ্বারই খিলান-রীতিতে রচিত।

বিমান সৌধের চার দিকের দেওয়াল ‘রথ-বিভাজন’- করা– একটি রাহাপাগ, চারটি অনর্থপগ এবং দুই কোণে দুটি কনকপগ। বাঢ় এবং গন্ডীর বিভাজক বরণ্ডটি প্রকট। অপরদিকে, জগমোহন সৌধের উপরের গন্ডী অংশটি ২০টি থাক-এ ঘণনিবদ্ধ পীঢ়-রীতিতে রচিত। দুটি সৌধেরই মাথায় বেঁকি, আমলক, কলস, ত্রিশূল-দন্ড স্থাপিত। মন্দিরে কোনও অলংকরণ নাই।জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-৯৬ ।। চিন্ময় দাশ 7
পরবর্তীকালে মন্দিরের সামনে সমতলবিশিষ্ট ছাদের একটি ষোড়শ-দ্বারী নাটমন্দির নির্মিত হয়েছে। মন্দিরের লাগোয়া একটি ভোগঘর, এবং কুণ্ড পুকুর অবস্থিত।
সাক্ষাৎকার : সর্বশ্রী পরিমল পাত্র, প্রবীর পাত্র, দুর্গাশঙ্কর ভারতী– পানিপারুল।
জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-৯৬ ।। চিন্ময় দাশ 8 : মেদিনীপুর-খড়্গপুর কিংবা কাঁথি থেকে এগরা পৌঁছে, রামনগর মুখী পথের উপর পানিপারুল বাজার। সেখানে দু’পা হাঁটলেই মন্দির। দিঘাগামী পথে, রামনগরে নেমে, পানিপারুল আসা যাবে। সমস্ত পথই মোটরেবল।

Previous articleনির্বাচনের আগের রাতেই বাম শিবিরে করোনার বিষ ছোবল; জঙ্গিপুরের আরএসপি প্রার্থী প্রদীপ নন্দীর মৃত্যুতে শোকাহত বাম শিবির
Next articleআজকের রাশিফল একনজরে