Homeএখন খবরজীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-৯৭ ।। চিন্ময় দাশ

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-৯৭ ।। চিন্ময় দাশ

Advertisement

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল                                                                             চিন্ময় দাশ
রাধাগোবিন্দ মন্দির. দক্ষিণ করকাই                        (পিংলা, পশ্চিম মেদিনীপুর)                     ‘করকাই’ নামে তিনটি গ্রাম আছে পিংলা থানায়– করকাই (জে. এল. নং ১৩৮), করকাই বাটিটাকি (১৩৭) এবং করকাই বাটিটাকি ওরফে কড়াভাঙ্গা (৮১)। খান্দার পরগণার অধীন এই তিন গ্রামের দুটিতে দুটি দেবালয় গড়েছিলেন এক জমিদার। তারই একটি নিয়ে আমাদের আজকের প্রতিবেদন।
দেবালয়, দেবতার বিগ্রহ বা প্রতিষ্ঠার কথা বলবার আগে, প্রতিষ্ঠাতার কথাটি বলে নেব আমরা। দ্বাদশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত– দীর্ঘ সাড়ে চারশ’ বছর ওডিশার রাজাদের শাসনে ছিল মেদিনীপুর জেলার সিংহভাগ এলাকা। সেসময় ওডিশা থেকে বহু বনেদি ধনবান পরিবার বাংলার এই জেলায় চলে এসেছিলেন।
মেদিনীপুরের লাগোয়া বালেশ্বর জেলা থেকে তাম্বুলী জাতিভুক্ত এক বণিক এই জেলায় চলে আসেন। বণিকের নাম– ভিখারী রক্ষিত। কংসাবতী আর শিলাবতী– দুই নদীর অববাহিকা অঞ্চল চিরকাল উর্বর কৃষিভূমি হিসাবে পরিচিত। সমগ্র ঘাটাল মহকুমা, ডেবরা, পাঁশকুড়া ইত্যাদি– বিশাল এলাকার অর্থনীতি কৃষিজ সম্পদ এবং তার বাণিজ্যে পরিপুষ্ট। কেদারকুণ্ড পরগণার (বর্তমান ডেবরা থানা) মলিঘাটি গ্রামে গিয়ে বসতি গড়েন ভিখারী।
তাঁর পুত্র দাতারাম রক্ষিত। পান, সুপারি, হরিতকি ইত্যাদির ব্যবসা গড়েছিলেন তিনি। কংসাবতী ও শিলাবতী তো ছিলই, তাছাড়াও, রূপনারায়ণ ও হুগলি নদীর সুবাদে, বহির্বাণিজ্যে যাতায়াতেরও সুবিধা হয়ে ছিল। ব্যবসার আরও বৃদ্ধির আশায়, মেদিনীপুর নগরীতে চলে আসেন ভিখারী।
ভিখারির পুত্র ছিলেন জন্মেঞ্জয়। পারিবারিক ব্যবসাটি ফুলেফেঁপে উঠেছিল জন্মেঞ্জয়ের হাতে।

জন্মেঞ্জয় ছিলেন বিচক্ষণ মানুষ। লক্ষ্মী যে চিরকাল স্বভাব-চঞ্চলা ভালোই জানতেন। জানতেন, বেঁধে রাখতে হয় লক্ষ্মীকে। ব্যবসার অর্থে, বড়সড় একটি জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। বড় আকারের প্রাসাদ গড়েছিলেন মেদিনীপুর শহরের বুকে। হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, চার-চাকার জুড়িগাড়ি, কারুকাজ করা তাঞ্জাম—কত কিছুই ছিল তাঁর। তামাকু সেবন করতেন জমিদার– গড়গড়াটি বানিয়েছিলেন সওয়া এক সের সোনা দিয়ে। জন্মেঞ্জয়ের হাতে জমিদারি মহাল ছড়িয়েছিল মেদিনীপুর ছাড়াও ঘাটাল, সবং, পিংলা, পাঁশকুড়া, খড়্গপুর, মাদপুর, জকপুর ইত্যাদি এলাকায়।
জন্মেঞ্জয়ের সময়ে মেদিনীপুর জেলায় সবচেয়ে ধনী জমিদার ছিলেন ডেবরা থানার মলিঘাটির জমিদার ছকুৱাম চৌধুরী। জেলার শ্রেষ্ঠ রাজা গণ্য করে, জন্মেঞ্জয়কে ” মল্লিক ” উপাধি দিয়েছিলেন ছকুরাম। সেই থেকে কৌলিক ” রক্ষিত ” পদবি ত্যাগ করে, জন্মেঞ্জয়ের জমিদারবংশ ” মল্লিক ” পদবীতে পরিচিত হয়ে আছেন।
জমিদার জন্মেঞ্জয় ছিলেন পরম ধার্মিক। অনেকগুলি দেবালয় গড়েছিলেন নিজের সময়কালে। প্রাসাদের সামনে দ্বাদশ শিবালয় গড়েছিলেন। কিন্তু কুলদেবতা মেনেছিলেন শ্রীকৃষ্ণকে। প্রাসাদের ভিতরে মন্দির গড়ে, রাধাকান্ত নামে বিগ্রহ স্থাপন করেছিলেন। কেবল তা-ই নয়, প্রজাবর্গের সেবাপূজার জন্য, নিজের মহালের খান্দার পরগণায় করকাই গ্রামে দ্বিতীয় একটি মন্দির গড়ে দিয়েছিলেন রাধাকৃষ্ণের জন্য। জমিদারির আয়তন বড় হতে থাকলে, করকাই গ্রামেই একটি কাছারি স্থাপন করেন জন্মেঞ্জয়। কাছারির গায়েই একটি দালান-রীতির মন্দির গড়ে, রাধাগোবিন্দ নামের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
মন্দিরটি ইটের তৈরী, পূর্বমুখী। উঁচু পাদপীঠের উপর স্থাপিত দালান-রীতির মন্দির। ২ ফুট প্রশস্ত একটি প্রদক্ষিণ-পথ বেষ্টন করে আছে মন্দিরকে। পূর্ব-পশ্চিমে ২৪ ফুট এবং উত্তর-দক্ষিণে ২৫ ফুট বিস্তার দেবালয়টির, উচ্চতা ২০ ফুট।
সামনে ৮ ফুট প্রশস্ত একটি অলিন্দ। তাতে পূর্বদিকে তিনটি এবং উত্তর-দক্ষিণে একটি করে– মোট ৫টি দ্বারপথ। গর্ভগৃহের ১টিই দ্বার। সবগুলি দ্বার খিলান-রীতিতে রচিত। থামগুলি গোলাকার গুচ্ছ-রীতির। কড়ি-বরগার ব্যবহার নাই। অলিন্দ এবং গর্ভগৃহের ভিতরের ছাদ বা সিলিং নির্মিত হয়েছে টানা-খিলান রীতিতে। তবে মাথার ছাদ সমতল। শীর্ষক অংশটি সামনের দেওয়ালের আলসের মাথায় রচিত। সেখানে স্তম্ভ নির্মাণ করে, তাতে আমলক এবং বিষ্ণুচক্র স্থাপিত হয়েছে।
রাধাগোবিন্দের জন্য রাস উৎসবের প্রচলন করা হয়েছিল। নির্মিত হয়েছিল একটি বড় আকারের রাসমঞ্চ। আজ জমিদারী নাই বহুকাল। কাছারিবাড়িটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে কবেই। কত কাল হোল, রাসমঞ্চটি ভাঙাচোরা, পরিত্যক্ত।
মন্দিরটির দেহেও জীর্ণতার ছাপ। পুরোহিত পরিবার আর গ্রামবাসীগণ দেবতার পূজাগুলি কোনও রকমে টিকিয়ে রেখেছেন। মন্দির বাঁচিয়ে রাখা তাঁদের সাধ্যে নাই।
সাক্ষাৎকার : সর্বশ্রী ডা. নারায়ণ চন্দ্র গিরি, রাখাল চন্দ্র প্রধান, তরুণ চক্রবর্তী (পুরোহিত)– দক্ষিণ করকাই। শ্রী রবীন্দ্রনাথ ভৌমিক, রেভিনিউ ইন্সপেক্টর– তেমাথানি, সবং থানা।
পথনির্দেশ : মেদিনীপুর থেকে ডেবরা কিংবা বালিচক ষ্টেশন হয়ে দক্ষিণ মুখে পটাশপুরগামী পথের উপর এগার মাইল স্টপেজ। সেখানে নেমে, পূর্বমুখে ৩ কিমি দূরত্বে করকাই গ্রাম।

Advertisement

Advertisement

RELATED ARTICLES

Most Popular