৩৬৮ বছরের পুরানো পারিবারিক কালী পূজো কে এখনো বহন করে নিয়ে যাচ্ছে মেট্যালার ঘোষ পরিবার

538
৩৬৮ বছরের পুরানো পারিবারিক কালী পূজো কে এখনো বহন করে নিয়ে যাচ্ছে মেট্যালার ঘোষ পরিবার 1

পলাশ খাঁ, গোয়ালতোড় :- ৩৬৮ বছরের পুরানো পারিবারিক কালী পুজো। সেই কালী পূজো কে এখনো ভক্তি আর সাড়ম্বরে দীর্ঘ ৪৮ বছর ধরে বহন করে চলেছে গোয়ালতোড়ের মেট্যালার ঘোষ পরিবার। কালের নিয়মে আর জমি জায়গার কারনে আদি বাড়ি ছেড়ে মেট্যালাতে বসবাস করা ঘোষ পরিবারের সদস্যরা এখনো নিয়ম আর নিষ্ঠার সাথে মা কালীর আরাধনার আয়োজন করেন। পুজো উপলক্ষে আয়োজন করা হয় যাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। চলে খাওয়া দাওয়া, হৈ-হুল্লোড়। ফলে গোটা গ্রাম সহ প্রায় আট দশ টি গ্রামের মানুষ মিলিত হয় ঘোষ পরিবারের এই কালী পূজো তে।

গোয়ালতোড়ের মেট্যালা গ্রামের ঘোষ পরিবারের কালী পুজো শুরু করেছিলেন মহেশ ঘোষের দুই ছেলে সূর্য ঘোষ ও হারাধন ঘোষ৷ তাদের আদি বাড়ি ছিল গড়বেতার তেলিবনী গ্রামে। ঘোষ পারিবার সুত্রে জানা যায়, বগড়ির জমিদার কৈলাশ রায়ের সঙ্গে অচিন্ত রায়ের সম্পর্ক ভালো থাকার দরুন তার তিন ছেলে কার্তিক, মহেশ ও গোবিন্দ কে জমিদারের সেরেস্তার কাজে লাগিয়ে দেন। সেখানেই অচিন্ত ঘোষ এই কালী পূজো শুরু করেন৷ এদিকে জমিদার কৈলাশ রায় গোয়ালতোড়ের ধামচা এবং মেট্যালা এই দুটি মৌজার জমিজমা দেখাশোনা করার জন্য অচিন্ত ঘোষ কে পাঠান।

৩৬৮ বছরের পুরানো পারিবারিক কালী পূজো কে এখনো বহন করে নিয়ে যাচ্ছে মেট্যালার ঘোষ পরিবার 2

সেই জমিজমা দেখাশোনা করার জন্য অচিন্ত ঘোষ স্বপরিবারে পারিবারিক কালী কে নিয়ে গোয়ালতোড়ের ধামচাতে এসে বসবাস শুরু করেন এবং এখানেও কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা করে মায়ের পুজো শুরু করেন। ধামচা থেকেই মেট্যালার জমিজমা দেখাশোনা করতেন অচিন্ত ঘোষের তিন ছেলে কার্তিক, মহেশ আর গোবিন্দ৷ কিন্তু কাজের সুবিধার জন্য মহেশ ঘোষ মেট্যালা চলে যান এবং সেখানেই স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন। মহেশ ঘোষের মৃত্যুর পর তার দুই ছেলে পুজোর সময় পরিবারের মেয়েদের নিয়ে রাত্রীতে মেট্যালা থেকে ধামচা যাওয়ার অসুবিধার কারনে ধামচা থেকে ঠাকুর এনে মেট্যালা তে প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু করেন।

ঘোষ পরিবারে এই কালী পূজো শুরু হওয়ার পিছনে রয়েছে এক অলৌকিক কাহিনী। ঘোষ পরিবার সুত্রে জানা গিয়েছে তাদের প্রথম পুরুষ অচিন্ত ঘোষ গরুর গাড়ি নিয়ে জঙ্গল থেকে কাঠ নিয়ে ফিরে আসার সময় হঠাৎ করেই গাড়ির উদল ভেঙ্গে যায়৷ এই বিপদে সে মা তারার নাম স্মরণ করতে থাকে। এমন সময় লাল পাড় সাদা শাড়ি পরা একটি মেয়ে তার কাছে এসে কাঁদতে থাকে৷ আর তাকে বলে যেন সে তাকে নিয়ে যায় তার বাড়িতে। কিন্তু কার মেয়ে কোথা থেকে এই জঙ্গলে আসলো তা বুঝতে পারে না অচিন্ত ঘোষ৷ তাই তাকে নিয়ে যেতে চাইলেন না বাড়িতে। কিন্তু মেয়েটিও নাছোড়বান্দা। তার বাড়িতে যাবেই। অবশেষ যখন অচিন্ত ঘোষ তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে রাজী হয় তখন সেই মেয়েটি মা কালীর মুর্তি ধরে বলে আমার পুজো কর। তোর মঙ্গল হবে। এই বলেই অন্তর্ধান হয়ে যায়৷ বিপদ থেকে উদ্ধার পেলেও অল্প সময়ের মধ্যে কিভাবে পুজো করা সম্ভব? পরে মায়ের নির্দেশেই পুজোর দিন শিলাবতী নদীর বাঁশকোপা দহ থেকে পেল্লায় সাইজের একটি শাঁখ, একটি ঢাক, সহ পুজোর সরঞ্জাম নিয়ে আসেন এবং তা নিয়ে ফিরে এসেই পুজো শুরু করেন তিনি।

ঘোষ পরিবারের এই কালী পুজো দীর্ঘ ৩২০ বছর ধরে চলার পর যাতায়াতের অসুবিধার কারনে মহেশ ঘোষের দুই ছেলে সুর্য আর হারাধান ঘোষ সিদ্ধান্ত নেন ধামচা থেকে ঠাকুর এনে মেট্যালা তে প্রতিষ্ঠা করবেন৷ সেই মতো আজ থেকে ৪৮ বছর ঠাকুর এনে মেট্যালা তে প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর থেকে সাড়ম্বরে পালিত হয়ে আসছে শক্তি দেবীর আরাধনা৷
মেট্যালার ঘোষ পরিবারের সদস্য ভোলানাথ ঘোষ, ত্রিলোচন ঘোষরা জানান, পারিবারিক নিয়ম মেনেই পুজো হয় প্রতি বছর৷ পুজো উপলক্ষে আয়োজন করা হয় নানান অনুষ্ঠানের। পুজোর তিন দিন মন্দির চত্বরে অসংখ্য ভক্ত সমাগম ঘটে। কিন্তু এবার করোনার কারনে শুধুমাত্র পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পুজোর আয়োজন করা হয়েছে।