করোনা কেড়ে নিল খড়গপুর শহরের প্রিয় ডাক্তার বাবু গৌরাঙ্গ বিশ্বাস কে, হাহাকার শহরের বিশিষ্টজনেদের

7629
করোনা কেড়ে নিল খড়গপুর শহরের প্রিয় ডাক্তার বাবু গৌরাঙ্গ বিশ্বাস কে, হাহাকার শহরের বিশিষ্টজনেদের 1

নিজস্ব সংবাদদাতা: সোমবার সপ্তাহের প্রথম দিন দারুন দুঃসহ বেদনার খবর এল খড়গপুর শহরবাসীর জন্য, কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রান হারিয়েছেন ডঃ গৌরাঙ্গ বিশ্বাস। দক্ষ চিকিৎসকের পাশাপাশি ডঃ বিশ্বাস ছিলেন একজন অসামান্য গুণী সঙ্গীত শিল্পী, শহরের রক্তদান আন্দোলন, থ্যালাসেমিয়ার সঙ্গে লড়াকু মানুষদের পাশে থাকা সৈনিক আর এই শহরের পর্বতারোহণ অভিযান সোসাইটি গঠনের প্রধান সংগঠক। পক্ষকাল ধরে কলকাতার তিনটি বেসরকারি হাসপাতালে পর্যায়ক্রমে চিকিৎসার পর সোমবার দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।

মধ্য ষাটের ডঃ বিশ্বাস আ্যনাস্থেসিস্ট হিসাবে খড়গপুর মহকুমা হাসপাতালে কর্মরত থাকলেও তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সার্জেন এবং ফিজিসিয়ানও বটে। এই শহরে বহু বিশিষ্ট মানুষের শারীরিক পরামর্শ দাতা হিসাবে নীরবে কাজ করে যেতেন ডাক্তারবাবু। মৃত্যু কালে তিনি রেখে গিয়েছেন স্ত্রী মধুমিতা, চিকিৎসক পুত্র গৈরিক এবং মেয়ে স্থপতিবিদ রিমলিকে। রয়েছেন তাঁর পুত্রবধূও।

করোনা কেড়ে নিল খড়গপুর শহরের প্রিয় ডাক্তার বাবু গৌরাঙ্গ বিশ্বাস কে, হাহাকার শহরের বিশিষ্টজনেদের 2
করোনা কেড়ে নিল খড়গপুর শহরের প্রিয় ডাক্তার বাবু গৌরাঙ্গ বিশ্বাস কে, হাহাকার শহরের বিশিষ্টজনেদের 3
ডঃ বিশ্বাস কে শ্রদ্ধা জানিয়ে পোস্ট ফেসবুকে

শহরের বিশিষ্ট ও বরিষ্ঠ নাগরিক অজিত গুপ্ত জানিয়েছেন, “আজ আমাদের, এই শহরবাসীর জন্য বড়ই শোকের দিন। ১৯৮৪ সালে কাজের সূত্রে এই শহরে এসেছিলেন মানুষটি। অত্যন্ত নীরবে, খুবই সাধারন জীবন যাপন করে এই শহরকে তিনি দিয়ে গেছেন অনেক। একটি সভ্য সমাজ তাঁর কৃতি সন্তানদের কাছ থেকে যা আশা করে নাগরিকদের প্রতি সাহচর্য, সহমর্মিতা সবটাই দিয়ে গেছেন তিনি। আরও অনেক কিছুই পেতাম আমরা তাঁর কাছ থেকে কিন্তু একদিকে ক্যানসার আর অন্যদিকে কোভিড তাঁকে কেড়ে নিল।”

খড়গপুরের অন্যতম সাংস্কৃতিক কর্মী তথা আবৃত্তিশিল্পী জাহির চৌধুরী বলেন, ” একটা ঘটনা বলি,আমার স্ত্রী শহরের একটি নার্সিং হোমে ভর্তি। আমি সেখানে গেছি। দেখি একজন রোগি রক্তের অভাবে মরণাপন্ন। তাঁর পরিবার রক্ত জোগাড় করতে পারছেনা। ডঃ অনুপ মল্লিক আর ডঃ গৌরাঙ্গ বিশ্বাস দুজনে মিলে তাঁকে রক্ত দিলেন! কত রোগিকে ওষুধ আর পথ্য তুলে দিতেন মানুষটি।এমন মানুষরা যে কোনোও শহরের অহংকার। সেই অহংকার হারালাম আজ। গত ৫ই সেপ্টেম্বর আমাদের হোলি বার্ড স্কুলের পক্ষ থেকে তাঁকে ‘টিচার অব দ্য সোসাইটি’ সম্মান দিয়েছিলাম। ওই টুকুই আমার পাওনা হয়ে রইল। আমার বাবাও যেহেতু চিকিৎসক তাই আমাদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কও ছিল। সেই হিসাবে আমি একজন অভিভাবককে হারালাম। শুধু আমি নয় এই শহর একজন অভিভাবক হারাল।”

যন্ত্রনা ব্যক্ত হয়েছে শহরের কোনায় কোনায়। শহরের প্রথিতযশা সঙ্গীত শিল্পী সৌমেন চক্রবর্তী বলেছেন,”আমি কিছু বলার মত অবস্থায় নেই। অমন নিরাহঙ্কার, মিতভাষী, সদা হাস্যময়, পরোপকারী মানুষ এ শহরে বিরল ছিল। ওনার সঙ্গে গান করতে গিয়ে দেখেছি কী অসম্ভব তালিম আর দখল ছিল ওনার সঙ্গীতের প্রতি। সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। কত মানুষকে নীরবে সাহায্য করে গেছেন কেউ জানেনা। মেয়ের বিয়েতে অনন্য সঙ্গীতের আসর বসিয়েছিলেন যেখানে শহরের সঙ্গীত প্রতিভাদের আমন্ত্রণ করেছিলেন। আমি নিজেও ছিলাম। এবছর ২২শে শ্রাবন করোনা কালে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনুষ্ঠান করেছিল আমাদের সংস্থা গীতালি। বিশ্বাসদাকে আমন্ত্রণ করেছিলাম কিন্তু অসুস্থতার কারনে করতে পারেননি বলে বৌদির কাছে আফসোস করেছিলেন খুব। সেই আফসোস থেকে গেল আমারও। এ শহর হারালো আদ্যন্ত একজন ভালো মানুষকে।”

জানা গেছে অন্ত্রের ক্যান্সারে ভুগছিলেন আপাদমস্তক নেশাহীন ডঃ বিশ্বাস। চিকিৎসায় সাড়াও দিচ্ছিলেন কিন্তু মাঝপথে করোনা ছিনিয়ে নিয়ে গেল তাঁকে। নিয়ম মত প্রশাসনই দায়িত্ব নিয়ে সৎকার করবেন। পড়াশুনা রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলে। নীরবে তাই সেবা ধর্ম টি পালন করে যেতেন তিনি। খুব সম্প্রতি ছেলে এবং মেয়ের বিয়ে যেমন দিয়েছিলেন তেমনই এবছরের গোড়াতেই বাবা মা কে হারিয়েছিলেন। করোনা কালে এই শহরের সব চেয়ে বড় হারানো হয়ে রয়ে গেল ডঃ গৌরাঙ্গ বিশ্বাস নামটা।