চলে গেলেন ডাঃ চৌধুরী! চির ঘুমের পরই খড়গপুর ছাড়লেন মহকুমা হাসপাতালের প্রথম সুপার

303
চলে গেলেন ডাঃ চৌধুরী! চির ঘুমের পরই খড়গপুর ছাড়লেন মহকুমা হাসপাতালের প্রথম সুপার 1

নিজস্ব সংবাদদাতা: বুধবার ৯ টা অবধি নিজের কৌশল্যা মোড়ের হাজরা গলির বাড়িতে রুগী দেখেছেন ৭৭ বছর বয়সী প্রবীণ চিকিৎসক। তারপর সিঁড়ি ভেঙে তিন তলায়! পুত্রবধূ বলেছেন, বাবা আপনি হাঁফাচ্ছেন কেন? ডাক্তারবাবু বলেছেন, ও তেমন কিছু নয়, তিন তলায় উঠলাম যে! কিন্তু একটু পরেই বুঝতে পারলেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। সাড়ে ৯টা বড় ছেলে জাকিরকে বললেন, আমাকে একটা ডেকাড্রন ইঞ্জেকশন দাও। ইনজেকশন নিলেন। রাত সাড়ে ১০টায় বললেন, ‘না, বাড়িতে হবেনা, এবার হাসপাতালে যাওয়া দরকার।’ নিয়ে যাওয়া হল হাসপাতালে, খড়গপুর মহকুমা হাসপাতাল।

১৯৮২ সালে তখন এই হাসপাতালে নাম খড়গপুর স্টেট জেনারেল হাসপাতাল। ডাক্তার মহিউদ্দিন আহমেদ খান চৌধুরী তখন চাঙ্গুয়াল প্রাইমারি হেলথ সেন্টারে। তখন খড়গপুর শহরের নতুন আধুনিক হাসপাতাল। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ননী ভট্টাচার্য চাঙ্গুয়াল থেকে ডাঃ চৌধুরী কে আনালেন এবং তাঁরই হাতে তুলে দিলেন হাসপাতালের দায়িত্ব। খড়গপুর হাসপাতালের প্রথম সুপার!
১৯৮২ থেকে ২০২১! ৩৯ বছরের খড়গপুর হাসপাতাল এখন মহকুমা হাসপাতাল! ৫লাখি শহরের হাসপাতাল ডাঃ চৌধুরীকে জানিয়ে দিল এখানে তাঁর চিকিৎসা সম্ভব নয়! রাত্রি ১১টা ৪৫ ডাক্তার বাবুকে পরিবার পৌছাল মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। একটি হাসপাতালের রেফার হওয়া রুগী পড়ে রইলেন আরেকটি হাসপাতালের জেনারেল বেডে, রাত্রি দেড়টা অবধি। একজন প্রোথিতযশা চিকিৎসক জানার পরেও ২ঘন্টা তাঁকে দেখার জন্য কোনও সিনিয়ার ডাক্তার আসেননি!

চলে গেলেন ডাঃ চৌধুরী! চির ঘুমের পরই খড়গপুর ছাড়লেন মহকুমা হাসপাতালের প্রথম সুপার 2

।কয়েকজন হাউস স্টাফ ২ঘন্টা ধরে ডাঃ চৌধুরীর ওপর নিজেদের প্র্যাকটিস করেছেন, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন এবং সর্বশেষ হাল ছেড়ে দিয়ে আইসিইউতে পাঠিয়েছেন। ডাঃ চৌধুরীর মেজো ছেলে বাচিক শিল্পী জাহির চৌধুরী জানান, ‘বাবাকে যাতে একজন সিনিয়ার ডাক্তার দেখেন তার জন্য পায়ে ধরতে খালি বাকি রেখেছি। কিন্তু কাউকে পাওয়া যায়নি। রাত্রি দেড়টা নাগাদ বাবাকে ওরা আইসিইউতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। মেল মেডিকেল থেকে প্রায় ১কিলোমিটার বাবাকে একটা ভাঙা ট্রালিতে আমরাই নিয়ে যাই। ২টার সময় আমাদের আইসিইউ থেকে বাইরে বেরিয়ে যেতে বলা হয়। সকাল ৬টার সময় আইসিইউ খোলার পর আমাদের জানানো হয় বাবা মারা গেছেন।”

সাতের দশকের গোড়ায় ডাক্তারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর বারুইপুরের সন্তান ডাঃ চৌধুরীর প্রথম পোস্টিং অবিভক্ত জেলার কুলটিকরিতে। ৫বছর সেখানে কাজ করার পর তাঁকে পাঠানো হয় গ্রামীন খড়গপুরের চাঙ্গুয়াল। নতুন হাসপাতালের দায়িত্ব নিয়ে। কেমন ছিলেন মানুষটা? চাঙ্গুয়াল হাসপাতালে হাসপাতালের সময় চিকিৎসা আর বাকি সময়টা মানুষের ঘরে ঘরে। আশেপাশের মানুষের কাছে দেবতা। চাঙ্গুয়াল হাসপাতাল থেকে দেড় কিলোমিটার দুরে রনাপাটনা গ্রাম। গ্রামের খাটুয়াদের বাড়ি লক্ষীপুজো। আত্মীয় স্বজন ছাড়াও পাঁচ গাঁয়ের নেমন্তন্ন। নেমন্তন্ন তালিকায় সর্বাগ্রে নাম ডাঃ মহিউদ্দিন আহমেদ খান চৌধুরীর! ধীতপুর, গোপীনাথপুর, মাছগেড়িয়া, কন্দর্পপূ্র, সিজুয়া, সিমলা কিংবা মাওয়ার ক্ষেতের সবজি কিংবা পুকুরের মাছ আগে নিবেদন করা হবে ডাঃ চৌধুরীকে। অবশ্য হিসাব বরাবর করে দিতেন ডাঃ চৌধুরীও। প্রেসক্রিপশন লেখার পাশাপাশি আগাপস্তালা রুগীকে মেপে হাতে পাঁচটা টাকা গুঁজে দিয়ে বলতেন, ‘বাপু হে শুধু ওষুধে রোগ সারেনা! নাও, মেয়েটিকে একটু ভাল মন্দ খেতে দিও।’

মাত্র ১বছর খড়গপুর হাসপাতালের সুপার করে রাখার পর তাঁকে পাঠানো হল উলুবেড়িয়াতে। ২২বছর সেখানেই! তেল না মারতে পারার বোকামি। কিন্তু তিনি ততদিনে খড়গপুর শহরের। সরকারকে আটঘন্টা আর ট্রেন বাসকে চারঘন্টা দিয়ে বাকি ১২ঘন্টা খড়গপুরের। খড়গপুর শহরের প্রবীণ নাগরিক অজিত গুপ্ত জানিয়েছেন, “একেই বলে ফুল টাইম ডাক্তার। রোগীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া, শুধু স্টেথো আর নাড়ি ধরেই জানিয়ে দেওয়া রোগের হাল হকিকত। ওষুধের লম্বা লিস্ট নেই, টেষ্ট করানোর বাহার নেই আর ডাক্তার ডাক্তার ভাব নেই। এতো লো প্রোফাইল অথচ হাই কমিটেশন ! আরও একজন স্বজন কে হারালো খড়গপুর!”

উলুবেড়িয়া থেকে অবসর নেওয়ার পরও এই কিছুদিন আগে অবধি তালবাগিচা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পরিষেবা দিয়ে এসেছেন গত পাঁচ বছর ধরে। নিজের বাড়ির পাশাপাশি রোগী দেখতেন অনেক জায়গায়। কিডনির সমস্যা ছিল। গত মার্চ মাসে ভেলোরে চিকিৎসা করিয়ে এসেছেন। বয়স ৭৭ হলেও এখুনি চলে যাওয়ার মত জায়গায় ছিলেননা। মাত্র ৫ঘন্টা আগেও রোগী দেখেছেন। খড়গপুরে এসে সেই যে থেকে যাওয়া, সেই যে ভালোবাসা তাই জীবিত অবস্থায় খড়গপুর ছাড়তে চাননি ডাক্তারবাবু। মা আর বাবার দেহ রয়েছে বারুইপুরে তাই সন্তানদের বলেছিলেন আমার মৃত্যুর পর আমাকে বারুইপুরেই শুইয়ে দিও।

বৃহস্পতিবার মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ থেকে তাঁর মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বারুইপুরে। ঈশার নামাজের পর তাঁকে সেখানেই দাফন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাহির। রেখে গেলেন স্ত্রী ছাড়াও চারপুত্র ও দুই কন্যা, পরিবার পরিজন আর খড়গপুরকে। ৪০বছর পর খড়গপুর ছাড়লেন তিনি, ছাড়লেন চিরতরে।