গভীর মনরোগে ঢুকে যাচ্ছে মহানগর,একই দিনে ৭ জনের আত্মহত্যা কলকাতায়! দুশ্চিন্তায় সমাজ বিজ্ঞানীরা

91

নিজস্ব সংবাদদাতা: বানিজ্য নগরী মুম্বাইতে বিশিষ্ট অভিনেতা সুশান্ত সিংহ রাজপুতের মাত্র ৩৪ বছরে আত্মহত্যার ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা দেশকে। মহা নাগরিক যন্ত্রনার সেই আঁচ উপলব্ধি করেই ঘটনার পরের দিনই, সোমবার কলকাতার পুলিশ কমিশনার অনুজ শর্মা মহানগরের বাসিন্দাদের উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়েছিলেন, সমস্যায় পড়লে আমাদের জানান, আমরা আপনাদের পাশে আছি। কিন্তু হায়! ৪৮ ঘন্টাও পের হলনা সেই আশ্বাসবানীর, বুধবার কলকাতা মহানগরীতেই আত্মহত্যা করলেন ৭ জন নাগরিক আর যার মধ্যে রয়েছে ৭০ বছরের বৃদ্ধ থেকে ১৬ বছরের কিশোরও। সাম্প্রতিক অতীতে কলকাতায় এ নজির নেই। ১৭ জুন ২০২০ তাই কলকাতা পুলিশের রেকর্ডে এই বিরল ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়ে থাকল যে ২৪ ঘন্টায় শহরে আত্মহত্যা ৭ জনের!
যদিও সংখ্যা আরও ১ বেড়ে ২ গন্ডা হওয়ার আগেই রিজেন্ট পার্কে এক টলিউড স্ক্রিপরাইটারের জীবন শেষ মুহূর্তে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। আর বেঁচে যাওয়া ওই মানুষটির টান পড়া পেশাই বলে দিয়েছে কী পরিমান আর্থিক দুর্দশায় মানুষের জীবন কাটছে এই ভয়াবহ লকডাউনে। টলিউড থেকে ট্রলি চালক এখন তীব্র মানসিক সঙ্কটে যাতে রীতিমত উদ্বেগে পুলিশ থেকে শুরু করে মনোবিদরা।
অদ্ভুত ব্যাপার মৃত এই ৭ জনই গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে ঠিক যেমনটা করেছিলেন সুশান্ত সিংহ রাজপুত। না, রাজপুতের মৃত্যুর সঙ্গে নিশ্চিত ভাবেই এদের কারোরই যোগাযোগ নেই তবে সুশান্তের মতই প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে মানসিক অবসাদে ভুগেছিলেন নিশ্চিত।
বুধবার ভোরে কলকাতা প্রথম মৃত্যু দেখে পাটুলি থানার বৈষ্ণবঘাটা টাউনশিপে।টাউনশিপে একটি বাড়ির দোতলার ঘরে গলায় নাইলনের ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন নরেশ সাহা (৫৫) নামে এক ব্যক্তি। আবার বুধবার সকালে বেহালার ক্যানাল রোডের বাসিন্দা নকুল মন্ডল(৭০)ও সিলিংয়ের সঙ্গে গলায় গামছার ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। বেলেঘাটার কালীতলা বোস লেনে বাসিন্দা ইন্দ্রনীল কর্মকার (৩০) নামে এক যুবকও বুধবার সকালে সাড়ে ন’টা নাগাদ গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। এদিন সকালে টালিগঞ্জ থানা এলাকার হাজরা রোডে গলায় বেডশিটের ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন মোহন পাঞ্চোপাধ্যায় (৪০)। এদিন মুচিপাড়ার পিসি বড়াল স্ট্রিটে তরুণ টোটন দাস (১৯) নামে এক তরুণও এই একই দিনে গলায় শাড়ির ফাঁস লাগিয়ে আত্মঘাতী হন।

আরও পড়ুন -  দেড়শ টাকায় চারশ এম.এল গোমূত্র, করোনা রুখতে বিজেপি নেতাদের ভরসায় তারই এক চামচ খেয়ে হাসপাতালে ঝাড়গ্রামের ব্যবসায়ী

দুপুরের আগেই ৫টি আত্মহত্যার পর দুপুরের ঘটনায় বুধবার দুপুর আড়াইটে নাগাদ দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়া স্টেশন রোডে আত্মহত্যা করে এক কিশোর। কাপড় শুকোতে দেওয়ার নাম করে ছাদে উঠেছিল সানি মণ্ডল নামে ১০ বছরের এক কিশোর। কিছুক্ষণ পরই গলায় রবারের পাইপ দিয়ে ঝুলতে দেখা যায় তাকে।
পুলিশ জানিয়েছে, ১০ বছরের ওই বালক লেক এলাকার এটি চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাসিন্দা। মা লোকের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করেন, বাবার কোনও স্থায়ী রোজগার নেই। বাড়ির কাছেরই একটি স্কুলে পড়ত। পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। মা বাড়ি বাড়ি কাজ করায় সারাদিন ঢাকুরিয়া স্টেশন রোডের একটি বাড়িতে থাকত। সেখানেই এক ব্যক্তির কাছে পড়াশোনা করত। এদিন দুপুরে তিনতলার বাড়ির ছাদে কাপড় শুকোতে দিতে যায় সে। ছাদে গিয়ে দেখা যায়, একটি মোটা পাইপের সঙ্গে গলায় রবারের পাইপের ফাঁস দিয়ে ঝুলছে পঞ্চম শ্রেণির ওই পড়ুয়া। কেন সে আচমকা আত্মহত্যা করল, তা নিয়ে ধন্দে পুলিশ।

এদিন রিজেন্ট পার্কের বড়ুয়াপাড়ায় এক টলিউড স্ক্রিপ্ট রাইটারের জীবন রক্ষা সম্ভব হলেও ওখানকারই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সরণিতে একটি পাঁচ তলা বাড়ির তিন তলায় আত্মঘাতী হন রোহিত গুপ্তা (১৯) নামে এক কলেজ ছাত্র। জানা গিয়েছে, তার মা-বাবা এখানে থাকতেন না।পড়াশোনা করতেন না বলে অভিভাবকরা তাঁকে বকাবকি করতেন। সিলিং থেকে গলায় গামছার ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।

আরও পড়ুন -  সুশান্ত মৃত্যুতে ক্রমশ জড়াচ্ছে ঠাকরে পরিবারের নাম, জল্পনা উড়িয়ে মাঠে নামলেন উদ্ধবপুত্র আদিত্য ঠাকরে

হয়ত কাকতলীয় কিন্তু মৃত প্রত্যেকেই পুরুষ এমনকি যিনি মরতে গেছিলেন তিনিও। লকডাউনে শুধুই কাজ নেই, উপার্জন কমে গেছে এমনটা নয়, তার সঙ্গে রয়েছে স্কুল কলেজ ইত্যাদি না খোলাও। দীর্ঘ একাকিত্ব, অনুভব ভাগ করতে না পারা, মান অভিমান, দারিদ্র ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় একে একে গভীর অবসাদে ঠেলে দিচ্ছে মানুষকে। আর সেই নিরবিচ্ছিন্ন অবসাদ থেকে মুক্তি পেতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে মুক্তি খুঁজছে ১৬ থেকে ৭০।

গভীর মনরোগে ঢুকে যাচ্ছে মহানগর,একই দিনে ৭ জনের আত্মহত্যা কলকাতায়! দুশ্চিন্তায় সমাজ বিজ্ঞানীরা 1