ক্রান্তিকালের মনীষা ।। কালের রাখাল কৃষ্ণমোহন।। বিনোদ মন্ডল

284
ক্রান্তিকালের মনীষা ।। কালের রাখাল কৃষ্ণমোহন।। বিনোদ মন্ডল 1
ক্রান্তিকালের মনীষা ।। কালের রাখাল কৃষ্ণমোহন।। বিনোদ মন্ডল 2

কালের রাখাল কৃষ্ণ মোহন  ( ১৮১৩-১৮৮৫)ক্রান্তিকালের মনীষা ।। কালের রাখাল কৃষ্ণমোহন।। বিনোদ মন্ডল 3

বিনোদ মন্ডল                                                                         আধুনিকতার ধ্বজাধারী নব্য বাঙালির একবিংশ শতাব্দীর যাবতীয় আত্মশ্লাঘার পেছনে পরাধীন ভারতে যাঁরা নানা ক্ষেত্রে আলোক বিচ্ছুরণের আয়োজন করেছেন তাঁদের এক অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। সেকালের কয়েকজন বিরল প্রতিভার সান্নিধ্যে দারিদ্র মথিত কিশোর ও তরুণ কৃষ্ণমোহন শিক্ষাঙ্গনে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পান।

ক্রান্তিকালের মনীষা ।। কালের রাখাল কৃষ্ণমোহন।। বিনোদ মন্ডল 4

ডেভিড হেয়ার সাহেব তাঁকে পটলডাঙ্গা স্কুলে পড়ার ব্যবস্থা করে দেন। পরে বৃত্তি পেয়ে হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। এখানেই শিক্ষক হিসেবে পান ডিরোজিওকে। বিতর্ক সভায় ও আলাপচারিতায় আত্ম বিকাশে উন্মুখ কৃষ্ণমোহনের জিজ্ঞাসু মন প্রবলভাবে আলোড়িত হয়। গভীর ইংরেজি ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা পাশ্চাত্য শিক্ষা জ্ঞান বিজ্ঞানের আলোচনা তাদের যুক্তিনিষ্ঠ ও প্রখর বাস্তববাদী করে তোলে। নব্যবঙ্গ গোষ্ঠীতে অনেকেই যুক্ত হন। রক্ষণশীল সমাজের চাপ এবং বিপরীতে নব্য পন্থীদের বিদ্রোহে কলকাতা তখন উত্তাল। ১৮৩১ সালে ডিরোজিও বাধ্য হন হিন্দু কলেজে ইস্তফা দিতে।

সময়ের দাবী মেনে উঠে আসেন কৃষ্ণমোহন । ১৮৩২ সাল। আলেকজান্ডার ডাফ-এর কাছে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। পটলডাঙ্গা স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি চলে যায়। কাল ক্রমে তিনি একজন খ্রিস্টান ধর্মযাজকে উন্নীত(১৮৩৯) হন। নিজের ছোট ভাই কালীমোহন বঙ্গদেশের প্রথম ব্যারিস্টার জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরকে দীক্ষা দেন, যে জ্ঞানেন্দ্রমোহনের নেপথ্যে ভূমিকা ছিল মধু কবিকে মাইকেলে রূপান্তরনের প্রশ্নে। কৃষ্ণমোহন ১৮৫২ সাল থেকে ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত বিশপস কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। ১৮৬৭ থেকে ১৮৬৮ সালে তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো নির্বাচিত হন। ১৮৬৭ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টর অব ল সম্মান প্রদান করে। ইংরেজ সরকার CIE উপাধিতে ভূষিত করে। রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য ছিলেন তিনি।

সর্বগুণান্বিত এই মানুষটি একাধিক পত্র পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। বিশেষত তাঁর ইংরেজি সাময়িকী এনকোয়ারার সেকালের নব্য বঙ্গ আন্দোলনের পথ নির্দেশকের ভূমিকা পালন করেছে। এই পত্রিকায় তরুণ যুক্তিবাদী মননের অনুশীলন ছিল লক্ষণীয়। তিনি সতীদাহ প্রথা আইনের কঠোর সমর্থক ছিলেন। স্ত্রী শিক্ষা প্রসারে ছিলেন অনলস। জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার আগে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে শিক্ষিত বাঙালির মতবিনিময়ের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতো। তিনি তার অগ্রগণ্য সদস্য ছিলেন। ধর্ম-দর্শন, রাজনীতি, বিজ্ঞান সমাজ চেতনা নানা ক্ষেত্রে তার ভাবনা চিন্তার ফসল তার গ্রন্থসমূহ। বাংলা ভাষায় প্রথম ১৩ ঘণ্টা প্রকাশিত এনসাইক্লোপিডিয়া বা বিশ্বকোষের (১৮৪৬-১৮৫১) রূপকার তিনি, যাঁর কেতাবি নাম ছিল বিদ্যাকল্পদ্রুম। এছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলি হল উপদেশ কথা(১৮৪০), ষড়দর্শন সংবাদ(১৮৬৭), খাগ্বেদ সংহিতা(১৮৫৭), রঘুবংশ(১৮৭৮), দ্য কুমারসম্ভব অফ কালিদাস(১৮৬৭), ডায়ালগস অন দ্য হিন্দু ফিলোসফি(১৮৬১) এবং এরিয়ান উইটনেস(১৮৫৭) ইত্যাদি।

বাঙালিদের মধ্যে বহু ক্ষেত্রেই তিনি পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি গির্জায় গিয়ে বাইবেলের বাণী প্রচার করেছেন বাংলায়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রসারে বিদ্যাসাগরের জন্য পথ প্রস্তুতির কাজ করেছেন। বর্ণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে সেকালেই সোচ্চার ছিলেন তিনি। তাই মিশনারি ডাফের ‘স্কটিশ চার্চ কলেজ’ এর সামনেই বাংলা মিশন ‘ক্রাইস্টচার্চ’ স্থাপন করেন। খ্রিস্ট ধর্ম তত্ত্ব নিয়ে গভীর অধ্যয়ন তাঁর অধ্যাপনার কাজে লাগে। সেকালে উইলিয়াম কেরি ও মাইকেল মধুসূদন ছিলেন বহুভাষাবিদ এটা সর্বজনবিদিত। কিন্তু এই তথ্য সেভাবে জনসমক্ষে আসেনি যে কৃষ্ণমোহন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দশটি ভাষা বলতে পারতেন, পড়তে পারতেন, লিখতে পারতেন। ভাষাগুলি হল সংস্কৃত, বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, ল্যাটিন, গ্রিক, হিব্রু, উর্দু, ফরাসি এবং ওড়িয়া। তিনিই প্রথম বাঙালি খ্রিস্টান যিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠিত করবার সাহস দেখিয়েছেন। তাঁর সাপ্তাহিক পত্রিকা এনকোয়ারার ছিল গোঁড়া হিন্দু সমাজের রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রধান হাতিয়ার। কলকাতার ধনাঢ্য সমাজের আশীর্বাদ না পেলেও ইয়ংবেঙ্গলদের সান্নিধ্য তাঁকে শক্তি যুগিয়েছে, তাঁর বাড়ী ছিল তাদের আড্ডাস্থল।

১৮৩১ সালের ২৩ আগস্ট সন্ধ্যায় তিনি বাড়ী ছিলেন না। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে বন্ধুরা প্রতিবেশী ব্রাহ্মণের বাড়ীতে গরুর হাড় নিক্ষেপ করেন। সেকালের কলকাতা আলোড়িত হয় এই ঘটনায়। প্রায়শ্চিত্ত করলে তাঁকে ঘর ছাড়তে হতো না। মচকাননি রেভারেন্ড, ঘর ছাড়েন। চৌরঙ্গী এলাকায় এক ইংরেজ ভদ্রলোকের ঘরে ঠাঁই পান। সেখান থেকেই কুসংস্কারের প্রতিবাদে ইংরেজি দ্য পার্সিকিউটেড নাটক লিখে ফেলেন।

অনেকে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন ছিল তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ১৮৬৮- র ৪ঠা জুলাই বিদ্যাসাগর এবং তিনি ইংল্যান্ডের রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হন। তিনিই প্রথম বাঙালি খ্রিস্টান যিনি বিশ্ব বিখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বোডেন প্রফেসর’ পদের জন্য নির্বাচিত হন। তিনি ধর্মান্তরিত হয়েও বাঙালিত্ব বিসর্জন দেননি। পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে বিশেষজ্ঞ হয়েও অন্ধ ভাবে আঁকড়ে ধরেননি। তাই ১৮৮১ সালে ‘দ্য রিলেশন বিটুইন ক্রিশ্চিয়ানিটি এন্ড হিন্দুইজম’ নামক গ্রন্থ রচনা করে দুই ধর্মতত্ত্বের প্রতিতুলনামূলক আলোচনা ও গবেষণার সুযোগ করে দেন।                                                       সময়ের দিক থেকে এগিয়ে জন্মানো মানুষটিকে নিয়ে সেকালের কলকাতায় বিতর্ক কম হয়নি। ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকার ঈশ্বর গুপ্ত ব্যঙ্গ করে তাই লিখেছিলেন-                                         ”হেদোর এঁদো জলে কেউ যেও না তায়।
কৃষ্ণ বন্দ্যোর জটে বুড়ি
শিকলি দেবে পায়।”  প্রচ্ছদ- রামকৃষ্ণ দাস