ক্রান্তিকালের মনীষা-১৯।। কালীপ্রসন্ন সিংহ।। বিনোদ মন্ডল

243
ক্রান্তিকালের মনীষা-১৯।। কালীপ্রসন্ন সিংহ।। বিনোদ মন্ডল 1

দাতাকর্ণ কালীপ্রসন্নক্রান্তিকালের মনীষা-১৯।। কালীপ্রসন্ন সিংহ।। বিনোদ মন্ডল 2

                                                 বিনোদ মন্ডল বাংলা কথ্য গদ্য আজ যখন ‘তুই তোকারি’ গদ্যে মিউটেশন করছে অনবরত, তখন স্মরণ করতে হয় অনবদ্য ‘হুতুম প্যাঁচার নকশা’ রচয়িতা বাবু কালীপ্রসন্ন সিংহকে ২৩.০২.১৮৪০—২৪.০৭.১৮৭০)। মাত্র ৩০ বছরের অস্ফুট জীবনে তিনি যে অসামান্য কীর্তি স্থাপন করে গেছেন, তা অনন্য, অভিনন্দন যোগ্য। জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত জমিদার বংশের সন্তান। শৈশবে বাবা মাকে হারিয়ে ঠাকুমার কোলে মানুষ হয়েছেন। সম্পত্তি দেখভাল করেছেন জাস্টিস হরচন্দ্র ঘোষ। সন্তান স্নেহে লালন করেছেন।

ক্রান্তিকালের মনীষা-১৯।। কালীপ্রসন্ন সিংহ।। বিনোদ মন্ডল 3

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কালীপ্রসন্ন হিন্দুস্থানী মার্গ সঙ্গীতের অনুরাগী ছিলেন। গীতিকার হিসেবে যথেষ্ট সমাদর পেয়েছেন সমকালে। কলাবতী বীণা আবিষ্কার করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সেকালে। লিখেছেন নাটক। অভিনয় করেছেন চুটিয়ে। ভাবতে অবাক লাগে ১৪ বছর বয়সে লিখে ফেলেছেন আস্ত নাটক বাবু (১৮৫৪)। বিক্রমোর্বশী(১৮৫৭) নাটকে রাজা পুরুরবার ভূমিকায় তাঁর অভিনয় দর্শকনন্দিত হয়েছিল।

অত্যন্ত সামাজিক এই মানুষটি আজীবন নানা সভা সমিতির সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। বিদ্যোৎসাহিনী সভার প্রতিষ্ঠাতা তিনি। এই সভার পত্রিকা ছিল বিদ্যোৎসাহিনী পত্রিকা। এছাড়াও পরিদর্শক নামে একটি বাংলা দৈনিক পত্রিকা তিনি সম্পাদনা করেছেন। এইসব কাজে যুক্ত থাকতে গিয়ে লেখ্য গদ্যের সংস্কারে মন দেন। যার সমীক্ষা পত্র- ‘হুতুম প্যাঁচার নকশা’। তখন এই বইকে কেন্দ্র করে সারস্বত কলকাতা আড়াআড়ি ভাগ হয়ে যায়। পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল ঝড় ওঠে। হুতোমি ভাষায় চটে যান সাহিত্য সম্রাটও। অবশ্য সে রাগ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে গুরুজ্ঞানে পূজা করতেন। তাঁর আহবানে নির্দ্বিধায় পাশে থাকতেন। বিধবা বিবাহ আইনপাশ হওয়া সত্বেও প্রচলনে সমাজের দ্বিধা দেখে তিনি পুরস্কার ঘোষণা করেন। প্রতি বিয়ে পিছু পাত্রকে ১০০০ টাকা যৌতুক দিতেন কালীপ্রসন্ন। কোট-প্যান্ট নয়, গুরুর অনুকরণে ধুতি আলোয়ান থাকতো অঙ্গ ভূষণ। পায়ে চটি। তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি সংস্কৃত মহাভারতের বঙ্গানুবাদ। এই কাজে প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র স্বয়ং।

মহাভারতের কথা যখন এল, আরও দু-একটি প্রাসঙ্গিক তথ্য সেরে নেওয়া যাক। ১৮ বছর বয়সে এ কাজে তিনি হাত দেন। আট বছর ধরে তাঁর বরানগরের ‘সারস্বতাশ্রম’ নামক বাগানবাড়িতে ১৮ পর্বের অনুবাদ কর্ম সাধিত হয়। তদানীন্তন আট বিখ্যাত সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিত এই কাজে তাঁকে অনলস সহযোগিতা করেছেন। না, একটি কপিও বিক্রি করেননি। কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে যারা সংগ্রহ করতে চেয়েছেন, তাদেরই তিনি ডাক মাশুল সহযোগে প্রদান করেছেন। দূর-দূরান্তে এই কাজে সহায়তার জন্য এজেন্ট নিয়োগ করেন। যার ফলে খ্যাতির পাশাপাশি দুর্ভোগও জুটেছিল যথেষ্ট। প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা মহাভারত ছাপানোর খাতে খরচ হয়ে যায়। ঋণ জালে জর্জরিত হন কালীপ্রসন্ন।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’ যখন সমালোচনায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে সর্বত্র, তখন মধু কবির পাশে দাঁড়ান তিনি। পত্রপত্রিকায় মাইকেলের প্রতিভার ভূয়সী প্রশংসা করেন। মধুসূদনের ‘মহাকবি’ উপাধি তাঁরই দেওয়া। সভা ডেকে মানপত্র, রৌপ্যস্মারক প্রদান করেছেন। সমালোচনার জবাবে হিন্দু প্যাট্রিয়টে কলম ধরেছিলেন– ‘ মাইকেল মধুসূদনের পক্ষ নিয়ে ঢাল তলোয়ার হাতে লড়াই করা আমাদের কাজ নয়। তবুও বলতে বাধ্য হচ্ছি, যারা লিখেছেন গ্রীক, লাতিন ইত্যাদি ভাষার সাহিত্য না পড়ে মাইকেলের কবিতার প্রশংসা করা হচ্ছে, হয় তারা নিজেরাই সেইসব পড়েননি কিংবা ছোটবেলায় মায়ের কোলে বসে আমাদের দেশের অসামান্য সাহিত্য গুলি শোনেননি অথবা শুনলেও ভুলে গেছেন। তা না হলে বুঝতে পারতেন মাইকেল মধুসূদন দত্তর কাব্য প্রতিভা কতখানি খাঁটি এবং দেশজ।’

দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটকের দ্বিতীয় সংস্করণ নিজের খরচে ছেপে বিলি করে দেন অকাতরে। এমনকি এই নাটক লেখার জন্য জেল যাত্রার পরিস্থিতি তৈরি হলে তাঁর পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। নাটকের ইংরেজি অনুবাদের জন্য চার্চ মিশনারি সোসাইটির ধর্মযাজক রেভারেন্ড জেমস লং-এর যে আর্থিক জরিমানা হয়, সে অর্থ তিনি কোর্টে জমা দেন। শুধু কি তাই ! বিচারক ওয়েলস সাহেব ছিলেন তীব্র বাঙালি বিদ্বেষী। কথায় কথায় ‘বাঙালিরা সবাই মিথ্যাবাদী’ বলে এজলাসে লাফালাফি করতেন। ভদ্রলোকের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে নালিশ করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছিলেন।

তিনি নানা ব্যস্ততার মাঝেও প্রশাসনিক বহু দায়িত্ব পালন করেছেন। অনারারী ম্যাজিস্ট্রেট, ন্যায়পাল, কলকাতার মুখ্য পুরশাসক, কলকাতার পুরাধ্যক্ষ (কমিশনার) প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছেন। দাতাকর্ণ হিসেবে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে তখন। হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার সঙ্কটে ৫০,০০০ টাকা দিয়ে তা কিনে নিয়ে নিজে চালাতে শুরু করেন। পানীয় জলের সংকট দেখে কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকায় নিজের খরচে কল বসিয়ে দেন। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর আহূত সভায় সাহায্যের জন্য গায়ের বহুমূল্য আলোয়ান খুলে দেবেন বাবুর হাতে তুলে দেন।

এইসবের সমবেত যোগফল ঋণ জর্জরিত হওয়া। যারা একসময় উপকৃত হয়েছেন তারাই বিপদে মামলা করেছেন। ২০ খানা মামলায় জড়িয়ে বরানগরের বাগানবাড়িতে শেষ চার বছর একপ্রকার মুখ লুকিয়ে কাটান। রক্তাক্ত হৃদয় নিঃস্ব রিক্ত মানুষটি তাঁর সারস্বতাশ্রমে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।