Homeএখন খবরক্রান্তিকালের মনীষা-৪৩ ।। উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী ।। বিনোদ মন্ডল

ক্রান্তিকালের মনীষা-৪৩ ।। উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী ।। বিনোদ মন্ডল

বিচিত্র প্রতিভাধর উপেন্দ্রকিশোর                           
                                              বিনোদ মন্ডল

নবজাগরণের আলোয় উদ্ভাসিত বাংলায় সর্বশ্রেষ্ঠ বহুমুখী প্রতিভার নাম – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু তারপর যে বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী মানুষটি সমকালীন সময় ও সমাজকে সবচেয়ে বেশি আলোকিত করেছেন তিনি উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী( ১২.০৫. ১৮৬৩ — ২০.১২. ১৯১৫)।

নানা বিপরীতধর্মী শিল্প মাধ্যমের কুশলি- কোলাজ এই মানুষটি। ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিক ছাপাখানার অগ্ৰপথিক তিনি। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম জনপ্রিয় শিশুতোষ সাহিত্যিক। তিনি ছিলেন পত্রিকা সম্পাদক ও প্রকাশক। রঙে ও রেখায় পারদর্শী চিত্রকর এবং আলোকচিত্রী। বিশিষ্ট সুরকার ও যন্ত্রশিল্পী। জ্যোতির্বিদ ও বিজ্ঞানকে সাধারণের স্বার্থে প্রচার ও প্রসারে অনলস মনস্বী।

এদেশে মুদ্রণের জগতে এখন যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তার বর্ণচ্ছটায় আমাদের চোখ কপালে ওঠে। অতি দ্রুত যে কোনো ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ছবি ও লেখার কোলাজসহ ফ্লেক্স ছাপা হচ্ছে আজ। প্রিন্টিং মিডিয়ার এই যুগান্তরে আমাদের উপেন্দ্রকিশোরের অবদান মনে রাখতে হবে। ম্যাড়ম্যাড়ে ছাপা দেখে বিরক্ত হতেন তিনি। তখনকার সাধারণ লেটার প্রেসে প্রথম রঙিন ছবি ছেপে পাশ্চাত্য জগতকে চমকে দেন তিনি। দীর্ঘ ভাবনার ফসল তাঁর হাফটোন ব্লক। ১৮৮৫ সালে যখন জাতীয় কংগ্রেস অঙ্কুরিত হচ্ছে, তখন তিনি বিদেশ থেকে ছাপাখানার জন্য নানা যন্ত্রাংশ কিনে এনে প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজস্ব প্রেস ‘U. Ray & Sons’. ৭ নং শিবনারায়ন দাস লেনের ভাড়া বাড়িতে চালু হওয়া প্রেসের পাশের ঘরে স্থাপন করেন স্টুডিও। মুদ্রণ বিষয়টি যে তাঁর ধ্যান-জ্ঞান-স্বপ্ন ছিল, তার প্রমাণ মেলে- বড় ছেলে সুকুমারকে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে তিনি ফটোগ্রাফি ও মুদ্রণ বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেতে পাঠান।

নাছোড় মানুষটি ছাপাখানার বিকাশে অসীম উদ্ভাবনী ক্ষমতার স্বাক্ষর রেখেছেন। রঙিন মুদ্রণের জন্য ডায়াফর্ম যন্ত্র তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত। স্ক্রিন অ্যাডজাস্টার মেশিন, ডুয়োটাইপ ও টিন্ট প্রসেস তাঁর অবদান। তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতেই রে স্ক্রিন অ্যাডজাস্টার এবং রে টিন্ট সিস্টেম চালু হয়েছে। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রিটেনে বাণিজ্যিকভাবে স্ক্রিন অ্যাডজাস্টিং মেশিন বানানো ও বিক্রয় শুরু হয়। ব্রিটেনে সেকালে মুদ্রণকলা বিষয়ক সবচেয়ে অভিজাত পত্রিকা পেনরোজ তাঁর প্রতিভাকে মর্যাদা দিয়েছে। তাদের ১৯০৪-০৫ বার্ষিক সংখ্যা এবং ১৯০৫-০৬ বার্ষিক সংখ্যায় তাঁর মুদ্রণ বিষয়ক গবেষণামূলক প্রবন্ধ ও তাঁকে উপজীব্য করে পত্রিকাটি তাদের সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে। শুধু তাই নয়, এই সময় মুদ্রণ বিষয়ক তাঁর ন’খানি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে পেনরোজ পত্রিকা। প্রতিটি লেখাই মৌলিক ভাবনা চিন্তার ফসল; নতুন নতুন দিগন্তের উন্মোচক।

ময়মনসিংহ জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাশ করে এই মেধাবী তরুণটি এসে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। কলকাতায় থাকার সুবাদে ব্রাহ্ম সমাজের সঙ্গে জড়িয়ে যান। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে মজলিশে যোগাযোগ থাকলেও শিবনাথ শাস্ত্রী এবং দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীদের ব্রাহ্মসমাজে যুক্ত হন তিনি। সখা, সাথী, মুকুল ও বালক পত্রিকায় নিয়মিত লিখতে শুরু করেন। ১৮৮৩ সালে সখা পত্রিকায় জীববিজ্ঞান বিষয়ে লিখেছেন তথ্যধর্মী প্রবন্ধ। প্রথমদিকে বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধেই স্বচ্ছন্দ ছিলেন তিনি। বালকের সম্পাদিকা ছিলেন জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। সেই পত্রিকায় লেখা ছাড়াও প্রকাশনার নানা কাজে সহযোগিতা করতেন তিনি।

কিন্তু অন্যের কাগজে লেখা প্রকাশে উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটানোর ক্ষেত্রে পুরো স্বাধীনতা থাকেনা। সেই যন্ত্রণা থেকেই উপেন্দ্রকিশোর নিজে পত্রিকা প্রকাশের ও সম্পাদনার জগতে চলে আসেন। সন্দেশ তার পথ চলা(১৯১৩)শুরু করে, যে আজ ইতিহাস। পত্রিকার নামের মধ্যে পত্রিকার চরিত্র উদ্ভাসিত। একই সঙ্গে সংবাদ এবং মিষ্টান্ন। পত্রিকার প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যায় (১ বৈশাখ ১৩২০) সম্পাদক পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন ; ‘ আমরা যে সন্দেশ খাই, তাহার দুটি গুণ আছে উহা খাইতে ভালো লাগে, আর উহাতে শরীরে বল হয়। আমাদের যে পত্রিকাখানি ‘সন্দেশ’ নাম লইয়া সকলের নিকট উদ্ভাসিত হইতেছে, ইহাতেও যদি এই দুই গুন থাকে – অর্থাৎ ইহা পড়িয়া যদি সকলের ভালো লাগে আর কিছু উপকার হয়, তবেই ইহার ‘সন্দেশ’ নাম সার্থক হইবে।’ বোঝাই যাচ্ছে, শিশু-কিশোরদের বৌদ্ধিক- মানসিক বিকাশ, সার্থক মূল্যবোধ, সুস্থ ও পরিকল্পিত রুচি, বিজ্ঞান, পুরাণ ও ইতিহাস চেতনা গড়ে তোলা, প্রকৃতিপ্রেম এবং কল্পনাশক্তিকে বিকশিত করাই ছিল ‘সন্দেশের’ লক্ষ্য।

সাধারণ গল্প, কবিতা, ছড়া যেমন ছাপা হত, তার পাশাপাশি সম্পাদকের পছন্দের নানা বিষয় ঠাঁই পেত পত্রিকায়। বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ, বিশ্ব মনীষীগণের জীবনী, ধাঁধা এবং প্রতিটি পাতায় মানানসই ছবি। অন্যান্য পত্রিকার তুলনায় রূপে রঙে অসাধারণ বর্ণময় চরিত্রেরা, যেমন, রচনাশৈল্পী, তেমনি পরিবেশনা, যেমন উন্নত মানের লে-আউট, তেমনি ঝকঝকে ছাপা। প্রতিটি পাতায় উপেন্দ্রকিশোরের নতুন নতুন ভাবনার প্রক্ষেপণ ধরা থাকতো। আর লেখকসূচিও ছিল তেমনি ওজনদার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, কালিদাস রায়, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিবনাথ শাস্ত্রী, কুলদারঞ্জন রায়, সীতা দেবী, প্রিয়ম্বদা দেবী, কেদার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। আর মধ্যমণি ছিলেন তিনি নিজে।তাঁর বহুবর্ষী রচনায় সেজে উঠেছে ব্যতিক্রমী সন্দেশ।

সন্দেশের খিদে মেটাতেই তাঁর নানা ধরনের লেখালেখির উড়ান লক্ষ করা যায়। যোগীন্দ্রনাথ সরকার তাঁর ‘সিটি বুক সোসাইটি’ থেকে ‘ছেলেদের রামায়ণ’ প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে নিজের প্রেস থেকে অসংখ্য বই ছাপা হয়েছে। ছেলেদের মহাভারত, ছোট্ট রামায়ণ, মহাভারতের কথা, সেকালের কথা, সেরা কিশোর গল্প, সেরা হাসির গল্প, ছোটদের সেরা বিজ্ঞান রচনা সংকলন। তাঁর বিখ্যাত টুনটুনির বই। উপেন্দ্রকিশোর রচনা সমগ্র। গুপি গাইন বাঘা বাইন। টুনটুনির গল্প। বাঘকে সামনে রেখে নানা কিশোর রচনা — বাঘ মামা আর শিয়াল ভাগ্নে, বাঘ-বর, বোকা বাঘ, বাঘের পালকি চড়া, বাঘের রাঁধুনি, বাঘের উপর টাগ। এছাড়া আরও তাঁর সমান জনপ্রিয় কাহিনীগুলি হল – জোলা আর সাত ভূত, টুনটুনি আর বিড়ালের কথা, টুনটুনি আর রাজার কথা, কুঁজো বুড়ির গল্প, টুনটুনি আর নাপিতের কথা, শিয়াল পন্ডিত, কাজীর বিচার ইত্যাদি। এইসব লেখায় রবীন্দ্রনাথের কোন প্রভাব নেই। কি বিষয় নির্বাচনে, কি রচনাশৈলীতে। নিজের মত করে সহজ সরল চলিত বাক্য বিন্যাসে শ্রম ও সংকল্পকে সার্থক করেছেন তিনি। প্রথার বাইরে গিয়ে লিখেছেন ‘সহজ বেহালা শিক্ষা’ এবং ‘শিক্ষক ব্যতিরেকে হারমোনিয়াম’ এই গ্রন্থদুটি।

এই গ্রন্থ দুটির প্রসঙ্গ সূত্রে বলা দরকার গীতিকার এবং সুরকার হিসেবে সমান পরিচিতি ছিল তাঁর। সে সময়ে কলকাতার সেরা বেহালাবাদক ছিলেন তিনি।হারমোনিয়ামের রিডে আঙুল চালিয়ে সুরের মোহিনীমায়া সৃষ্টি করতে পারতেন তিনি। এছাড়াও বাজাতেন বাঁশের বাঁশি, সেতার, পাখোয়াজ । জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে যাতায়াত এবং সুরের সাগরে অবগাহন ছিল একটা সময় তাঁর রোজকার সান্ধ্য সাধনা। অসম্ভব মেধাবী এই মানুষটি গণিত, ভূতত্ত্ব, জ্যোতির্বিজ্ঞান,জীবজগৎ, মহাবিশ্ব নিয়ে নিজে ভেবেছেন, সমকালীন সমাজকে ভাবিয়েছেন। আলোকচিত্র নিয়ে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষার অন্ত ছিল না। গ্রামে গ্রামে গিয়ে প্রচলিত ছড়া, উপকথা, লোককথা সংগ্রহের মাধ্যমে শিকড়কে পল্লবিত করেছেন। আবার তাকে নানা মজাদার কাহিনীর মোড়কে পরিবেশন ও প্রকাশ করেছেন।

১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ২৩ বছর বয়সে মেস জীবন সাঙ্গ করে মিসেস – জীবনে প্রবেশ করেন তিনি। ব্রাহ্ম-নেতা ও সমাজ সংস্কারক দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীর প্রথমপক্ষের কন্যা বিধুমুখীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তখনকার কলকাতার কর্নওয়ালিস স্ট্রীটের ব্রাহ্মসমাজের মন্দিরের বিপরীতে লাহাবাড়ির দোতলায় ভাড়াবাড়িতে সংসার শুরু হয় তাঁদের। একে একে সুখলতা, সুকুমার, পুণ্যলতা, সুবিনয়, শান্তিলতা এবং সুবিমল – তিন কন্যা ও তিন পুত্রের পিতা হন তিনি। ১৯০১ – এ উপেন্দ্র উঠে আসেন ২২ নং সুকিয়া স্ট্রীটের বাড়িতে। বাড়ির এক তলায় অফিস, প্রেস, ছবির ল্যাবরেটরি। মাঝখানে টানা উঠোন, আর পশ্চিমদিকে ফটোগ্রাফির ডার্করুম ও দোতলায় যাওয়ার সিঁড়ি। এখানেই বঙ্গ মনীষার নানা প্রতিভার পদচিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাবে।আচার্য্য জগদীশচন্দ্র বসু,আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, কুন্তলীন পুরস্কারখ্যাত হেমেন্দ্রমোহন বসু, এসেছেন রবীন্দ্রনাথও।

পুত্র সুবিমল স্মৃতিচারণায় লিখেছেন – রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ৪০/৪১বছর হবে। বাবা তাঁকে আগে থেকেই চিনতেন। রবীন্দ্রনাথের তখন কালো চুল, কালো দাড়ি। তিনি বাবার সঙ্গে কথা বলছিলেন আর আমি অনেক দূরে দাঁড়িয়ে একটু দেখছিলাম। তিনি বাবার বেহালা শুনতে বড় ভালবাসতেন।

কোনদিন কারো কাছে আঁকা শেখেননি। অথচ স্কুল জীবন থেকে কাগজ ও পেন্সিল একসাথে পেলে কাটাকুটি আঁকাআঁকি শুরু হয়ে যেত সহজে। কিংবদন্তি আছে, স্কুলে পড়ার সময় ইন্সপেক্টর ইডেন সাহেব যখন ক্লাসে ছাত্রদের উন্নয়ন যাচাই করছিলেন তখন তিনি পেছনে বসে তাঁরই পেন্সিল স্কেচ আঁকছিলেন। ধরেও ফেলেন সাহেব। তবে ভর্ৎসনা নয়, উৎসাহ দিয়েছেন – ‘আঁকা কখনো ছেড়ো না তুমি।’

মধুমেহ রোগের তখন চিকিৎসা ছিল না। তাই মাত্র ৫৩ বছর পরমায়ু ছিল তাঁর। তবু আনন্দের বিষয়, বাংলা শিল্প সংস্কৃতির জন্য রেখে গেছেন সৃজনমুখর বংশলতিকা এবং বিস্ময়কর রচনাসম্ভার।

RELATED ARTICLES

Most Popular