ক্রান্তিকালের মনীষা-২১: ডিরোজিও।। বিনোদ মন্ডল

ক্রান্তিকালের মনীষা-২১:  ডিরোজিও।। বিনোদ মন্ডল 1

বৈশাখী ঝড় ডিরোজিওক্রান্তিকালের মনীষা-২১:  ডিরোজিও।। বিনোদ মন্ডল 2

                                    বিনোদ মন্ডল   

ক্রান্তিকালের মনীষা-২১:  ডিরোজিও।। বিনোদ মন্ডল 3

কেউ বলেছেন ঝড়ের পাখি (Stromy Petrel) কেউ বা বৈশাখী ঝড়। সেই ঝড়টা স্তব্ধ হয়ে গেল ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে। সালটা ১৮৩১। বড়দিনের আনন্দে মশগুল কলকাতা। তার প্রাণকেন্দ্র পার্কস্ট্রিট। না, তখনও ঝড়ের অভিঘাত সে ভাবে বোঝা যায়নি। শুধু কলকাতার সাধারণ মানুষ জানল এক ইউরেশীয় যুবকের মৃত্যু হয়েছে কলেরায়। বয়স ২২। তাকে সমাধিস্থ করার জন্য চলছে দড়ি টানাটানি। কয়েকজন বঙ্গ তনয় চাইছেন ইউরোপীয় সমাধি ক্ষেত্রেই তাঁকে সমাহিত করা হোক কিন্তু সংখ্যায় ভারি গোঁড়া ক্রিশ্চান বিশেষ করে ক্ষমতা ঘেঁষার দল তাঁকে সেখানে জায়গা দিতে রাজি নয়।

তাঁর শরীরে অবিমিশ্র নীল রক্ত নেই! বাবা ইংরেজ হলেও, মা পর্তুগিজ, ভারতীয়। তথাকথিত আধুনিক ব্রিটেনের গায়ে তখনও জাতপাতের কাদা। এগিয়ে এলেননা কলকাতার নাম করা বাবু বাঙালির দল। ছেলেটির ছিল বিদ্রোহের ধ্বজা ওড়ানো জীবন।  মাত্র কয়েক বছরেই তছনছ করে দিয়েছেন বাবু বাড়ির কিশোর আর তরুণ বঙ্গ সন্তানদের জীবন। সব মিলিয়ে তাই এই দলিত খ্রিস্টানের সমাধি দেওয়ার জন্য জায়গা হল না ভেতরে। সেমেটরির বাইরে প্রাচীরের ধারে সমাহিত করা হল। পথ চলতি মানুষ রঙ্গ দেখে সরে পড়ল।

ঝড়ের প্রভাব জানা গেল তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন পরেই যখন মানুষটার অবদান ছড়িয়ে পড়ল চতুর্গুণ শক্তি নিয়ে। ফিনিক্স পাখির মতো বিকশিত হল তাঁর সাধের ইয়ং বেঙ্গল গ্রুপ। তিনি হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও (১৮ এপ্রিল ১৮০৯ — ২৬ ডিসেম্বর ১৮৩১)। রক্ষণশীল বাঙালির কাছে যিনি ‘দ্রজু ফিরিঙ্গি’।

মৌলালি অঞ্চলে এক সচ্ছল পরিবারে জন্ম তাঁর । শখ ছিল ক্রিকেট খেলা, ঘোড়ায় চড়া, কবিতা, নাচ। দলিতদের তখন স্কুল-কলেজে প্রথাগত শিক্ষা গ্রহণের অনুমোদন ছিল না। এমনকি উকিল সহ কিছু পেশা গ্রহণেও নিষেধাজ্ঞা ছিল। তাই তাঁকে হেনরি ড্রামন্ডের স্কুলে ৬-১৪ বছর পর্যন্ত পড়াশোনা করতে হয়। চৌদ্দ বছর বয়সেই কর্মজীবনে প্রবেশ তাঁর। প্রথমে বাবার কলকাতার অফিসে, পরে কাকার ভাগলপুরের অফিসে নীল দফতরে যোগদান। এখানেই নিসর্গের অনুপম সান্নিধ্যে কাব্যচর্চায় মনোযোগ প্রদান। সাথে প্রচুর আত্মপাঠ। গভীর জ্ঞানান্বেষণ।

এই কাব্যচর্চার সুবাদে দ্যা ইন্ডিয়া গেজেট-এর সম্পাদক ড.জন গ্রান্টের নজরে আসেন এই বিস্ময় প্রতিভা। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৮২৬ এ কলকাতায় ফিরে আসেন। যোগ দেন পত্রিকার সহ-সম্পাদক পদে। সঙ্গে জুভেনিস ছদ্মনামে দেদার লেখালেখি। অনেকে বলেন এসে একসাথে কিছুদিন দুটো চাকরি করেছেন ডিরোজিও। পত্রিকার সহ-সম্পাদকের সাথে হিন্দু কলেজে অধ্যাপনা। পরে কাগজের কাজ ছেড়ে দেন।

তখন হিন্দু কলেজ স্বমহিমায় মহীয়ান। ডিরোজিও যুক্ত হওয়ায় ফ্যাকাল্টি আরও বর্ণময় হল। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৭! তাঁর নিয়োগ ছিল ইংরেজি সাহিত্য ও ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক হিসেবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল সাহিত্য ও ইতিহাসের পাশাপাশি তিনি পড়াচ্ছেন দর্শন ও বিজ্ঞান। ক্ষেত্র সমীক্ষার জন্য চলে যাচ্ছেন ছাত্রদের নিয়ে দলবেঁধে এখানে ওখানে। সভা সমিতিতে। ছাত্রদের মধ্যে যারা সম্পন্ন, তাদের বৈঠকখানায়, আউট হাউসে, এমনকি নিজের বাড়িতেও। যাঁদের অনেকে পরে প্রতিষ্ঠা ও যশোলাভ করেন। সমাজের নানান ক্ষেত্রে, নানান পেশায় ছড়িয়ে যান কলকাতায়, ভারতে,এমনকি বিদেশেও।

তাঁদের মধ্যে স্বনামধন্য কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা প্রয়োজন। কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রসিককৃষ্ণ মল্লিক, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, মাধবচন্দ্র মল্লিক, রামতনু লাহিড়ী, শিবচন্দ্র দেব, হরচন্দ্র ঘোষ, রাধানাথ শিকদার, গোবিন্দ চন্দ্র বসাক, অমৃতলাল মিত্র, প্যারীচাঁদ মিত্র প্রমুখ। সবাই যে এঁরা খাতা-কলমে হিন্দু কলেজে তাঁর কাছেই পড়েছেন এমন নয়, কিন্তু এঁরা সবাই তাঁর ভাব শিষ্য এবং ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের পুরোধা।

বাংলা তথা ভারতবর্ষের উনিশ শতকীয় নবজাগরণের ইতিহাসে এঁরা অগ্রগণ্য পদাতিক। প্রথম সংগঠিত দল যাঁরা সমাজের রক্ষণশীলতা, অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, প্রাচীন ক্ষয়িষ্ণু প্রথা, অশিক্ষার বিরোধিতা করতে যুক্তি ও বিজ্ঞানের আয়ুধ হাতে নিয়েছেন। ডিরোজিও ছাত্রদের শিক্ষা দিতেন –তোমরা সমাজ বিকাশের ধারা অনুধাবন করো। মানুষের জীবনে সমাজ ও নানা প্রতিষ্ঠান, তার পরিবারের গুরুত্ব উপলব্ধি করো। জ্ঞানের প্রতি অনন্ত অনুরাগী হও। তাই সভা-সমিতিতে ভলতেয়ার, হিউম, লক, টমাস পেইন প্রমুখের রচনাবলি নিয়ে আলোচনা হতো। চুলচেরা বিশ্লেষণ চলত। তাঁর স্লোগান ছিল — সত্যের জন্য বাঁচো সত্যের জন্য মরো। তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে নানা সভা-সমিতি গঠিত হল ও পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হতে লাগল। শুরু হল মৌলিক সাহিত্যচর্চাও।

কিন্তু এর ফলে খ্যাতির পাশাপাশি তাঁর শত্রু সংখ্যাও বৃদ্ধি হল গুণিতকে। পাশ্চাত্য ভাবধারার সঙ্গে হিন্দু রক্ষণশীলতার লড়াই তীব্র হল। কিছু ক্ষেত্রে তাঁর ছাত্রদের দলবদ্ধ হয়ে নানা জেহাদী কার্যকলাপ সেই সংঘাতে ইন্ধনের কাজ করলো। বিশেষত হিন্দুদের কাছে যা কুখাদ্য তা তারা প্রকাশ্যে গ্রহণ করা শুরু করল। এর প্রভাবে কলেজের অভিভাবকরা কেউ কেউ নিজের সন্তানকে হিন্দু কলেজ থেকে ছাড়িয়ে নিলেন। কিছু ছাত্র নিয়মিত ক্লাসে আসা বন্ধ করে দিল। কয়েকজন অভিভাবক কর্তৃপক্ষের কাছে ডিরোজিওর বিরুদ্ধে লিখিত নালিশ করলেন। ১৮৩১ সালের ২৩ এপ্রিলে আয়োজিত সভায় দীর্ঘ আলোচনার পর ডিরোজিওকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত ৬-২ ভোটে গৃহীত হয়। আজকের প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় যা তখনকার হিন্দু কলেজ, যার অসংখ্য গরিমাময় ঐতিহ্য আজ বিশ্ববন্দিত; সেই কলেজের ইতিহাসে দিনটা বোধ হয় সবচেয়ে কলঙ্কময়। কেননা সেই সিদ্ধান্তের জেরে ডিরোজিও ইস্তফা দিতে বাধ্য হন।

চলে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া’ সম্পাদনা। চলে ক্যালকাটা গেজেট প্রকাশ। আসে অর্থাভাব। আসে দারিদ্র্য। সামাজিক আন্দোলনে মাত্রা যোগ করে শুরু হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রকাশ্য বিরোধিতা। নিজে দলিত হওয়ায় একটা অবদমিত হীনমন্যতা ভেতরে ছিলই, তা আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে দিগ্বিদিকে।

তখন কলেরা ছিল দুরারোগ্য ব্যাধি। দিন সাতেকের ভোগান্তি। ২৬ ডিসেম্বর যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছেন, তখনও তাঁর মৃত্যু শয্যায় পাশে রয়েছেন প্রিয় শিষ্যমন্ডলীর কয়েকজন, যারা পরবর্তী দুই দশক নানা আন্দোলনের উদ্ভাসে ডিরোজিওকে অমরত্ব প্রদানে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবেন।