ক্রান্তিকালের মনীষা-৩৮।। মৃত্যুঞ্জয়ী রবীন্দ্রনাথ।। বিনোদ মন্ডল

84
Advertisement

মৃত্যুঞ্জয়ী রবীন্দ্রনাথ                                                                                   বিনোদ মন্ডল          “জীবন আমার
এত ভালোবাসি বলে হয়েছে প্রত্যয়,
মৃত্যুরে এমনই ভালোবাসিবো নিশ্চয়।।” (মৃত্যু/নৈবেদ্য)                                                        বাঙালি মনীষা ও সংস্কৃতিকে ১৯ শতকের শেষ বেলায় এবং বিশ শতকের শুরুর চার দশকে অনন্ত মহিমা ও উদার শীর্ষতা দান করেছেন রবীন্দ্রনাথ। আশি বছরের দীর্ঘ পরমায়ু জুড়ে বিশ্বের ঘাটে ঘাটে ছুঁয়ে গেছেন অগণ্য মেধাবী প্রতিভা। তাঁর আলোয় আলোকিত হয়েছেন অনেকেই। আবার অনেকে আলোড়িত করেছেন কবিকেও। হয়ে উঠেছেন রবীন্দ্রনাথ। জীবনভর। তাঁর এই চলার পথে অনিবার্য ভাবেই প্রিয়জন বিয়োগ ব্যথায় কখনো কাতর হয়েছেন, কখনো দার্শনিক প্রজ্ঞায় আত্মসংবরণ করে অবলীলায় জীবনের ছন্দে ফিরে এসেছেন। ক্রমে মৃত্যুঞ্জয় হয়ে উঠেছেন। আবু সয়ীদ আইয়ুব যথার্থ বলেছেন, “কোনো কালে কোনো দেশে একজন মানুষও যদি নিজ মর্ত্য সীমা চূর্ণ করে থাকে তাহলে তিনি রবীন্দ্রনাথ।”

Advertisement

প্রথমে আসি কবির মায়ের কথায়। সারদা দেবীর প্রয়াণে (১৮৩০ — ৮.৩.১৮৭৫) এত বড় যৌথ পরিবারে শৃঙ্খলার রাশ কিছুটা আলগা হয়ে যায়। তবে মাতৃবিয়োগে রবীন্দ্রনাথের মত ১৪ বছরের কিশোরের প্রতিক্রিয়া কী ছিল তা তেমন জানা যায় না। ‘জীবনস্মৃতিতে’ সামান্য উল্লেখ আছে। বাবাকে নিয়ে কবি বারংবার উচ্চকিত। কিন্তু মায়ের প্রসঙ্গে প্রায় নীরব। শৈশবে তিনকড়ি দাইয়ের হাতে, কৈশোরে ব্রজেশ্বর, শ্যাম ও ঈশ্বরের হাতে কিংবা বলা ভালো শাসনাধীনে ‘অকালচেতন’ বালকের প্রহর কেটেছে। রানী চন্দ খুব সুন্দর ভাবে লিখেছেন – “কখনো বা তাঁর মা’র গল্প করতে করতে বলতেন, মাকে আমরা জানি নি, তাঁকে পাইনি কখনো। তিনি থাকতেন তাঁর ঘরে তক্তপোশে বসে, খুড়ির সঙ্গে তাস খেলতেন। আমরা যদি দৈবাৎ গিয়ে পড়তুম সেখানে, চাকররা তাড়াতাড়ি আমাদের সরিয়ে আনত – যেন আমরা একটা উৎপাত। মা যে কী জিনিস তা জানলুম কই আর। তাইতো তিনি আমার সাহিত্যে স্থান পেলেন না’। ফলে, বাস্তবে আমাদের বীরপুরুষের কাল্পনিক মাকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। রানী চন্দ এবার লিখেছেন কিছু বিস্ফোরক বাক্য: আমার বড় দিদি আমাকে মানুষ করেছেন। তিনি আমাকে খুব ভালোবাসতেন। মার ঝোঁক ছিল জ্যোতিদা আর বড়দার উপরেই। আমি তো তাঁর কালো ছেলে। বড়দির কাছে কিন্তু সেই কালো ছেলে ছিল সবচেয়ে ভালো। তিনি বলতেন, যাই বলো রবির মত কেউ না। বড় দিদির হাত থেকে আমাকে হাতে নিলেন নতুন বউঠান।

Advertisement
Advertisement

হ্যাঁ, এই নতুন বউঠানই হলো রবীন্দ্রসাহিত্যে বহু উচ্চারিত, শংসিত ও নন্দিত চরিত্র। পৈত্রিক নাম কাদম্বিনী হলেও বিয়ের পর তিনি কাদম্বরী নামে অভিষিক্ত (৫.৭.১৮৫৯ –১৯.৪.১৮৮৪)। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বিবাহ হয় ১৮৬৮ এর ৫ জুলাই। নয় বছর বয়সে। কবি তাঁকে মোট সাতটি গ্রন্থ উৎসর্গ করেছেন। জীবদ্দশায় পাঁচটি এবং দুটি বউঠানের আত্মহত্যার পরে। নিঃসন্তান কাদম্বরীর বিবাহিত জীবন ১৫ বৎসর ৯ মাস ১৫ দিন। আর রবীন্দ্রনাথের বিবাহের ৪ মাস ১১ দিনের মাথায় এই দুর্ঘটনা ঘটে যায়।

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে। সে তো আজকে নয়, সে আজকে নয়’ কিংবা মরি লো মরি, আমায় বাঁশিতে ডেকেছে কে’ জাতীয় সব উচ্চারণ নতুন বউঠানকে লক্ষিত। ‘তারকার আত্মহত্যা’, ‘সুখের বিলাপ’, ‘অসহ্য ভালোবাসা’, ‘স্তন’, ‘চুম্বন’, ‘বাহু’ শীর্ষক কবিতাবলি সহ অসংখ্য গানে কবি কাদম্বরী দেবীকে স্পর্শ করেছেন। যা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত জায়মান ছিল।

নতুন বউঠানের আগেই তাঁর জীবন রঙ্গমঞ্চে যে কিশোরী তাঁকে প্রথম নারীসঙ্গ দান করেন তিনি আনা তড়খড়। প্রথমবার বিলেত যাওয়ার আগে ১৮৮৭ সালে কবি ১৭ বছর বয়সে বোম্বাইতে ডা: আত্মারাম পান্ডুরঙের বাড়িতে কিছু দিন কাটান। এই আনা (১৮৫৫ – ৫.৭.১৮৯১) ডা: আত্মারামের দ্বিতীয় কন্যা। জাতিতে মারাঠি, ধর্মে পার্সী, উচ্চ শিক্ষিত মার্জিত রুচির এই আনা, মাতৃভাষা মারাঠি ছাড়াও ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান ও পর্তুগিজ ভাষায় চোস্ত ছিলেন। কিশোর কবির নিকটে বাংলা শেখেন। কবি তাঁর একটি ডাক নাম দিয়েছিলেন – নলিনী। অকালপ্রয়াত আনাকে নিয়ে ‘ছেলেবেলা’ তে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন – তাঁর কথা। বললেন, ‘ কবি তোমার গান শুনলে আমি বোধহয় আমার মরণ দিনের থেকেও প্রাণ পেয়ে জেগে উঠতে পারি।’ এর পরের অনুচ্ছেদে আছে – ‘ একটা কথা আমার রাখতেই হবে, তুমি কোনো দিন দাড়ি রেখো না; তোমার মুখের সীমানা যেন কিছুতেই ঢাকা না পড়ে।’

‘ তাঁর এই কথা আজ পর্যন্ত রাখা হয়নি, সে কথা সকলেরই জানা আছে। আমার মুখে অবাধ্যতা প্রকাশ পাওয়ার পূর্বেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।’      আনার শোকেই চিরকাল কবি গোঁফ দাড়ি ধারণ করলেন ভাবতে ভালো লাগে।                                                 সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে কবির মালাবদলসহ অম্লমধুর সম্পর্ক বহুচর্চিত। বঙ্কিমচন্দ্রের (২৭.৬.৩৮ – ৮.৪.১৮৯৮) ‘বন্দেমাতরম’ সংগীতে সুরারোপ করেন কবি। উভয়ে তখন ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঘনিভূত ক্ষোভ, যন্ত্রণা, ও প্রতিবাদকে প্রবন্ধে তুলে ধরছেন। রবীন্দ্রনাথের ‘ইংরেজি ও ভারতবাসী’ শীর্ষক প্রবন্ধ পড়া হলো চৈতন্য লাইব্রেরীতে আয়োজিত সভায়। রবীন্দ্রনাথ নিজে পড়লেন। সেই সভায় সভাপতিত্ব করেন ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র। সেটাই দুজনের শেষ সাক্ষাৎ।

তার কদিন বাদেই সাহিত্যসম্রাট প্রয়াত হন। এ তথ্য আমাদের জানা জরুরী, সভাপ্রেমী বাঙালি এই প্রথম রবীন্দ্রনাথের নেপথ্য উদ্যোগে একটি শোকসভার শরিক হলেন। বঙ্কিম স্মৃতি তর্পণ সভাই বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে আয়োজিত প্রথম স্মরণসভা।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ বৃদ্ধ হচ্ছেন। ধীরে ধীরে পৈত্রিক জমিদারি, ব্যবসার চাপে কর্মব্যস্ত রবীন্দ্রনাথকে সহায়তা করছেন মনোযোগহীন সুরেন্দ্রনাথ ও রোগাক্রান্ত বলেন্দ্রনাথ। সাহিত্য রাজনীতি পত্রিকা প্রকাশ তো আছেই। এসময় প্রিয় ভাইপো বলেন্দ্রনাথ ( ৬.১১.১৮৭০ – ২০.৮.১৮৯৯) বিদায় নিলেন। ভাদ্রের ভরা বর্ষায় কবিকে কাঁদিয়ে। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার পর কঠিন আঘাত নেমে এলো এবার। ১৩০৯ সালের ভাদ্র মাসে শান্তিনিকেতনের নিভৃত নীড় থেকে অসুস্থ মৃণালিনী দেবীকে ( ১৮৭৩ – ১৯০২) কলকাতায় আনা হলো। কিন্তু কলকাতায় এনেও শেষ রক্ষা হলো না। শেষ সময়ে বুঝতে পেরে কবিপত্নী জেদ ধরলেন ছোট জামাইকে চোখের দেখা দেখবেন। আমেরিকা থেকে দেশে ফিরে এলেন সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য। তখন কবির বয়স ৪১। শান্তিনিকেতনে স্কুল খোলার এগারো মাস বাদে ১৯০২ সালের ২৩ নভেম্বর চলে গেলেন মৃণালিনী। শোকাভিভূত রবীন্দ্রনাথ সেই যন্ত্রণার দিনলিপি ধরে রেখেছেন স্মরণ কাব্যের কয়টি কবিতায়, সরাসরি। উৎসর্গ কাব্যের সমসাময়িক কয়েকটি কবিতায়ও মৃণালিনী স্মৃতি তর্পিত :                                      অত চুপি চুপি কেন কথা কও
ওগো মরণ, হে মোর মরণ
অতি ধীরে এসে কেন চেয়ে রও,
ওগো একি প্রণয়েরই ধরন! (মরণ মিলন)

অন্তরের বিচলন তবু ধরা পড়লো না, কর্মব্যস্ত জীবনে। সংসারের সব আরব্ধ কাজে সমান মনোযোগী তিনি। সবার প্রতি কর্তব্য পালন আছে। রয়েছে সন্তান পালনের দায়বোধ। এবার মেজ মেয়ে রানীর (রেণুকা) যক্ষ্মা ধরা পড়ল। ডাক্তারের নির্দেশে হাওয়াবদলের লক্ষ্যে রানীকে নিয়ে প্রথম গেলেন হাজারীবাগ। কোনো উন্নতির লক্ষণ নেই। কনিষ্ঠ তনয়া মীরা (অতসী রানী) এবং শিশুপুত্র শমীন্দ্রনাথকে জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর কাছে আগেই পাঠিয়েছিলেন। রথীন্দ্রনাথ ছিলেন বোর্ডিংএ। এবার গিরিডি হয়ে আলমোড়ায় চললেন। চলছে ‘নৌকাডুবি’ লেখা। আলমোড়ায় বসে ‘শিশু’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ৩০ টি নতুন কবিতা লিখে ফেললেন। রানীর শরীর কিন্তু সারল না। রানীর জেদাজিদিতে ফিরে এলেন কলকাতায়। আত্মীয় সমাগমে বিদায় নিল রেণুকা (১৮৯০-১৯০৪)। নিঃসন্তান রানীর স্বামী ছিলেন ডাক্তার। সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য। তাকে কবি হোমিওপ্যাথিতে উচ্চতর ডিগ্রি লাভের লক্ষ্যে আমেরিকা পাঠান। মাত্র ১০ মাসের মধ্যে স্ত্রী ও প্রাণপ্রতিমা এক কন্যাকে হারিয়ে আকুল হলেন রবীন্দ্রনাথ। তবু স্থিতপ্রজ্ঞ মানুষটির প্রাত্যহিক সামাজিকতায় চ্যুতি ঘটল না একটুও।

এবার মহর্ষির বিদায়ের পালা। দেবেন্দ্রনাথ (১৫.৫.১৮১৭ — ১৯.০১.১৯০৫) এর আগে অবশ্য আরেক প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। তিনি শান্তিনিকেতনের দুর্লভ শিক্ষক সতীশ চন্দ্র রায়। তাঁর মধ্যে কবি নিজের আদর্শের প্রতিরূপ খুঁজে পেতেন। পিতা ঠাকুরের প্রয়াণের পর বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ সপুত্র শান্তিনিকেতনে বসবাস করতে চলে এলেন। কবি নতুন বাড়ির পূর্ব দিকে একটি বাড়ি বানালেন। নতুন বাড়িতে মীরা ও শমীন্দ্রনাথ থাকতেন। ১৯০৭ নাগাদ সর্ব কনিষ্ঠ কন্যা মীরার বিয়ে হল নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এর সাথে। বিয়ের পর জামাইকে আমেরিকার ইলিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দিলেন। এবার রথীন্দ্রনাথ ও জামাই দুজনের বিদেশে পড়ার খরচ সহ আশ্রম চালানোর জন্য চরম অর্থকষ্টে পড়লেন কবি। স্ত্রীর গহনা বিক্রি হয়ে গেল। হাতছাড়া হলো পুরীতে নির্মিত সাধের বাড়ি। পুজোর ছুটিতে মুঙ্গেরে বেড়াতে গিয়েছিল শমীন্দ্রনাথ। খবর এলো সে কলেরায় আক্রান্ত। কবি ছুটলেন সেখানে। শেষ রক্ষা হল না। চলে গেল শমীন্দ্রনাথ (১২.১২.১৪৮৯৬ — ২৪.১১. ১৯০৭)। তার মায়ের মৃত্যুর ৫ বছর পর বিদায় নিলো পৃথিবী ছেড়ে।

দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে কবি ফিরছেন কলকাতায়। রেলের মধ্যে বসে জানালা দিয়ে জোৎস্না ভরা প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে নতুন উপলব্ধিতে ভরে গেল অন্তর। কবি লিখেছেন, শমী যে রাত্রে চলে গেল তারপরের রাত্রে রেলে আসতে আসতে দেখলুম জোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্ছে, কোথাও কিছু কম পড়ছে তার লক্ষণ নেই। মন বললো, পড়েনি — সমস্ত মধ্যে সবাই রয়ে গেছে। আমিও তার মধ্যে। সমস্তের জন্য আমার কাজও বাকি রইল।’ লিখলেন সেই অসামান্য গান – ‘একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ!’ বড় আদরের ছোট ছেলে! দারুন ছিল গানের গলা। গানের খাতা ছিল তাঁর। নাম – “বন্দেমাতরম”। বাবার কাছে শুতে চাইত কোল ঘেঁষে। শমীর চলে যাওয়ার সময় ধ্যানস্থ ছিলেন কবি। নীরবে মেনে নিয়েছেন অনিবার্য যাওয়া। বন্ধু জগদীশচন্দ্রকে চিঠিতে লিখেছেন – ‘আমাদের চারিদিকে এত দুঃখ, এত অভাব, এত অপমান পড়িয়া আছে যে, নিজের শোক লইয়া অভিভূত হইয়া এবং নিজেকেই বিশেষ রূপ দুর্ভাগ্য কল্পনা করিয়া করিয়া থাকিতে আমার লজ্জা বোধ হয়।’

রাজনীতি তখন উথালপাথাল। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন, বিদেশ ভ্রমণ, নোবেল প্রাপ্তি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অশনি সংকেত। বিশ্ব সারস্বত সমাজে রবীন্দ্রনাথ তখন প্রাচ্যের মুখ। এমন সময় একদিন বড় মেয়ে বেলা (মাধুরীলতা) মৃত্যু মুখে পতিত হলো (২৫.১০.১৮৮৬ –১৬.০৫.১৯১৮)। কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর ছেলে শরৎকুমার এর সঙ্গে ১৯০১ এর ১১ জুন বিয়ে দেন। মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো ছিলনা। তারা, বিশেষত বেলা, সন্দেহ করত, বাবা তাকে নয়, অন্য বোনেদের বেশি ভালোবাসে, পক্ষপাতিত্ব করে।

এরপর কবির জীবদ্দশায় যাদের জীবনাবসানে কবি অচঞ্চল মনে কলমকে চঞ্চলিত করেছেন, তাঁরা হলেন, মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১.৬.১৮৪২ — ৯.১. ১৯২৩), সুকুমার রায় (৩০.১০. ১৮৮৭ — ১০.৯.১৯২৩), জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (৪.৫.১৮৪৯ — ৪.৩. ১৯২৫), বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১১.৩.১৮৪০ — ২৬.১.১৯২৬), কনিষ্ঠ কন্যা মীরার একমাত্র পুত্র (মৃত্যু ৭.৮.১৯৩২) নীতীন্দ্রনাথ গাঙ্গুলী ( ২০ বছর বয়সে জার্মানিতে থাকার সময়ে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন), কবির সকল গানের ভান্ডারি দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৬.১২.১৮৮২– ২১.৭.১৯৩৫), গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (মৃত্যু ১৯.৮.১৯৩৮), একনিষ্ঠ ভক্ত ও সঙ্গী সি. এফ. এন্ড্রুজ (৫.৪.১৯৪০) এবং সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর (৬.৫.১৯৪০)। সমমনাদের মধ্যে বিদায় নিচ্ছেন জগদানন্দ রায় (২৫.৬. ১৯৩৩), শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (জানুয়ারি ১৯৩৮) এবং দীর্ঘদিনের সাথী কালিমোহন ঘোষ (১২.৫.১৯৪০)।

দীর্ঘ আট মাস কবি অসুস্থ ছিলেন। প্রায় শয্যাশায়ী। ১৯৪১ এর ২৫ জুলাই জোড়াসাঁকোর বাড়িতে নিয়ে আসা হল। ৩০ তারিখে হলো অপারেশন। কিন্তু কাজ হলো না। রাখি পূর্ণিমার দিন ভরা বর্ষায় (৭.৮.১৯৪১) মহাপ্রয়াণ ঘটল কবির। শেষ হলো এক ‘হর্ষ বেদনায়’ মন্দ্রিত পথিকের মহাপথ পরিক্রমা।
একদিন যিনি অমোঘ মন্ত্রে মন্দ্রিত করেছেন – মৃত্যুঞ্জয়ী প্রত্যয়ে –
মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল মাঝে
আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে, ভ্রমি বিস্ময়ে।

মহাত্মা গান্ধী কবিগুরুর প্রয়াণে যে শোকবার্তা প্রেরণ করেন, তা তাঁর উত্তর প্রজন্মের কাছে আজও সমান প্রাসঙ্গিক: “In Shantiniketan and Sriniketan, he has left a legacy to the whole nation, indeed to the world. May the noble soul rest in peace and may those in charge at Shantiniketan prove worthy of the responsibility resting on their shoulders.