ক্রান্তিকালের মনীষা-১৮ ।। রামচন্দ্র বিদ্যবাগীশ।। বিনোদ মন্ডল

283
ক্রান্তিকালের মনীষা-১৮ ।। রামচন্দ্র বিদ্যবাগীশ।। বিনোদ মন্ডল 1

ক্রান্তিকালের মনীষা-১৮ ।। রামচন্দ্র বিদ্যবাগীশ।। বিনোদ মন্ডল 2রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ: সরকারি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রথম দাবিদার
বিনোদ মন্ডল

আজ থেকে প্রায় ২০০বছর আগে সরকারি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় কাজকর্ম করার প্রথম দাবি যে মানুষটি করেছিলেন তিনি হলেন, রামচন্দ্র বিদ্যবাগীশ। তখন আদালতের যাবতীয় কাজ কর্মে ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি ফারসির আধিপত্য। বাংলা দেশে বাংলা ভাষার অবস্থা দুয়ো রানীর মতই। আদালতে ফারসি নয় বাংলা চাই, যে কোন বক্তৃতার ফাঁকে সে যে বিষয়ে হোক না কেন, ধান ভানতে শিবের গীতের মত এই দাবী তিনি জুড়ে দিতেন জনমত তৈরির লক্ষ্যে। শুধু তাই নয়, ভাষার স্বাধিকার ও সদ্ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি কঠোর ছিলেন। বানান ভুল নিয়ে মশকরা তিনি সহ্য করতে পারতেন না। শোনা যায়, তত্ত্ববোধিনী সভার এই নামকরণ রামচন্দ্রকৃত। স্বাধীনতার এত বছর পরেও এই বঙ্গীয় প্রদেশে কত সরকারই এল আর গেল কিন্তু এখনও সরকারি ক্ষেত্রে বাংলার সেই মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা গেল কই?

ক্রান্তিকালের মনীষা-১৮ ।। রামচন্দ্র বিদ্যবাগীশ।। বিনোদ মন্ডল 3

শতকের পর শতক জুড়ে অযোধ্যার রামচন্দ্রকে নিয়ে সারস্বত সমাজ সভা সমিতি, আলাপ-আলোচনা, তর্ক বিতর্ক, বিবাদ বিসম্বাদে মজে রয়েছেন। দাঙ্গা, রক্ত, ধর্মবিদ্বেষ এর ফলে ব্যাপক দূষণ ছড়িয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশে। চলতি বছরেও রাম মন্দির প্রতিষ্ঠা নিয়ে বিদ্যাবাগীশদের বাগাড়ম্বর সরকারি বদান্যতায় সফল হতে দেখা গেল আক্ষেপের বিষয়, এক রামচন্দ্রকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে গিয়ে ইতিহাসের জীর্ণ সৌধের তলায় অবহেলার পলেস্তারা চাপা পড়ে শুয়ে আছেন অন্য এক রামচন্দ্র। রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ তিনি (১৭৮৬—১৮৪৫)।

আমরা নবজাগরণের চর্চা করতে গিয়ে যত সহজে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখের ভূমিকা উচ্চারণ করে দায়িত্ব পালন করি, বিষয়টা অত সরল ও তরল নয় কিন্তু। তাঁদের কেন্দ্র করে বহু রত্ন উপগ্রহের মত পরিক্রমা করেছেন, পান্ডিত্য ও ব্যক্তিত্বের আলো ছড়িয়েছেন। এমনই একজন রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ। কলকাতায় কর্মজীবন কাটলেও তাঁর জন্ম নদীয়া জেলার পালপাড়ায়। পিতা ছিলেন লক্ষ্মীনারায়ণ তর্কভূষণ। অগ্রজ হরিহরানন্দ তীর্থস্বামী সেকালের স্বনামখ্যাত পন্ডিত ও রামমোহনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। সেই সুবাদে মানুষটা রামমোহনের সান্নিধ্যে আসেন।

রামচন্দ্রের বাংলা ভাষা ও শব্দ ভান্ডার নিয়ে এক অদ্ভুত আকর্ষণ আজন্মের। রামমোহন তাঁকে সামাজিক ভাবনায় প্রাণিত ও জারিত করেন। তাঁর বেদান্ত কলেজের নথিপত্র থেকে দেখা যাচ্ছে, কিছুদিন সেখানে অধ্যাপনাও করেছেন রামচন্দ্র। সেই সুবাদে তাঁর নানা কাজে সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। আত্মীয় সভার অধিবেশনগুলোতে প্রায়শই তিনি একত্ববাদ নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য পেশ করতেন। জাত-ধর্ম-বর্ণ নিয়ে বিবর্ণ ভারতীয় সমাজকে অশিক্ষা শোষণ ও দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করতে একেশ্বরবাদ ছিল তাঁর কাছে হাতিয়ার।

১৮২৮ সাল। প্রতিষ্ঠিত হল ব্রাহ্মসমাজ। রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ তার প্রথম সচিব নিযুক্ত হন। দীর্ঘদিন দক্ষতার সঙ্গে ব্রাহ্মসমাজের সাংগঠনিক হাল ধরেছিলেন তিনি। ১৮২৯- এ রামমোহন বিলেতে গেলেন। তারপরের দশকে ব্রাহ্মসমাজকে কার্যত এক হাতে ঐক্যবদ্ধ রাখতে ও পল্লবিত করতে সদর্থক ভূমিকা ছিল রামচন্দ্রের। অধিবেশন ও সভাগুলোতে তখন শিক্ষিত নব্য যুবকের দল ভিড় করতো তাঁর বক্তৃতা ও পন্ডিত বিষ্ণু চক্রবর্তীর সংগীতের অমোঘ আকর্ষণে। অনেক গবেষক বলেন ১৮৩০ নাগাদ রামমোহনের সঙ্গে রামচন্দ্রের একবার তীব্র বাদানুবাদ হয় এবং রামমোহনের বিপক্ষ গোষ্ঠীতে যোগ দেন রামচন্দ্র। আর রামমোহন অনুগামী থাকেন না।

ইতিহাস বলছে ১৮২৭ সালের ১৪ মে রামচন্দ্র সরকারি সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপক নিযুক্ত হন। কিন্তু ১৮৩৭ সালে কেন তিনি হঠাৎ পদচ্যুত হন তা নিয়ে নানা তর্ক আছে। অথচ এই মানুষটাই আবার ১৮৪২ এ সংস্কৃত কলেজে সহকারি সম্পাদক পদে নিয়োজিত হয়েছেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে তাঁর অনন্য ভূমিকা স্মরণে রাখতেই হবে। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাসাগরের আবির্ভাবের (১৮২০) দুই বছর আগে তিনি বাংলা ভাষার প্রথম অভিধান সংকলন করেন। তাঁর রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থগুলি হল ~

১/ বঙ্গ ভাষাভিধান
২/ জ্যোতিষ সংগ্রহসার
৩/ বাচস্পতি মিশ্রের বিভাব চিন্তামণিঃ
৪/ শিশু সেবধি
৫/ বর্ণমালা
৬/ নীতি দর্শন
৭/ পরমেশ্বরের উপাসনা বিষয়ে প্রথম ব্যাখ্যান

সমাজ সংস্কার প্রসঙ্গে তাঁর পদক্ষেপ ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তখনও বিদ্যাসাগর শৈশবে। হিন্দু বিধবা বিবাহ সমর্থন এবং বহুবিবাহ রদ নিয়ে সোচ্চার ছিলেন তিনি। সেকালে জনমত সংগ্রহের লক্ষ্যে তিনি অবিভক্ত বঙ্গ দেশের বিভিন্ন স্থানে যে বক্তৃতাগুলি করেছেন, তাকে নীতিদর্শন বক্তৃতামালা নামে অভিহিত করা হয়। যে প্রস্তুত ভূমিতে বিদ্যাসাগরের লড়াই কার্যকর হয়েছে। এই মত প্রচারের জন্যই তিনি কিছুটা নারাজ হওয়া সত্ত্বেও সরকারি প্রতিষ্ঠানে ৬ মাস প্রধান পন্ডিতের আসন অলংকৃত করেছেন। তাঁর সমাজ সংস্কারমূলক কাজে ডেভিড হেয়ার ও প্রসন্নকুমার ঠাকুরের সমর্থন যথেষ্ট সহায়ক হয়েছে।

ব্রাহ্মসমাজ অন্ত প্রাণ মানুষটি মৃত্যুশয্যায় জীবনের সঞ্চিত পাথেয় ৫০০০ টাকা ব্রাহ্ম সমাজের তহবিলে দান করে যান। দ্বারকানাথের সন্তান ও রবীন্দ্রনাথের জনক দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মসমাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন দীর্ঘদিন। তাঁর যখন বয়স মাত্র ২৭ বছর তখন তাঁকে সহ আরও ২১ জন যুবককে ব্রাহ্মসমাজে দীক্ষা প্রদান করেন রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ। ক্ষয়িষ্ণু জমিদার দেবেন্দ্রনাথের দীক্ষাগুরু হিসেবে শুধু নয়, রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ কে ইতিহাস মনে রাখুক পন্ডিত, সমাজবেত্তা ও ভাষাপ্রেমী হিসেবে, নতুন প্রজন্মের কাছে এই প্রত্যাশা।