ক্রান্তিকালের মনীষা-৩০, অচিন পাখি লালন ফকির, বিনোদ মন্ডল

254
ক্রান্তিকালের মনীষা-৩০, অচিন পাখি লালন ফকির, বিনোদ মন্ডল 1

অচিন পাখি                                                                লালন ফকির  ক্রান্তিকালের মনীষা-৩০, অচিন পাখি লালন ফকির, বিনোদ মন্ডল 2                                                                   বিনোদ মন্ডল

ক্রান্তিকালের মনীষা-৩০, অচিন পাখি লালন ফকির, বিনোদ মন্ডল 3

দীর্ঘ পরমায়ু জুড়ে চন্দ্রাতপ হয়ে উনিশ শতকের বাংলায় লোকসাধারণের মনোরঞ্জন করেছেন। জীবনের পরতে পরতে যোগ করেছেন অসাম্প্রদায়িক রোশনাই। মানুষকে ডেকে ডেকে জীবন সাগর সেঁচে তোলা আপন অভিজ্ঞতার ঝিনুক ভাঙা মুক্তো বিলি করেছেন গানে গানে। প্রাণে প্রাণে মিলিয়ে দিয়েছেন ধর্ম বর্ণ সম্প্রদায় দীর্ণ অমৃতস্য পুত্র মানুষকে। তিনি বাউল গানের অগ্রদূত — মহাত্মা লালন সাঁই (১৭ অক্টোবর ১৭৭৪ — ১৭ অক্টোবর ১৮৯০)।

ক্রান্তিকালের মনীষা-৩০, অচিন পাখি লালন ফকির, বিনোদ মন্ডল 4

রবীন্দ্রনাথের গোরা উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদ স্মরণ করি। সেখানে উপন্যাসের শুরুতেই অবকাশ যাপনের সময়, বিনয় কলকাতার পথ ঘাট ও তার মানুষের রোজনামচা লক্ষ করছিল। এক বাউল একতারা বাজিয়ে একটি গান পরিবেশন করছে, যা ছুঁয়ে গেল বিনয়ের মন — ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়, তারে ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতাম পাখির পায়।’ পাঠক স্মরণ করুন, এরপরেই দুর্ঘটনাবশত সুচরিতা বিনয়ের বাড়িতে পদার্পণ করবে। এই গান লালনের। এই গান বাংলার মাটির। বাংলার জীবন রসের। এই গান শুধু রবীন্দ্রনাথকে প্রভাবিত করে নি। আজীবন তাড়া করেছে। তাই তিনি অফুরন্ত কর্ম ব্যস্ততা নিয়েও লালন সাঁইয়ের গানে অবগাহন করেছেন। এমনকি ‘প্রবাসী’ পত্রিকার ‘হারামণি’ বিভাগে ২০টি লালন গীতি সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছেন। বহু রবীন্দ্রসংগীতে লালন ফকিরের মানবতাবাদী দর্শনের প্রক্ষেপণ রয়েছে। ‘আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে’ গানটি কবি যেন লালন সাঁইয়ের উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছেন, মনে হয়।

১১৬ বছরের সুদীর্ঘ জীবনে বাউল গান নিয়ে বহুল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। বাংলায় প্রায় দুই হাজার গান তাঁর নামে প্রচারিত রয়েছে গবেষকগণের অভিমত। তবে মাত্র ২৮৮ টি গান নাকি আদতে লালন পালিত। বাকি তাঁর আখড়া, তাঁর শিষ্য পরম্পরা সঞ্চিত সম্পদ। এরমধ্যে হাজার খানেক গানকে লালনের জীবন দর্শনের সাথে সমঞ্জস মনে হয়। যেহেতু তিনি নিরক্ষর ছিলেন, শিষ্যগণ বিভিন্ন সময়ে নানা স্থানে লিপিবদ্ধ করেছেন, ফলে এখনো গণিতের হিসেব মেলানোর সময় আসেনি।

বিচিত্র দার্শনিক প্রজ্ঞা মুখরিত গানগুলি আমাদের দ্বন্দ্বদীর্ণ তুচ্ছাতিতুচ্ছ পার্থিব জীবন সম্পর্কে বিরাগী করে দেয়। এক নৈসর্গিক রভসে ভরে দেয় অন্তর্লোক। কী নেই সেখানে? আছে আত্মতত্ত্ব। আমি কে? কোথা থেকে এসেছি। কোথায় যাব? আছে দেহতত্ত্ব। এই অনিত্য শরীর, রূপজ বাসনা, কামাতুর আগ্রাসন, হিংসার শেষ কোথায়? আছে গুরু বা মুর্শিদ তত্ত্ব। জীবনে গুরুর প্রয়োজন কতখানি তা নিয়ে দিকনির্দেশ। যা বাংলাদেশের অপর এক অনুজ বাউল শাহ আব্দুল করিমের বহু গানে প্রতিধ্বনিত। আছে প্রেমভক্তি তত্ত্ব। যা প্রেম তাই ভক্তি। সে প্রেম মানবপ্রেম। সে প্রেম ব্যক্তি প্রেম। সে প্রেম অতীন্দ্রিয় প্রেম। সে প্রেম বহুমাত্রিক। আছে গুরু সাধন তত্ত্ব। এইসব গানে আবার রূপক ও প্রতীক ধর্মিতার রাহসিক অবস্থান পরিলক্ষিত। এছাড়াও মানুষ পরমতত্ত্ব, আল্লাহ নবীতত্ত্ব, কৃষ্ণ গৌর তত্ত্বকে উপজীব্য করে গান যোজনা করেছেন।

বিবিসি বাংলার সমীক্ষায় সর্বকালের সেরা ২০টি লোকবন্দিত বাংলা গানের তালিকায় ১৪তম স্থানটি দখল করেছে লালন শাহের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গানটি। তাঁর যেসব গান দুই বাংলার গ্রাম প্রদেশে দৈনন্দিন চর্চায় বেঁচে আছে – তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য কয়েকটি উল্লেখ করা যায়। ১) সব লোকে কয় লালন কি জাত ২) বাড়ির কাছে আরশিনগর ৩) মিলন হবে কত দিনে ৪) কে বানাইলো এমন রংমহল খানা ৫) আমি অপার হয়ে বসে আছি ৬) কথা কয়, কাছে দেখা যায় না; ইত্যাদি। লালন গানএ পরিপূর্ণ এই পাঁচটি শতকে হাজার হাজার সাধক, শিল্পী তাঁর গানকে কন্ঠে নিয়ে জীবন পূর্ণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে সকলকে ছাড়িয়ে গেছেন বাংলাদেশের ফরিদা পারভীন। তিনি লালনগীতির বিশ্ববন্দিত শিল্পী। এই প্রসঙ্গে মহম্মদ মনসুরউদ্দীন এর নাম উল্লেখ্য। তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে ৩০০ মত লালন গীতি সংগ্রহ করেছেন। যার মধ্য দিয়ে তাঁর দর্শন প্রতিবিম্বিত হয়। পাশাপাশি এক চিলতে রোদ্দুরের মত আভাসিত হয় ব্যক্তি লালনও।

নিজের সম্পর্কে নীরব ছিলেন সাঁই। নানা সময়ে নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেছে কৌতুহলী মানুষজন। শিষ্যরা আগ্রহ নিয়ে মহাজীবন পাঠ করতে চেয়েছেন গুরু মুখে। তিনি বিশেষ কিছু বলেননি। সবচেয়ে বিশ্বস্ত সূত্র অনুযায়ী জানা যায়, লালন ফকির ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুন্ডু উপজেলার হরিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মতান্তরে, যশোর জেলার ফুলবাড়ী গ্রামে জন্ম তাঁর। তীর্থ ভ্রমণে শামিল হয়ে গুটিবসন্তে আক্রান্ত হন। অগত্যা মহামারীর হাত থেকে বাঁচতে সাথীরা কলার ভেলায় তাঁকে ভাসিয়ে দেয় কালিগঙ্গা নদীতে। মলয় শাহ ও তার স্ত্রী মতিজান বাড়িতে আশ্রয় দেন। বাঁচিয়ে তোলেন। অসুখের ফলে একটি চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয় চিরতরে। সিরাজ সাঁইয়ের সাথে সাক্ষাতের পর জীবনের গতিপথ পরিবর্তিত হয়। ইতিমধ্যে পূর্বাশ্রমে মা ও স্ত্রীর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। গোঁড়া হিন্দু সমাজ জাত খাওয়ানো বিধর্মী লালনকে সমাজে ঠাঁই দেয় নি।

কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়াতে আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন লালন সাঁই। সেখানে সস্ত্রীক (বিশাখা), সশিষ্য বসবাস শুরু করেন। কিংবদন্তি, গল্পকথায় তিনি বেঁচে আছেন। বেঁচে আছেন সাহিত্যের নানা অলিন্দে। ঢাকা শহরের সদর প্রকাশনী থেকে সাইমন জাকারিয়া প্রকাশিত নাটক ‘উত্তর লালন চরিত’ বিরাট সাড়া ফেলেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটমন্ডলে এ নাটক অভিনয়ে অংশ নিয়েছেন জাকারিয়া সহ এক ঝাঁক বাউল শিল্পী। তাঁর জীবন নিয়ে উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হল — সেনবাউল রাজারাম (রণজিত কুমার), বাউল রাজার প্রেম (পরেশ ভট্টাচার্য) এবং মনের মানুষ (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)। এর মধ্যে সবচেয়ে সাহসী কল্পনায় সুনীলের লালন পরিকল্পিত। এখানে তিনি হিন্দু কায়স্থ। নাম লালন চন্দ্র কর।এছাড়াও তাঁর জীবন নিয়ে দুটি পাঠক সমাদৃত ছোটগল্প রচিত হয়েছে। সুনির্মল বসুর লালন ফকিরের ভিটে (১৯৩৬) এবং শৎকত ওসমানের দুই মুসাফির (১৯৬৪)।

তাঁর জীবনী মুখরিত তথ্যচিত্র দুটি বাংলাদেশে নির্মিত। দেখে কয়জনা (১৯৮৮), পরিচালক মহম্মদ হামিম। অচিন পাখি (১৯৯৬) – পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল। তানভীর পরে লালন নামে (২০০৪) একটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এছাড়াও সৈয়দ হাসান ইমাম পরিচালিত লালন ফকির (১৯৭২), শক্তি চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত লালন ফকির (১৯৮৬), হাসিবুর রেজা কল্লোল পরিচালিত অন্ধ নিরাঙ্গম (২০১১), এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অনুসারে গৌতম ঘোষ পরিচালিত মনের মানুষ (২০১০) নির্মিত হয়েছে। শেষোক্ত ছবিটি নানা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে লালন- চর্চাকে নতুনভাবে পল্লবিত করেছে।

বিস্ময়ের বিষয় হল, অশ্বারোহণে পারদর্শী মানুষটি নানা আখড়ায়, মজলিসে,জমিয়েছেন কিন্তু তাঁর কোন ছবি কেউ তেমন আঁকেননি। পদ্মাবক্ষের বোটে বসে ১৮৮৯ সালে বয়সের ভারে ন্যুব্জ লালনকে ফ্রেমবন্দি করেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেটাই এখনও পর্যন্ত লভ্য একমাত্র পূর্ণ প্রতিকৃতি। তিনি বেঁচে আছেন গানের বাণীতে। নিন্দায় কুকথায়। সমালোচিত হয়েছেন নাস্তিক বলে। অভিযোগ উঠেছে আখড়ায় সাধনসঙ্গিনী বা সেবাদাসী প্রথা চালু করেছেন। ভিন্নধর্মে বিবাহ, বিবাহ বহির্ভূত যৌনাচার চালু করেছেন। আখড়ায় দেদার মাদক সেবন প্রচলন করেছেন। কিন্তু আধুনিক বিশ্ব মধুচক্র, লিভ টুগেদার বা পার্লার কালচার কিংবা কোকেন গাঁজার গণ প্রসারণ ঘটিয়ে সেই সব অভিযোগকে সারবত্তাহীন করে তুলেছে। আজও কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে হাজার হাজার অসাম্প্রদায়িক মানুষ প্রতি শীতকালে ভান্ডারায় মিলিত হন। পংক্তি ভোজন করেন। বাউল সম্মেলনে মুখরিত হয় কুমারখালীর আকাশ। বাংলাদেশের মাটি।

Previous articleবাতিল হল কো-উইন অ্যাপ, এবারে নাম নথিভুক্তকরণ হবে অন্য উপায়ে, জেনে নিন কীভাবে করবেন
Next articleঘরের লড়াই এবার রাজনৈতিক ক্ষেত্রে,বেহালা বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমুলের সম্ভাব্য প্রার্থী রত্না চট্টোপাধ্যায়