ডাকাত লকডাউনকে হারিয়েই বিদেশ ভ্রমন সেরে মাকে নিয়ে খড়গপুর ছুঁয়ে ঘরের পথে মহীশুরের বীরপুরুষ

2208
ডাকাত লকডাউনকে হারিয়েই বিদেশ ভ্রমন সেরে মাকে নিয়ে খড়গপুর ছুঁয়ে ঘরের পথে মহীশুরের বীরপুরুষ 1

নরেশ জানা: মনে কর,যেন বিদেশ ঘুরে মা কে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে। তুমি যাচ্ছ পালকিতে, মা চড়ে….না, পালকি নয়, স্কুটার। রবীন্দ্রনাথের বীরপুরুষ কবিতার সেই খোকার রাঙা ঘোড়ার মতই এই স্কুটারকে ঘোড়া বলা যেতেই পারে কারন রানা প্রতাপের ঘোড়ার নাম তো চেতক ই ছিল। আর এই স্কুটারের নামও চেতক। ২০ বছর আগে বাবার কাছ থেকে উপহার পেয়েছিল এই যুবক। আর সেই বাজাজ চেতক স্কুটারে করেই মা কে নিয়ে বিদেশ ঘুরে বাড়ি ফেরার পথে কর্নাটকের মহীশুর বা মাইশোরের ৪২ বছরের যুবক ডি. কৃষ্ণকুমার । মা শ্রীমতী চূড়ারত্না, বয়স ৭০।

শুক্রবার, রাত সাড়ে আটটা। খড়গপুর বিদ্যাসাগর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক পেরিয়ে কৃষ্ণকুমারের চেতক তাঁর মাকে নিয়ে যখন খড়গপুর কলেজের কাছে এসে থামল তখন সাড়ে আটটাই বাজে। আজকের জার্নি এখানেই শেষ। শুরুটা হয়েছিল সকাল ৭ টায়,মুর্শিদাবাদের ফারাক্কা থেকে। ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে বর্ধমান হয়ে দামোদর আর দারকেশ্বর পেরিয়ে হুগলির বেঙ্গাই হয়ে রামজীবনপুরে পশ্চিম মেদিনীপুরের সীমানা। তারপর চন্দ্রকোনা কেশপুর হয়ে ধর্মার মোড় পেরিয়ে খড়গপুর কলেজ, পাক্কা ৪০৫ কিলোমিটার রাস্তা ১৩ঘন্টায় অতিক্রম করার স্বর্গীয় সেই হাসিটা নিয়েই স্কুটার পার্ক করলেন কলেজের উলটো দিকে। হেলমেট খুলে ফেললেন কৃষ্ণকুমার, ভাঙা হিন্দী আর ইংরেজিতেই শুরু হল মা কে নিয়ে বিদেশ ভ্রমনের গল্প। পাশে দাঁড়িয়ে শুনছেন মা ও। ডাকাত লকডাউনকে হারিয়েই বিদেশ ভ্রমন সেরে মাকে নিয়ে খড়গপুর ছুঁয়ে ঘরের পথে মহীশুরের বীরপুরুষ 2

ডাকাত লকডাউনকে হারিয়েই বিদেশ ভ্রমন সেরে মাকে নিয়ে খড়গপুর ছুঁয়ে ঘরের পথে মহীশুরের বীরপুরুষ 3

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে মারা যান কৃষ্ণকুমারের বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আধিকারিক দক্ষিনামূর্তি। কৃষ্ণকুমার তখন একটি বেসরকারি কর্পোরেট ব্যাঙ্কের ফিনান্সিয়াল টিম লিডার। বিয়ে করেননি। মা আর ছেলের একার সংসার। হঠাৎই একদিন খেয়াল করলেন, মা আগের মত ছন্দে নেই! চাকরির ব্যস্ততায় নজরেই পড়েনি যে, বাবার মৃত্যু শোক তিনবছর পরেও কাটিয়ে উঠতে পারেননি মা। মায়ের সঙ্গে কথা বলে তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন ছেলে। সংসারের জোয়ালে গাঁথা হয়ে বাইরের দুনিয়াটা দেখা হয়নি যে মায়ের। তাই মা কে নিয়ে দেশ ভ্রমনে বেরুবেন তিনি।
মা খুশি হলেন। চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে ২০১৮ সালের ১৬ই জানুয়ারি নিজের বাজাজ চেতক স্কুটার নিয়ে যাত্রা শুরু। কিন্তু স্কুটারে কেন? কৃষ্ণকুমার জানালেন, “পাবলিক ট্রান্সপোর্টে মা’র কষ্ট হবে। তাই বাবার দেওয়া ২০ বছরের পুরনো স্কুটারে মা’কে বসিয়ে রওনা দিলাম।” সেই শুরু। স্কুটারে চড়েই মাকে নিয়ে কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, কেরালা পণ্ডীচেরি, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, মহারাষ্ট্র, গোয়া, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ হয়ে সিকিম, আসাম, মেঘালয়, মণিপুর, মিজোরাম, ত্রিপুরা সহ দেশের সমস্ত রাজ্য ঘুড়ে নিয়েছেন। আর দেশের বাইরে নেপাল, ভূটান হয়ে মায়ানমার। কর্নাটক থেকে খড়গপুর অবধি ভ্রমন হয়ে গেছে ৫৪ হাজার ১০২ কিলোমিটার। কমবেশি ৮৪০ দিন, প্রায় ২ বছর ৪ মাস। দেশের সমস্ত বড় মহানগর,পর্যটন কেন্দ্র আর বেশিরভাগ তীর্থস্থান দেখিয়েছেন মাকে।

কৃষ্ণকুমার অবশ্য মনে করেন রামায়নের ঋষি শ্রবন কুমারের মত মায়ের সাথে বাবাকেও নিয়ে বেড়িয়েছেন তিনি। বাবার দেওয়া সেই স্কুটারের স্মৃতির মধ্যেই আছেন বাবা। কৃষ্ণকুমারের ভাষায়, “২০১৭, মার্চে আমরা তখন কাশ্মীরে। প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য দেখে কেঁদে উঠল মা। বাবার বাঁধানো ছবি যেটা সব সময় মায়ের সাথে থাকে সেটাই বের করে বলল, আজকে তোমার বাবা আমাদের সঙ্গে থাকলে কত ভাল হত। সেও আমাদের সাথে দেখতে পেত এই অপরূপ দৃশ্য।” আমি মাকে বললাম, কে বলল বাবা আমাদের সাথে নেই? এই তো বাবা আমাদের সাথে, আমার চেতকই আমার বাবা। সেই থেকেই মাও বিশ্বাস করেন, আমরা এক সাথেই রয়েছি।
ভুটান থেকে সাতদিন আগে দার্জিলিংয়ে প্রবেশ করে মা ও ছেলে পড়ে গেলেন লকডাউনে। দার্জিলিংয়েই দেখা হয়ে গেল সাংসদ রাজু বিস্তার সাথে। বললেন সমস্যার কথা। রাজু ফোনে কথা বলিয়ে দিলেন কর্ণাটকের মূখ্যমন্ত্রী বি এস ইয়াদুরাপ্পার সাথে। ইয়াদুরাপ্পাই বল্লেন, “পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে বোঝা মুশকিল, লকডাউন আরও দীর্ঘতর হতে পারে। এবার ঘরে ফের।” তারপর ফেরা শুরু। ফেরার পথে খড়গপুর।

লকডাউনের খড়গপুর। রাত সাড়ে আটটা মেটালের ঝকঝকে আলো কিন্ত খাঁ খাঁ করছে ব্যস্ততম বানিজ্য বহুল ও টি রোড। রাস্তায় বেতাজ বাদশা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সারমেয় কুল। অটোয়াল বিল্ডিং, বাজাজ শো রুম, রেড্ডি হোটেলের ঝাঁপ বন্ধ। পেট্রলপাম্পে গুটি কয় কর্মচারী। একটা চারচাকা গাড়ি এগিয়ে আসে। ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে দেয় খাবারের প্যাকেট। কৃষ্ণকুমার হাত জড়ো করে প্রত্যাখ্যান করেন। বলেন, “নো, থ্যাঙ্কস। উই উইল নট টেক ফুড ফ্রম আউট সাইট, উই মেক ইট আওয়ার সেলভস।” লক্ষ্য করলাম স্কুটারের মধ্যেই রান্না করার সরঞ্জাম, স্টোভ। মা রান্না করেন। কৃষ্ণকুমার বললেন, আমি ভাগ্যবান এখনও মায়ের হাতের রান্না খেয়ে যাচ্ছি। কৃষ্ণকুমারের ব্যখ্যা প্রতি পাঁচ কিলোমিটারে জল, পরিবেশ,খাবার বদলে যায়। আমরা তাই বাইরের খাবার আর জল খাইনা। তাই সুস্থ আছি। খাবার বাড়িয়ে দেওয়া মানুষটিকে বলেন, মাস্কটা গলায় ঝুলিয়ে রাখলে হবে? ওটা পরুন। আমরাও কথা বলছি তিনফুট দূরত্ব রেখেই।

অনেকেই মুগ্ধ, আপ্লুত হয়েছেন কৃষ্ণকুমার ও তাঁর মাকে। মাতৃভক্তির এই নজির বিহীন এই ঘটনা দেখে অবাক অনেকেই। দীর্ঘ প্রায় আড়াই বছরে তেমন কোন সমস্যা পড়তে হয়েছে? হাসি মুখে কৃষ্ণকুমার জবাব, ‘মা যেখানে সঙ্গে আছেন কিসের সমস্যা। কোন সমস্যা হয়নি’। যাত্রা পথে অনেকেই আর্থিক সাহায্য সহ নানা ধরণের সাহায্য করতে চেয়েছেন। কিন্তু কারোর কোন সাহায্য নিতে চাননি ডি কৃষ্ণকুমার। লকডাউনে কিছু কিছু সমস্যা হলেও কাটিয়ে উঠেছেন। বৃহস্পতিবারই ফারাক্কায় একটি জায়গায় রাত কাটাতে গিয়ে বাধা পেয়ে মন্দিরে রাত কাটিয়ে রওনা দিয়েছেন। খড়গপুর লোকাল থানার কাছেই একটা হলে রাত্রিবাস।

শনিবার সকাল ৭টার মধ্যে স্নান সারা, মায়ের রান্নাও। রান্নার সরঞ্জাম, বিছানা, জামা কাপড় গুছিয়ে ব্যাগে ভরে তৈরি যাত্রার জন্য। ৬০ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে ওড়িশা, অন্ধ্র হয়ে ঘরে ফেরা। ছেলেকে কী বলবেন?লাজুক হাসি নিয়ে চূড়ারত্না বললেন, “তপস্যা করে পেয়েছি ওকে। আমার ছেলে আমার ইচ্ছে পূরণ করেছে। আমি যোগ্য ছেলে পেয়েছি।” বিয়ে করেননি কেন? কৃষ্ণকুমারের দিকে তাকাই। শ্রবন কুমারের মতই ঋষিতুল্য দাড়ি। মায়ের কাঁধ ছুঁয়ে বললেন, “তাহলে যে মাকে নিয়ে বিদেশ ভ্রমন হতনা।”        কৃষ্ণকুমার বাংলার মাটি ছাড়ার আগে বাংলার মানুষকে তাঁর ভালবাসা জানিয়ে গেছেন।বলেছেন, “এই মাটি সেই মাটি যেখান থেকে বিবেকানন্দ ভারতকে সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছিলেন। আর বিবেকানন্দকে তৈরী করেছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংস ও হোলি মাদার শ্রী সারদা। এখানকার মানুষকে তাই আমার শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানাই। বাংলার আরও একটি মানুষ দেশকে
বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তিনি রবীন্দ্রনাথ। আমি যদি সুযোগ পাই তবে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখব।”

শনিবার বেলা ১২টা, ফোন করলাম কৃষ্ণকুমারকে, কী একটা জরুরি কথা জানার ছিল। কৃষ্ণকুমারের চাকা পাংচার হয়েছে। দাঁতনের কাছে সারাচ্ছেন। বেলা আড়াইটা নিজেই ফোন করলেন। বললেন আজ রাতের মধ্যে ভুবনেশ্বর ঢুকতে হবে। আর দিন চারেকের মধ্যেই বাড়ি। খড়গপুর থেকে কৃষ্ণকুমার আর তাঁর মা তখন বালেশ্বর পৌঁছে গেছে। লকডাউন হার মানতে পারেনি তাঁদের, উল্টে নিজেই হেরে বসে আছে।

Previous articleহাজারে হাজারে শ্রমিক ফিরছেন জঙ্গল মহলে, কাল ঘাম ছুটছে পুলিশের নাজেহাল স্বাস্থ্যকর্মীরা, জঙ্গলেই কোয়ারেন্টাইন
Next articleতিন মিনিটের ভিডিও কলে চাকরি গেল সাড়ে ৩ হাজার উবের কর্মীর