৬ ঘন্টা টালবাহানা করে যুবকের দেহ ফেরালো শিক্ষিত শহর, গ্রামের কোলেই দাহ, ছেলের মৃত্যুর ৮ দিন পরেও কাঁদা হয়নি বাবার

2223
Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা: বার বার বলা হচ্ছে মৃত করোনা আক্রান্তের সৎকারের পর সংক্রমনের কোনও সম্ভবনা নেই। তা ছাড়া ২৩বছরের যুবকের যে মৃতদেহটি মেদিনীপুর শহরের পদ্মাবতী শ্মশানের বৈদ্যুতিক চুল্লিতে দাহ করার জন্য সোমবার আনা হয়েছিল তাঁর করোনা হয়নি হয়েছিল নিমুনিয়া। সেই রোগের বিস্তারিত রিপোর্ট, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এবং করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট সবই নিয়ে এসেছিলেন মৃতের পরিবারের লোকেরা, টানা ৬টা শহুরে মেদিনীপুরকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন পুলিশ ও প্রশাসনের আধিকারিকরা কিন্ত শিক্ষিতের পাহাড় প্রমান মূর্খতাকে টলানো যায়নি। অধ্যাপক, শিক্ষক, চিকিৎসক আদি বাঘা বাঘা শিক্ষিতের শহর মেদিনীপুর পোড়াতে দেয়নি দেহ। শেষে দেহ ফেলে রেখেই গ্রামে ফিরে যায় পরিবার।

Advertisement

ঘটনা “একশ শতাংশ” উন্নয়ন হয়ে যাওয়ার দাবিদার পশ্চিমবাংলার একটি অখ্যাত গ্রামের। পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলা থানার নাড়াথা গ্রামের। উন্নয়নের দিশা দেখানো যে রাজ্যের লাখো লাখো যৌবনকে ট্রেনের কামরায় গাদাগাদি হয়ে ভিন রাজ্যে ছুটতে হয় কাজের জন্য পিংলাও তার ব্যতিক্রম নয়। নাড়াথা গ্রামের রাজু জানাকেও যেতে হয়েছিল মহারাষ্ট্রে। ২৩বছরের রাজু রপ্ত করেছিল তামার গহনা বানানোর কাজ। গত ২বছর ধরে সেই কাজই করছিল রাজু। কিন্তু লকডাউন সব তছনছ করে দিয়েছে, কারখানা বন্ধ। অবশেষে ঘরে ফেরার উদ্যোগ নেয় রাজু।

Advertisement
Advertisement

সমস্ত মেডিক্যাল টেস্ট করানোর পর ছাড়পত্রও মিলে যায় মহারাষ্ট্র সরকারের। ১৮ তারিখই রওনা হওয়ার কথা। সেই মত কথাও হয় বাবা গনেশ জানার সঙ্গে। ওই দিন সকাল ১০ টায় সে বাবাকে জানায় ফেরার গাড়ি ঠিক হয়ে গেছে। দুপুর ১২টায় খবর আসে রাজু খুবই অসুস্থ তাকে নার্সিং হোমে ভর্তি করা হয়েছে। নাক মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছে তার। ওইদিনই মৃত্যু হয় রাজুর। রাজুর পোষ্টমর্টেম হয়, আ্যকিউট নিমুনিয়া ও অন্যান্য উপসর্গ কিন্তু করোনা ফলাফল নেগেডিভ।

এরপর বিভিন্ন পদ্ধতি মেনে আ্যম্বুলেন্সে যোগাড় করে দেহ আসতে আসতে সোমবার। কিন্তু রাজুর গ্রামের আগের কয়েকটি স্থানের মানুষরা দাবি করেন, ভিন রাজ্যে অস্বাভাবিক মৃত্যু তায় দেহ আসছে এতদিন পরে তাই তারা তাদের গ্রামের রাস্তা দিয়ে মৃতদেহ নিয়ে যেতেই দেবেনা। নাড়াথা গ্রামের এক অধিবাসী জানান, ” যখন আমরা খবর পেলাম যে মূল সড়ক থেকে আমাদের গ্রামে যাওয়ার গ্রাম্য সড়কের মুখে রাজুর দেহ আটকানো হবে তখন আমরা সংঘাত এড়ানোর জন্য রাজুর দেহ মেদিনীপুর শহরে নিয়ে যাই কারন আমাদের ধারনা ছিল মেদিনীপুর শহর শিক্ষিতের শহর তাঁরা অন্তত নিমুনিয়া আর করোনার ফারাকটুকু বুঝবেন। পদ্মাবতী শ্মশানের কর্মীরাও জানিয়ে দিলেন যে তাঁদের মৃতদেহ পোড়ানোয় কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু শ্মশানের আশেপাশের বাসিন্দারা বাধা দিলেন, গাড়ি ঢুকতেই দিলেননা শ্মশানে। বিকাল ৪ টা থেকে রাত ১০টা অবধি মানুষকে বোঝাতে ব্যর্থ হয় প্রশাসন।”

এরপর শহরেই দেহ রেখে দিয়ে চলে আসে রাজুর পরিবার। মঙ্গলবার সকালে পিংলা পুলিশ, পুলিশের পদাধিকারী ও প্রশাসনের কর্তারা, মেডিক্যাল অফিসার এবার সমস্ত রিপোর্ট নিয়ে আলোচনায় বসে নাড়াথা গ্রাম ও সংলগ্ন রাস্তাটির পাশের স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে। আলোচনার পর গ্রামবাসীরা রাজী হয়ে যান মৃতদেহ দাহ করতে দিতে। সন্ধ্যায় রাজুর দাহ কার্য শুরু হয়েছে। রাজুর বাবা গনেশ জানিয়েছেন, ” গত ১৮ তারিখ ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়েছিলাম তখন কান্নার সুযোগ পাইনি কারন ছেলের দেহ ফিরিয়ে আনার চিন্তায় কান্না ভুলে গিয়েছিলাম। সোমবার হয়ত কাঁদতে পারতাম কিন্তু শহরের মনোভাব আর ছেলেকে দাহ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় সেও সম্ভব হয়নি। কিন্তু আমার কান্নাটা খুবই দরকার নাহলে হয়ত আমি মারা যাব। দেখা যাক আজ কাঁদতে পারি কিনা!”