কৈশোরে মাওবাদীরা কেড়ে নিয়েছিল বাবা-মাকে, গ্রামের কিশোরদের শান্তির মন্ত্র শেখায় প্রীতিলতা

424
কৈশোরে মাওবাদীরা কেড়ে নিয়েছিল বাবা-মাকে, গ্রামের কিশোরদের শান্তির মন্ত্র শেখায় প্রীতিলতা 1

পলাশ খাঁ, গোয়ালতোড় :- এ যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। পরাধীন ভারতের প্রীতিলতা ভারত মায়ের দুচোখের জল মোছাতে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন। আর স্বাধীন ভারতের জঙ্গলমহলের প্রীতিলতা, যে গ্রাম একদিন তার দু চোখের স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছিল পুলিশের চাকুরী পেয়ে প্রীতিলতা এখন সেই গ্রামের কচিকাঁচাদের দুচোখে নতুন করে বাচার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।

প্রীতিলতা দেবসিংহ। জঙ্গলমহল ভুক্ত পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার শালবনীর মধুপুরের বাসিন্দ। অশান্ত জঙ্গলমহলের মধুপুরের বাসিন্দারা গুলির আওয়াজে ঘুমাতেন আর গুলির আওয়াজেই ঘুম থেকে উঠতেন সেই জঙ্গল ঘেরা প্রত্যন্ত মধুপুর গ্রামেই বাবা মায়ের সঙ্গে হেসেখেলে কাটছিল। যে গ্রাম কে নিয়ে দুচোখ ভরা স্বপ্ন ছিল প্রীতিলতার সেই গ্রামেই একবার নয় দু দুবার তার স্বপ্ন কেড়ে নেয়৷ মাওবাদীরা কেড়ে নেয় বাবার প্রাণ তার পরের বছরেই সেই জঙ্গীরাই তার মা কে তুলে নিয়ে চলে যায় জঙ্গলে। যার সন্ধান এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। প্রীতিলতার বাবা স্বপন দেবসিংহ ছিলেন নিপাট ভদ্রলোক। চাষবাস করে ছেলে মেয়ে দের দুধেভাতে রাখাই ছিল মূল লক্ষ্য। আর মা অনিমা দেবসিংহ ছিলেন  এক সাদামাটা গৃহবধূ।

কৈশোরে মাওবাদীরা কেড়ে নিয়েছিল বাবা-মাকে, গ্রামের কিশোরদের শান্তির মন্ত্র শেখায় প্রীতিলতা 2

রাজ্যের পাল পরিবর্তনের কয়েক বছর আগেই বাম সরকারের শোষণ আর বঞ্চনার প্রতিবাদে পুরো জঙ্গলমহল জুড়ে মাওবাদী আন্দোলন শুরু হয়। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার শালবনী, গোয়ালতোড়ের বেশ কিছু জায়গা হয়ে উঠে মাওবাদীদের আঁতুড়ঘর। তার মধ্যে মধুপুর ছিল অন্যতম। মধুপুর কে কেন্দ্র করে সংলগ্ন কলাইমুড়ি, এমলাবতী, বেলবনী প্রভৃতি গ্রাম গুলিতে মাওবাদীদের অবাধ যাতায়াত ছিল৷ জঙ্গলে শাল গাছ ফেলে পথ আটকে রাখা হয়েছিল যাতে পুলিশ এলাকায় প্রবেশ করতে না পারে। মাওবাদীরা বিচারের নামে শুরু করে গনহত্যা। নিজেদের আদালতের বিচারে জঙ্গলমহলের প্রচুর মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। মাওবাদীদের এই অত্যাচার চরম সীমায় পৌঁছাতেই তৎকালীন সরকার মাও দমন করতে যৌথবাহিনী নামায় এলাকায়।

সাল টা ছিল ২০০৯ এর তেরই জুলাই মধুপুর গ্রামে যৌথবাহিনী অভিযান চালায়। যৌথবাহিনী গ্রাম থেকে চলে যাওয়ার পরই মাও জঙ্গীদের সন্ধেহ হয় স্বপন বাবু পুলিশের চর। রাত তখন সবে সাড়ে আট টা। প্রীতিলতা রাত্রের খাবার খেয়ে তার দাদা সমীর আর মায়ের সঙ্গে কোঠাবাড়ির ছাদে ঘুমাতে যায়। স্বপন বাবু বাড়ির নীচেই একটি ঘরে শুয়ে পড়ে। এমন সময় বাড়ির দরজায় ঠকঠক আওয়াজ। স্বপন দা দরজা খুলো। দরজা খুলতেই কয়েকজন পরিচিত স্বপন বাবুকে ডেকে নিয়ে যায় মিটিং এর নামে। লুঙ্গি পরা অবস্থায় স্বপন বাবু তাদের সঙ্গে যায়। বাড়ির সকলেই চিন্তিত হয়ে পড়ে। এখন আবার কিসের মিটিং। বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার আধঘন্টা পরেই গুলির আওয়াজ। পরদিন গ্রামের একপ্রান্তে একটি খালের পাশে উদ্ধার হয় স্বপন বাবুর রক্তাক্ত মৃতদেহ। বুকের পাঁজর ভেদ করে চলে গেছে তিন তিনটি গুলির কার্তুজ।

একদিকে স্বামী হারার যন্ত্রণা অন্যদিকে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি এর মাঝে পড়ে সেই দিনই অনিমা দেবী দুই সন্তান কে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে যান। বাপের বাড়ির অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না৷ তাই ভাই এর সংসারের হাল কিছুটা হলেও লাঘব করতে একমাত্র ছেলে সমীর কে মেদিনীপুরের একটা টায়ার দোকানের কর্মচারী রেখে দেন। মধুপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাশ করে প্রীতিলতা মামা বাড়িতে থেকেই পড়াশুনো করার জন্য চাদড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। বাবার মৃত্যুর এক বছরের মাথায় গ্রামের বাড়ি থেকে খবর আসে তার ঠাকুরদার শরীর খারাপ। ঠাকুর দা কে দেখতে যাওয়ার জন্য প্রীতিলতা কে সঙ্গে নিয়ে তার মা মেদিনীপুরে ছেলে সমীরের সাথে দেখা করে মধুপুর যায় বিকেলে। ফের খবর হয় পুলিশের চরের বৌ বাড়ি এসেছে। সেই সন্ধ্যেতেই মাতালদের শায়েস্তা করার নামে মিটিং হবে বলে অনিমাদেবী কে নিয়ে যায় তারা। পরে বাড়িতে পৌঁছেও দেয়। ফের আবার রাত্রীতে এসে প্রীতিলতার চোখের সামনেই তার মা কে টানতে টানতে জঙ্গলের দিকে নিয়ে চলে যায় মাওবাদীরা । তারপর থেকে আজ পর্যন্ত প্রীতিলতার মায়ের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। রাজ্যের পালা পরিবর্তনের পর পুলিশের কাছেও গিয়েছিল ভাই বোন তার মা কে খুজে দেওয়ার জন্য। কিন্তু হতাশ হয়েই ফিরতে হয়েছে তাদের।

এর পর মধুপুরের ওই খাল বেয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। প্রীতিলতার দাদা টায়ার দোকানের কাজ করতে করতেই নিজের পড়াশুনো চালাতো। আর সেই পরিশ্রমের ফল হিসেবে রেলওয়ে তে চাকুরী পাই। প্রীতিলতা মেদিনীপুর কলেজ থেকে স্নাতক হয়।

রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে মাওবাদীদের হাতে নিহত পরিবারের একজনকে চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন পর মাত্র দুই মাস আগেই সেই প্রকল্পের মাধ্যমে স্পেশাল হোমগার্ডের চাকুরীতে যোগ দেন প্রীতিলতা। আর পুলিশের চাকুরী পেয়েই তিনি প্রথম ছুটে গিয়েছিলেন সেই গ্রামে। যে গ্রামেই একদিন তার স্বপ্ন ভেঙ্গে খান খান করে দিয়েছিল। গ্রামের ধনঞ্জয় দেবসিংহ , বাপী দেবসিংহ প্রমুখ সমাজসেবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদেরই গড়া “বিবেক বিকাশ” এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গ্রামের কচিকাঁচাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছেন। কখনো তাদের মিষ্টিমুখ করানো তো কখনো বা বই খাতা কিনে দেওয়া। সঙ্গে তাদের বোঝানো, “যে পরিস্থিতিই আসুক না কে হিংসার মাধ্যমে তা দুর করা সম্ভব নয়। তাই হিংসা, বিবাদ ভুলে আমাদের একত্রিত হয়ে থাকতে হবে তবেই আমাদের গ্রাম হয়ে উঠবে শান্তির গ্রাম”। স্বল্পভাষীনী প্রীতিলতা বলেন, ” আমার বাবার প্রাণ কেড়ে নিলেও মৃতদেহ টা চোখে দেখতে পেয়েছিলাম, কিন্তু চোখের সামনে মা কে তুলে নিয়ে গেল তারপর আর কোনোদিন মায়ের সন্ধান পেলাম না। বাবা মা হারানোর যে যন্ত্রণা আমি পেয়েছি তা যেন আর কেউ না পায় সেই কারনেই কচিকাঁচা দের বোঝাচ্ছি হিংসা দ্বেষ ভুলে আমাদের সকল কে একসঙ্গে থাকতে হবে”। তবুও কোথাও যেন এখনো মা বাবা হারানোর যন্ত্রণা প্রীতিলতা কে কুরে কুরে খায়। প্রীতিলতার ফোনে কল করলে এখনো রিংটোনে ভেসে ওঠে শ্রাবন্তী মজুমদারের গলা ” মনে হয় বাবা যেন বলতো আমায় ” আর হেমন্তের গলায় “আয় খুকু আয়, আয় খুকু আয়”।

Previous articleআজকের রাশিফল, ৩রা ফেব্রুয়ারি’২০২১
Next articleদলত্যাগী তৃণমূলীদের বিরুদ্ধে জায়গায় জায়গায় পোস্টার; পুরোনো ও নতুন দলের চাপে যেন যাঁতাকলে পিষছেন সদ্য তৃণমূল ত্যাগীরা