পাঁচ কিলোমিটার উজান বেয়ে প্রিয় কমরেডের স্মরনসভায় অশীতিপর কমরেড

420
পাঁচ কিলোমিটার উজান বেয়ে প্রিয় কমরেডের স্মরনসভায় অশীতিপর কমরেড 1

নিজস্ব সংবাদদাতা: আলো এখন ছুঁতে পারেনা চোখ, ঘোলাটে নয়নমনি। সহজ, মসৃন রাস্তাতেও টাল খায় পা দুটো। তবুও হাঁটেন বৃদ্ধ, কাঁচা পাকা সড়ক ভাঙেন! কারন ওই ওখানে যে ছবি টাঙানো, সে যে বড় প্রিয় জন, সে যে কমরেড! রবিবার খড়গপুর শহরের তালবাগিচায় এমনই এক নজির বিহীন ঘটনার স্বাক্ষী থাকলেন প্রয়াত কমিউনিস্ট নেতা মিহির দাসের স্মরন সভার উদ্যোক্তারা। পাঁচ কিলোমিটার উজান বেয়ে প্রিয় কমরেডের স্মরনসভায় অশীতিপর কমরেড 2গত ১২ই জুন ৭৯ বছর বয়সে (১৯৪১-২০২০) প্রয়াত হয়েছেন আইআইটি খড়গপুর কর্মচারী আন্দোলনের নেতা মিহির দাস কিন্তু একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় তথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সংগঠিত করার আগেই যে খড়গপুরের সুবৃহৎ গ্রামীন এলাকা জুড়েই তাঁর কর্মকাণ্ড বিস্তৃত ছিল তাঁরই প্রমান অশীতিপর এই বৃদ্ধ ভরত মল্লিক। সাতের দশকের গোড়া থেকেই মিহির দাসের এই সহযোদ্ধা এসেছেন সোলাডহর থেকে, গ্রামীন খড়গপুরের মূলত প্রাচীন উপজাতি লোধা সম্প্রদায় অধ্যুষিত গ্রাম।
জানা গেল ১২ই জুন কমরেডের প্রয়ানের খবর পেয়েই ভরত মল্লিক ছুটেছিলেন ঘাগরা শ্মশানে প্রয়াত দাসের শেষকৃত্যে যোগ দিতে কিন্তু রাস্তায় পড়ে গিয়ে আহত হন, রবিবার তাই একা নয় এক সঙ্গিকে নিয়ে হাজির হন স্মরনসভায়।

এক সময় গ্রামীন খড়গপুরে কৃষক আন্দোলন সংগঠিত করতে ঝাঁপিয়ে ছিলেন প্রয়াত দাস। খড়গপুর শহরের আরেক প্রয়াত কমিউনিস্ট নেতা যতীন মিত্রের নির্দেশে। মিত্রের হাত থেকেই তুলে নেওয়া লাল ঝাণ্ডার পরিধি বিস্তার করেছেন খেলাড়, বনপাটনা থেকে বড়া ভেটিয়া হয়ে ধাদকি শাকপাড়া কলাইকুন্ডা। সহজ হয়নি সে লড়াই। সাতের দশকেই বেআইনি, অতিরিক্ত জমি উদ্ধারে প্রবল বাধা হয়েছে জোতদার আর তাদের সহযোগিরা। ভরত মল্লিক, সমিরউদ্দিন, সাবিত্রী সিং, মোহন সিংদের সাথে সে লড়াইয়ের উল্টোদিকে জোতদার কলামুড়িদের বন্দুক গর্জেছে, রক্ত ঝরছে, ঝরেছে প্রান, এসেছে জয়। গ্রেপ্তারও হয়েছেন।সে কথা স্মরন করেছেন ভরত মল্লিকরা।

পাঁচ কিলোমিটার উজান বেয়ে প্রিয় কমরেডের স্মরনসভায় অশীতিপর কমরেড 3

রবিবার, তালবাগিচা শিবমন্দিরের মাঠের স্মরনসভায় করোনা ক্রান্তিকালের সামাজিক দূরত্ব কিন্তু মনে মনে বড় ঘনিষ্ঠ নিবিড়তা। শত শত অনুগামীতে শ্রদ্ধা, স্মরনে খড়গপুর শহরে সদ্য আত্মপ্রকাশ করা ‘আমরা বামপন্থী।’ উঠে এসেছে দাসের উদ্যোগে প্রথম পর্বের বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা হিজলী কলেজ, পরে সরকারের অংশগ্রহন নিশ্চিত করার লড়াই, গ্রামীন খড়গপুরের জন্য একটা কলেজ। এখানে তাঁর পরিচয় ছিল শিক্ষাব্রতীর। একসময়ে দলের নির্দেশে গ্রাম ছেড়ে ফিরে যাওয়া শুধুমাত্র আইআইটির ভেতরে কর্মচারী আন্দোলন সংগঠিত করায়। ফের অবসর নেওয়ার পর ফিরে এসেছেন গ্রামীন খড়গপুরের নেতৃত্বে। গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে আইআইটির আরও শহরে ঢুকে ফের গ্রাম! সব খানেই সফল, সদা হাস্যময় মানুষটি। নিরহঙ্কারের এই মানুষটি তাই আইআইটির বাবু না হয়ে মিহিরদা হয়েই থেকে গেছেন চিরকাল।

আর তাই ভরত মল্লিকদের অসুবিধা হয়নি কোনও দিন, অসুবিধা হয়নি কাছে পৌঁছাতে। স্মরন সভায় উচ্চারিত হল তাও। তিনি আইআইটির ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলেন দলের নির্দেশে কিন্ত আইআইটি তাঁর ভেতরে ঢুকে যাননি বলেই থানা পুলিশ হাসপাতালের ঝামেলায় আইআইটির গেটে দাঁড়িয়েছেন ভরত মল্লিক, সঞ্জিত আড়ি, চাঁদু মুর্মুরা। দুপুরের ভাত না খেয়েই অফিসের খানিক অবসরে শার্ট প্যান্ট পরা ছোটখাটো মানুষটি মোপেড নিয়ে থানায় হাসপাতালে দৌড়েছেন তিনি। এদিনের স্মরনসভায় তাই  ঠিক হয়েছে গরিব মানুষদের চিকিৎসা সুবিধা দিতে একটি ট্রাস্ট তৈরি করা হবে তাঁরই নামে।

কিন্তু শুধুই ভরত মল্লিকে এ সভা শেষ হওয়ার নয়। তালবাগিচা শিবমন্দিরের স্মরন সভায় ১৮ থেকে ৮০ সব্বাই। অর্ধ নমিত লালপতাকা নিয়ে ঘন্টা ভর ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ১৮! বজ্রবাহু ঊর্ধ্বে তুলে প্রিয়জন স্মরনে ৮০ ! আর তার মাঝখানে এক ঝাঁক তরুণ উজ্জ্বল চোখ। বিভ্রান্ত সময়ে এ ছিল এক চরম পাওনা। জয়ন্ত চক্রবর্তী, মৌসুমী রায়, দিলীপ দাসদের একক শ্রদ্ধা সঙ্গীত পরিবেশন মনে করিয়ে দিয়েছে শ্রমিক কৃষক কর্মচারী আন্দোলনের মাঝে এই এলাকার গননাট্য আন্দোলনের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মিহির দাস। অনুষ্ঠানে তাঁর সর্বস্তরের আন্দোলনেরই প্রাক্তন সহযোদ্ধারা হাজির হয়েছেন, হাজির পরিবারের সদস্যরাও।

দিনের শেষে সন্ধ্যা গড়ালে খুপরি নিয়ে নেমে পড়তেন প্রিয় গোলাপের চারাগুলির দিকে, প্রতিদিন, নিরন্তর পরিচর্যা। এই অভ্যাস আরও এক প্রয়াত কমিউনিস্ট নেতা সুকুমার সেনগুপ্তর কাছ থেকে পাওয়া। শীতের শুরুতেই টব ভর্তি থই থই করত সেই গোলাপের দল। কেউ যদি বলত, ‘মিহিরদা লাল গোলাপটা বড় সুন্দর করেছেন!’ এক গাল পান ভরা মুখ নিয়ে অমনি তাঁর জবাব, ‘কেন? হলুদটা দেখ, আর গোলাপিটাই বা কম কিসের?’ তাকে ধরে নিয়ে একটা একটা করে সব টবের কাছে নিয়ে যেতেন। সেই গোলাপের সুবাসেই তো পাঁচ কিলোমিটার ভেঙে ছুটে আসেন ভরত মল্লিকেরা! বলেন, ‘ই! পাঁচ কিলোমিটার কী গো? মিহিরদার জন্য আমি এখনও অনেকদূর হাঁটতে পারি।’