হৃদয়হীন করোনা, হায়দার হীন মেদিনীপুর! Facebook জুড়ে শুধুই কাঁদছে শহর

8958
হৃদয়হীন করোনা, হায়দার হীন মেদিনীপুর! Facebook জুড়ে শুধুই কাঁদছে শহর 1

সুদীপ খাঁড়া: পাঁজিতে যাত্রা ছিলনা তবুও চলে গেলেন তিনি, চলে গেলেন মেদিনীপুরকে নিঃস্ব রিক্ত আর হাহাকার দীর্ন করে, চলে গেলেন আজ, এই ঘাতক বৃহস্পতিবারে! খবরটা আসার পরই কেঁদে উঠেছে মেদিনীপুর, কাঁদছে গোটা সোশ্যাল মিডিয়ার চরাচর, কান্নার সেই ঢেউ আছড়ে পড়ছে ধ্বনিতে, প্রতিধ্বনিতে, হায়দার নেই, হায়দার নেই…..। এই ডিসেম্বর মাস! যখন কোভিড যন্ত্রণার দীর্ঘ প্রবাস কাটিয়ে এই মেদিনীপুর শহরের প্রতিটা সন্ধ্যা হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কিংবা জগজিৎ সিংয়ের গজল শুনতে চাইছে তখনই নীরব, নিথর হয়ে গেলেন হায়দার আলি! মাত্র ৫৩ বছর বয়সে।

বৃহস্পতিবারের সকাল সকাল ৮ টা ৫ মিনিট নাগাদ কলকাতার সি এম আর আই (CMRI)হাসপাতালে মেদিনীপুরের সঙ্গীত গর্ব হায়দার আলি। টানা চব্বিশ দিনের লড়াই শেষে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।গত ১৭ই নভেম্বর মেদিনীপুরের এক বেসরকারি হাসপাতালে টেষ্টে কোভিড পজেটিভ হওয়ায় তাঁকে সেদিনই কলকাতার সি এম আর আই হাসপাতালে ভর্তি করেন তাঁর পরিবার পরিজন ও বন্ধুবান্ধবরা।

হৃদয়হীন করোনা, হায়দার হীন মেদিনীপুর! Facebook জুড়ে শুধুই কাঁদছে শহর 2

মেদিনীপুর শহরের নিমতলাচকের বনেদি পারিবারিক পরিমন্ডলে বেড়ে উঠেছিলেন হায়দার। কমার্স কলেজ থেকে স্নাতক। পারিবারিক ব্যবসার চাইতেও তাঁকে টেনেছিল সঙ্গীত জগৎ। শহরের প্রবাদ প্রতিম সঙ্গীত গুরু জয়ন্ত সাহার কাছে তালিম তাঁর আর সারা জীবন তাঁকেই গুরু জ্ঞানে প্রায় পুজো করে এসেছেন। জয়ন্ত সাহার স্ত্রীকে ডাকতেন গুরুমা বলেই। আর গুরুও তাঁকে ঢেলে দিয়েছেন অকৃপন বদান্যতায়। গুরু দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে অমানুষিক সেবা শুশ্রষা করেছেন।

শুধু নিজেই শিল্পী নয়, গোটা শহরটাকেই শিল্প চর্চার পীঠস্থান করে তুলতে অদম্য আগ্রহ ছিল তাঁর। মেদিনীপুরের সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম মঞ্চ রবীন্দ্র স্মৃতি সমিতির সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন । ফি বছর গুরুদেব জয়ন্ত সাহার প্রতিষ্ঠান স্বরলিপির বার্ষিক অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতেন তিনি, জুতো সেলাই থেকে চন্ডী পাঠ। রবীন্দ্র নিলয়ে রবীন্দ্র স্মৃতি সমিতি আয়োজিত যেকোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম। জেলা এবং জেলার বাইরে প্রায় সমস্ত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সর্বস্তরের শিল্পীদের সঙ্গে যথেষ্ট ভালো সম্পর্ক ছিল হায়দার বাবুর। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি ছিলেন অভিভাবকতুল্য।

রবীন্দ্র সংগীতের পাশাপাশি আধুনিক গান এবং গজল তাঁর গলায় খেলে যেত অবলীলায়। প্রতি বছর তার উদ্যোগে জগজিৎ সিং স্মরণে গজলের আসর বসতো রবীন্দ্র নিলয়ে। রবীন্দ্র নিলয়ের প্রাচীরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের শ্লেটের প্রতিকৃতি স্থাপনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বৃহস্পতিবার সকালে ফোন কল আর সোস্যাল মিডিয়ায় তাঁর মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে মেদিনীপুর জুড়ে। শোকে কাতর হয়ে পড়েন তাঁর অনুরাগীরা এবং সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষরা।

খবরটা আসার পরই ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট করে শোক জ্ঞাপন করেন তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন ভাবে জড়িয়ে থাকা কয়েক শ ব্যক্তিত্ব। শোক জ্ঞাপন করতে দেখা গিয়েছে রবীন্দ্র স্মৃতি সমিতির সভাপতি জগবন্ধু অধিকারী। খড়্গপুর থেকে সঙ্গীত শিল্পী সৌমেন চক্রবর্তী, বেলদা থেকে সঞ্চালক অখিলবন্ধু মহাপাত্র,ঝাড়গ্রাম থেকে ভাস্কর সুবীর বিশ্বাসরা ফেসবুক বার্তায় শোক প্রকাশ করেছেন। ফেসবুক বার্তায় শোকজ্ঞাপন করেছেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বিজয় পাল,নাট্যব্যক্তিত্ব জয়ন্ত চক্রবর্তী,কবি অভিনন্দন মুখোপাধ্যায় সহ অসংখ্য মানুষ। শোকে মূহ্যমান কবি নির্মাল্য মুখোপাধ্যায়, নৃত্যশিল্পী ঈশিতা চট্টোপাধ্যায়, শতাব্দী গোস্বামী, শাশ্বতী শাসমল, সঙ্গীত শিল্পী সুমন্ত সাহা,অমিতেশ চৌধুরী,সময় বাংলার জয়ন্ত মন্ডল, নৃত্যশিল্পী রাজীব খান, শমীক সিনহা প্রমুখদের।

রবীন্দ্র স্মৃতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক তথা হায়দার আলির ঘনিষ্ঠ বন্ধু লক্ষণচন্দ্র ওঝা বলেন, হায়দারদার প্রয়াণে গোটা রবীন্দ্র স্মৃতি সমিতি, বিশেষ করে রবীন্দ্র স্মৃতি সমিতির সাংস্কৃতিক বিভাগের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সঙ্ঘের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা সভাপতি বিজয় পাল বলেন, “বড় দুঃসময়ে এই শিল্পীকে হারালাম আমরা। তাঁর শিল্প চর্চার পাশাপাশি একটি প্রগতিশীল ধর্ম নিরপেক্ষ সত্তা ছিল যা এই সময়ে দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক মানুষকে সাহস দিত।”
হায়দার আলি রেখে গেলেন স্ত্রী সোফিয়া, পুত্র আয়মান এবং কন্যা নওসীনকে। মাত্র কয়েকদিন আগেই নিজের ফেসবুক পেজে সেই ছবি পোস্ট করে বলেছিলেন, আমার রাজকুমারী!