মন জিতে নিয়ে গেল মেয়েটা! সোনাচূড়ায় কেঁদেই ফেললেন মহামায়া মন্ডল, মীনাক্ষীতেই ভয় কাটিয়ে নিজের ভোট নিজে দেবে নন্দীগ্রাম

3936
মন জিতে নিয়ে গেল মেয়েটা! সোনাচূড়ায় কেঁদেই ফেললেন মহামায়া মন্ডল, মীনাক্ষীতেই ভয় কাটিয়ে নিজের ভোট নিজে দেবে নন্দীগ্রাম 1

মন জিতে নিয়ে গেল মেয়েটা! সোনাচূড়ায় কেঁদেই ফেললেন মহামায়া মন্ডল, মীনাক্ষীতেই ভয় কাটিয়ে নিজের ভোট নিজে দেবে নন্দীগ্রাম 2নিত্য গুপ্ত; নন্দীগ্রাম: এ এক অসম্ভব অসম সাহসী লড়াই! এসি গাড়ি নেই, হেলিকপ্টার নেই, মেয়েটা হাঁটছে তো হাঁটছে। দিনের পর দিন চড়া রোদে মুখ, চোখ পুড়ে গেছে। ও পাশে জেড আর তস্য জেড ক্যাটাগরি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দুই হেভিওয়েট নেতা। একজন ভূমিপুত্রের দাবিদার তো অন্যজন বাংলার মেয়ে! কিন্তু দুজনেরই চোখে মুখে সন্দেহ আর অবিশ্বাস! শুধু ভয়, এই বুঝি কেউ ষড়যন্ত্র করে বসে। লোকলস্কর সেপাই সান্ত্রী নিয়ে রাজ্যের দুই হাই প্রোফাইল নেতানেত্রীর লড়াই, বিপরীতে মেয়েটা ঢুকে যাচ্ছে অলিতে গলিতে, চাটাই ঘেরা রান্না ঘরে। ফ্লাই নমস্কার নয়, মেয়েটার হাত দুটো ধরে থাকেন মহামায়া মন্ডল, সাকিন সোনাচুড়া। মহামায়ার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। হাত দুটো আঁকড়ে ধরে বলেন, ‘মা আসবে তো আবার? ভোটে জেত আর নাই জেত,আবার এসো। আমাদের মন জিতে নিয়েছ যে তুমি।’

মঙ্গলবার প্রচার শেষের শেষ লগ্নে সিপিএম প্রার্থী মীনাক্ষী মুখার্জীর আবেগাপ্লুত ভিডিও বার্তা তখন পৌঁছে গেছে গাংড়া, গড়চক্রবেড়িয়া, চৌরঙ্গী থেকে গোকুলনগর, রানিচক, সাতেঙ্গাবাড়ি । তালপাটি খালের ওপর উঁচু সেতু বেয়ে তেখালি বাজারের চায়ের দোকানে বসে বছর একুশের সুপর্ন অধিকারী, অর্নব মাইতিরা সেই বার্তা শুনছেন নিজেদের এন্ড্রয়েড ফোনে। ভোট দিতে ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছেন তাঁরা। ভোট শেষ হলেই ফের ছুটতে হবে পারাদ্বীপ, ব্যাঙ্গালুরু, সুরাটে। ১৪বছর আগে যখন জমির লড়াই হয় তখন এদের বয়স সাত। এদের বাবা-কাকারাই সেদিন লড়েছিল ‘হার্মাদের বিরুদ্ধে। গল্প শুনতে শুনতে বড় হয়েছে তারা, শুনেছে দিদির রাজত্বে ভোল বদলে যাবে নন্দীগ্রামের! দিদি মুখ্যমন্ত্রী, দাদা মন্ত্রী হয়েছে আর এরা ঘরবাড়ি ছেড়ে পরিযায়ী!

মন জিতে নিয়ে গেল মেয়েটা! সোনাচূড়ায় কেঁদেই ফেললেন মহামায়া মন্ডল, মীনাক্ষীতেই ভয় কাটিয়ে নিজের ভোট নিজে দেবে নন্দীগ্রাম 3

মোবাইলে শুনছে সংযুক্ত মোর্চার সিপিএম প্রার্থী মীনাক্ষী গোস্বামীর গলা, ‘ আজ ফর্মালি প্রচার শেষ। তৃণমূল-বিজেপির মিছিলে থেকেও হাত উঁচু করে আপনারা যেভাবে ফুল ছুড়েছেন, ভালোবাসা দিয়েছেন, তাতে আমি আপ্লুত। মানুষের রুটি-রোজগার নিয়ে প্রচার শেষ। আপনারা পয়লা এপ্রিল আপনার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিন। ভোট চুরি রুখে পরিযায়ী শ্রমিকদের স্বার্থে ভোট দিন। কৃষক-শ্রমিকের স্বার্থে, শিল্প-কৃষির স্বার্থে ভোট দিন।”

দাদা-দিদির লড়াইয়ে সরগরম নন্দীগ্রাম। আজ অবশ্য সিপিএম নয় শুধু দাদা আর দিদির ভাইদের ঠেকাতেই ২২কোম্পানি সিআরপিএফের ঘেরাটোপে নন্দীগ্রাম! আজ নন্দীগ্রাম যেন কাশ্মীর! ভারী বুটের শব্দের মধ্যেই রেয়াপাড়ার ঘরে ঘরে মোবাইলে মানুষ শুনছেন মীনাক্ষীর সেই ভিডিও বার্তা। নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্যে তিনি বলছেন, “নন্দীগ্রামের মানুষ ভোট দিতে চাইছেন। আপনারা সাহায্য করুন। আপনাদের সাহায্য চাইছেন নন্দীগ্রামের মানুষ। ভোটারদের সাহায্য করুন, মানুষ ১০ বছর ধরে নিজেদের রুটি-রুজির জন্য ভোট দিতে পারেননি। যদি মানুষ ভোট দিতে না পারেন, তবে ইতিহাসে লেখা থাকবে পুলিশ-প্রশাসনের সহযোগিতা না থাকার জন্যই তারা ভোট দিতে পারেননি।”

নন্দীগ্রাম থানা ছাড়িয়ে স্টেটব্যাংকের দিকের রাস্তায় চায়ের দোকানেও ভিড়। কলেজের সামনে, স্টেট ব্যাঙ্কের গেটের মুখে মোবাইলে বাজছেন মীনাক্ষী! বলছেন, “ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, সেদিন নন্দীগ্রামের পুলিশ ঢুকতে পারত না যদি না বাপ-ব্যাটার অনুমতি থাকত। এই কথার পর অনেকের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল, আবার হয়তো পরিষ্কার হল না। তবে নন্দীগ্রামে মানুষ যদি ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, তবে মানুষ বুঝিয়ে দেবে কোনটা সত্যি।”

ভোট শেষ, ফিরে যাবে মেয়েটা। বড় মিষ্টি মেয়ে ঠিক যেন ঘরের মেয়ের মত। না, ভূমিপুত্র, ভূমিকন্যার মত নাগাল না পাওয়া হাই-প্রোফাইল মেয়ে নয়, বাড়ির মেয়ের মত, বড় কাছের। মেয়েটার প্রতিই কিন্তু সব চেয়ে রাগ হওয়ার কথা ছিল! ও যে হার্মাদের মেয়ে। কিন্তু রাগ হচ্ছেনা কেন, কেন বারবার মনে হচ্ছে, জিতে যাক ও। থেকে যাক নন্দীগ্রামের হয়ে। মহামায়ার মতই চোখের জল গড়িয়ে পড়ে অনেকের। বলেন, আবার আসবি তো মেয়ে? মেয়েটা তাকিয়ে থাকে, তার চোখের তারায় অদ্ভুদ হাসি। যেন এই হাসিটাই এতদিন খুঁজে এসেছে নন্দীগ্রাম।