পার্শ্ব শিক্ষকরা শিক্ষকই নয়, কোয়াক ডাক্তারের মত হাতুড়ে! আন্দোলন প্রসঙ্গে কদর্য ভাষায় আক্রমণ তৃণমূল নেত্রীর

2074
পার্শ্ব শিক্ষকরা শিক্ষকই নয়, কোয়াক ডাক্তারের মত হাতুড়ে! আন্দোলন প্রসঙ্গে কদর্য ভাষায় আক্রমণ তৃণমূল নেত্রীর 1
পার্শ্ব শিক্ষকরা শিক্ষকই নয়, কোয়াক ডাক্তারের মত হাতুড়ে! আন্দোলন প্রসঙ্গে কদর্য ভাষায় আক্রমণ তৃণমূল নেত্রীর 2

অশ্লেষা চৌধুরী: পার্শ্ব শিক্ষকরা কোনোও শিক্ষকই নন, এরা আসলে ডাক্তারের বদলে কোয়াক বা হাতুড়ে ডাক্তারের মত। যে শিক্ষকদের দিয়ে জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ করানো হয় স্কুলগুলিতে সেই শিক্ষকদের সম্বন্ধে এমনই মন্তব্য করলেন তৃনমূল নেত্রী দোলা সেন। বাংলায় এই শিক্ষকরা শিক্ষকতার কোনও চাকরি পাননি, সিপিআইএমের আমলে কর্মসংস্থানের নামে পার্শ্ব শিক্ষকের বাহানায় এদের নেওয়া হয়েছিল’ পার্শ্ব শিক্ষকদের নিয়ে এমনই চাঁচাছোলা ভাষায় মন্তব্য করলেন তৃণমূল নেত্রী দোলা সেন।

সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে একটি ভিডিও। যেখানে কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জীর অনুগত হওয়া এই নেত্রীকে কিছু সংবাদমাধ্যমের কর্মী জানতে চান দিল্লীর কৃষক আন্দোলন ও বাংলায় শিক্ষক আন্দোলন সম্পর্কে। , জবাবে তৃনমূল সাংসদ বলেন, “বাংলায় এই শিক্ষকেরা কোনও চাকরি পাননি। সিপিআইএমের আমলে কর্মসংস্থানের বাহানায় প্যারা মেডিক্যালের মতো প্যারা টিচার, ডাক্তারির বদলে কোয়াক ডাক্তারের মত তাদের নিয়োগ হয়েছিল, বিভিন্ন প্রকল্পে যুক্ত করেছিল রাজ্যের সিপিআইএম সরকার, আই ওয়াশ দিয়েছিল, ভাতা দিয়েছিল, কোনও চাকরি দেয় নি; এমনকি ঠিকা চাকরিও নয়, কন্ট্রাকচুয়াল চাকরিও নয়। আজ সিপিআইএম- ই তাদের পিছনে হওয়া দিচ্ছে, যে তাদের স্থায়ী চাকরি দিতে হবে। কৃষক আন্দোলন ও এই আন্দোলন সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।“

পার্শ্ব শিক্ষকরা শিক্ষকই নয়, কোয়াক ডাক্তারের মত হাতুড়ে! আন্দোলন প্রসঙ্গে কদর্য ভাষায় আক্রমণ তৃণমূল নেত্রীর 3

এদিন উপদেশের সুরে নেত্রী আরও বলেন, “যদি কেউ শিক্ষকতা করতে চান, আমরা বলব সিপিআইএম ও বিজেপির হাওয়ায় থাকবেন না, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর ভরসা রাখুন, ১০বছরে ইনফাস্ট্রাকচার তৈরি করেছেন ৪০ লক্ষ বেকারদের চাকরি দিয়েছেন ১ কোটি বেকারকেই দেবেন। আর একটু সময় লাগবে, ৩৪ বছরের সব পাপ ১০বছরে ধোয়া যায় না।“ এদিন তিনি ৬০ বছরের নিয়োগপত্র, বার্ষিক ৩% ইনক্রিমেন্ট এবং অবসরের পর এককালীন ৩ লক্ষ টাকা দেওয়ার প্রসঙ্গও তুলে আনেন। আর তৃণমূল নেত্রীর এমন অপমানজনক ও বিতর্কিত মন্তব্যে ঝড় উঠেছে শিক্ষক মহলে।

উল্লেখ্য, সর্ব শিক্ষা মিশনের আওতায় প্রথমে পার্শ্ব শিক্ষক নিয়োগ করা হলেও রাজ্যে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে তাদের ৬০ বছর চাকরির নিরাপত্তাসহ নিয়োগপত্র দেওয়া হয় এবং সেইসাথেই তিন বছর অন্তর ৫% ইনক্রিমেন্ট ঘোষণা করা হয়। যদিও তাদের স্থায়ীকরণ ও পূর্ণ মর্যাদার শিক্ষক ঘোষনার দাবী উঠছিল বহুদিন আগে থেকেই। প্রথম যখন পার্শ্ব শিক্ষক নিয়োগ করা হয়, তখন প্রাথমিকে এক হাজার ও উচ্চ প্রাথমিকে দুই হাজার টাকা ছিল তাদের ভাতা। মূলত স্কুল ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী সকল শিশুদের শিক্ষার আঙিনায় নিয়ে আসতেই তাদের নিযুক্ত করা হয়েছিল এবং তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই ক্রমশ কমতে থাকে বিদ্যালয় ছুট শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। কিন্তু এতটা পরিশ্রমের পরেও যোগ্য সম্মান টুকু থেকেও বঞ্চিত হল পার্শ্ব শিক্ষকেরা, যোগ্য বেতন তো দুরস্থ। সেই সময় থেকেই আওয়াজ ওঠে সম কাজে সম বেতন, এমনকি অনশনের পথেও হেঁটেছিলেন পার্শ্ব শিক্ষকেরা। সেই সময় তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল তথা বর্তমান শাসকদলের শিক্ষামন্ত্রী ফলের রস খাইয়ে তাদের অনশন ভঙ্গ করে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে ধাপে ধাপে তাদের স্থায়ীকরণ করা হবে। এমনকি দলনেত্রী তথা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীও আওয়াজ তুলেছিলেন, অন্য রাজ্যের তুলনায় কেন এই রাজ্যের পার্শ্ব শিক্ষকেরা কম বেতন পাবেন? তিনি ক্ষমতায় এলে অবশ্যই এই বৈষম্য মেটাবেন। আজ উল্টো সুর সেই তৃনমূলের!

তৃনমূল ক্ষমতায় আসারপরও আজ দশ বছর পরেও সেই তিমিরেই আটকে পার্শ্ব শিক্ষকেরা। এমনকি যেই যোগ্যতার ( উচ্চ মাধ্যমিকে ৫০% ও দু বছরের ডি এল এড ট্রেনিং) দোহাই দিয়ে পার্শ্ব শিক্ষকদের স্থায়ী করণ সম্পূর্ণ করা হচ্ছিল না, সেই অজুহাতও আজ খাটে না, কারণ সকলেই বর্তমানে যোগ্য প্রশিক্ষন প্রাপ্ত। তা সত্ত্বেও আজও তাদের নির্দিষ্ট বেতন ক্রম ও পূর্ণ শিক্ষকের মর্যাদা তারা পেলেন না। ২০২০ সালের ১৮ ই ডিসেম্বর থেকে এখনও পর্যন্ত প্রবল শীত উপেক্ষা করেও বিকাশ ভবনের ফুটপাতে ধর্না অবস্থানে বসে রয়েছেন হাজার হাজার পার্শ্ব শিক্ষক, অথচ মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী তাদের দিকে ফিরেও তাকাননি। এমনকি কিছুদিন আগে সম্পূর্ণ আদেশ নিয়ম মেনে নবান্ন অভিযান যাওয়ার দিনেও তাদের মাঝপথেই আটকে দেয় পুলিশ। শিক্ষকদের সাথে করা হয় বর্বরোচিত আচরণ। শুধু তাই নয়, তাদের আটক করে পর্যন্ত নিয়ে যায় পুলিশ।

এমনকি নবান্ন অভিযানের আগে মুখ্যমন্ত্রীকে রক্ত দিয়ে চিঠিও লিখেছিলেন পার্শ্ব শিক্ষকেরা, তবে তাতেও মন গলেনি মুখ্যমন্ত্রীর। এরপর পার্শ্ব শিক্ষক ঐক্য মঞ্চের ৪ জন সদস্য অনশনে বসেন। ক্রমশই অসুস্থ হতে থাকে তাদের শরীর। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী তখন খেলা মেলায় অনুদান দেওয়া নিয়ে ব্যস্ত। এসব দেখার সময় কোথায় ওঁনার কাছে! তারপর সরস্বতী পুজোর দিন বিজেপি নেতা মুকুল রায়ের আশ্বাস ও অনুরোধে পুজোর প্রসাদ খেয়ে অনশন তুলে নেন তারা। তবে এখন পূর্ণ শিক্ষকের মর্যাদা ও নির্দিষ্ট বেতন পরিকাঠামোর দাবীতে এখন চলছে পার্শ্ব শিক্ষকদের অবস্থান, সেই ফুটপাতেই। আর তাদের প্রতি সহানূভূতি তো দূরে থাক উল্টে তাদের শিক্ষক বলেই মানতে নারাজ তৃণমূল নেত্রী দোলা সেন!