বেলদা থেকে খড়গপুর হয়ে মেদিনীপুর, লকডাউনের মধ্যেই বাড়িতে বাড়িতে রিয়া মাইতি ও মহিলা ব্রিগেড

3605
বেলদা থেকে খড়গপুর হয়ে মেদিনীপুর, লকডাউনের মধ্যেই বাড়িতে বাড়িতে রিয়া মাইতি ও মহিলা ব্রিগেড 1
বেলদা থেকে খড়গপুর হয়ে মেদিনীপুর, লকডাউনের মধ্যেই বাড়িতে বাড়িতে রিয়া মাইতি ও মহিলা ব্রিগেড 2

নিজস্ব সংবাদদাতাঃ ”সিঙ্গুর থেকে শালবনী, ক্ষেতমজুরের কান্না শুনি….এই সরকার আর না…” কলকাতার রাজপথ কাঁপিয়ে যে মেয়েটা শ্লোগান তুলে দাপিয়ে ছিল আর সেই ভিডিও ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার শহর আর গ্রামে। পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদা শহরের সেই মেয়েটির নাম জেনে গিয়েছিল ছেলে থেকে বুড়ো, ছাত্রী থেকে গৃহবধূ সব্বাই,যার নাম রিয়া মাইতি। রিয়ার বেলদার বাড়ি থেকে নারায়নগড় পঞ্চায়েত সমিতির বাখরাবাদ এলাকার পোক্তাপুল এলাকায়। বর্তমানে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রানীবিদ্যার ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী রিয়া লকডাউনের বাজারে চষে বেড়াচ্ছে নিজের এলাকা ছাড়াও রানাপাড়া , নবোদয়পল্লী, হোসেনপুর, জগৎপুর, কোরকোরা।

করোনা সতর্কতায় গৃহবন্দী গ্রামের পর গ্রাম। কিন্তু কী হবে ক্লাশ এইট থেকে টুয়েলভে পড়া কিশোরীদের! তাঁদের যে দরকার স্যানেটারী ন্যাপকিন। পাড়ার যে কাকিমা রাত বাড়লেই বাতের ব্যথায় কাবু, যে দাদুর নিত্য সেবনের সুগারের ওষুধ শেষ হয়ে গেছে ! কুছ পারওয়া নেই রিয়ার নম্বর আছে না। ফোন করলেই সে সব নিয়ে দুয়ারে হাজির রিয়া। কয়েক কিলোমিটার দুরে বেলদার বাজার থেকে সে সব কাউকে দিয়ে আনিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে রিয়া আর তাকে দেখেই উছলে উঠছে পাড়া । আওয়াজ উঠছে, ‘মা দেখে যাও রিয়া দিদি এসেছে।’ আর কাজকম্ম ফেলে পাড়া ছুটছে রিয়াকে দেখতে।
কমবেশি প্রায় ১৫০টি দুঃস্থ পরিবারের ছাত্রীদের কাছে স্যানিটারি ন্যাপকিন পৌঁছে দিয়েছেন রিয়া। বাখরাবাদ হাই স্কুলের ক্লাশ নাইনের ছাত্রী নবোদয়পল্লীর মমতা বেসরা কিংবা ওই স্কুলেরই রানাপাড়ার ক্লাশ টেনের ইশা সাঁই রা দারুন খুশি রিয়া দিদির উদ্যোগে। কলোনীর ক্লাশ টুয়েলভের পুজা পাতর এতটাই আপ্লুত যে নিজেই জুটে গেছে রিয়া দি র সঙ্গে। বলছে, ” দিদি একা কত করবেন, তাই চলে এলাম দিদির সঙ্গে কাজ করতে। মানু্ষের কাজ করার এত আনন্দ দিদির সঙ্গে রাস্তায় না নামলে জানতামই না।”

বেলদা থেকে খড়গপুর হয়ে মেদিনীপুর, লকডাউনের মধ্যেই বাড়িতে বাড়িতে রিয়া মাইতি ও মহিলা ব্রিগেড 3

শুধুই অবশ্য ছাত্রীদের জন্য নয় রিয়া কাজ করছেনা দুঃস্থ পরিবার গুলির জন্যও। কয়েকটি পরিবারকে ত্রানও দিয়েছে সে। আর এই কাজে রিয়ার সঙ্গে রয়েছেন তাঁর মা রুমাও। রিয়া বলেন, ”লকডাউনে কর্মহীন হয়ে পড়েছে এলাকার দিন আনা, দিন খাওয়া মানুষ গুলো। গ্রামে গঞ্জে মানুষের দুর্দশা দেখে ঘরে বসে থাকতে পারিনি। সামর্থ্য আছে এমন কিছু মানুষের কাছে সাহায্য চেয়ে এলাকার একেবারে দুঃস্থ ১৯ টি পরিবারে চাল, ডাল, আলু, তেল, ইত্যাদি পৌঁছে দিলাম। পাড়ায় ঘুরে জিজ্ঞাসা করে মহিলাদের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনে এনে পৌঁছে দিচ্ছি বাড়িতে। যাতে মানুষ বাড়ির বাইরে কম বেরোয়।”
রিয়ার মতোই তাঁর এস.এফ.আইয়ের সহযোদ্ধারা নেমে পড়েছেন মেদিনীপুর শহরে। অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, দুঃস্থ মানুষদের সাহায্য করছেন সৃজিতা, লিজা, জয়স্মিতারা। ফোন নম্বর দিয়ে দিয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। চাল, ডাল, সব্জি বাজার, ভুষিমাল, ওষুধ, স্যানিটারি ন্যাপকিন কোন কিছুর প্রয়োজনে কেউ ফোন করলেই পৌঁছে যাচ্ছেন তাঁর বাড়িতে। কিছুক্ষণের মধ্যে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে পৌঁছে দিচ্ছেন বাড়িতে। মেদিনীপুরের সৃজিতা দে বক্সি বলেন, ‘এমন অনেক মানুষ আছেন যাঁদের কেউ নেই। তাঁরাও বেরীতে পারছেন না। এই পরিস্থিতিতে সবাই যদি বাড়িতে বসে থাকি তাহলে ঐ সমস্ত মানুষজনের সমস্যা হবেই। তাই আমরা অসহায় মানুষদের সাহায্য করতে রাস্তায় নেমেছি। সৃজিতা বলেন, এই কাজে একটা আলাদা মানসিক তৃপ্তি আছে। তবে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে সাবধান সতর্কেই একাজ করার চেষ্টা করছি।”

সৃজিতা, রিয়া, পুজা, জয়স্মিতারা যখন মানুষের সেবা করছেন, ঠিক তখন নিজেরা রান্না করে স্কুটিতে করে ঘুরে ঘুরে শহরের পথ কুকুরদের খাচ্ছেন রিমা কর্মকার, শ্রবনী মহাপাত্ররা। রিমা বলেন, এই পরিস্থিতিতে আমরা কিছুনা কিছু খাচ্ছি। কিন্তু ওরা (রাস্তার কুকুর গুলো) কী খাবে। তাই ওঁদের একটু খাবার দেওয়ার চেষ্টা করছি। রিমা বলেন, শুধু মেয়েরা নয়, একাজে শিবু রানা সহ কয়েকজন ছেলেও আমাদের সাহায্য করছে’।
আতঙ্কে যখন সবাই গৃহবন্দী, তখন অসহায় মানুষদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন রিয়া মাইতি, সৃজিতা দে বক্সি, জয়স্মিতা শাসমল, লিজা পাঁজা, স্মৃতিকণা দেবনাথ, রিমা কর্মমকার, শ্রাবনী মহাপাত্রদের মতো মহিলারা। ঝুঁকি নিয়েই রাস্তায় নেমে কাজ করছেন অসহায় মানুষকে সাহায্য করার জন্য। এঁরা কেউ ছাত্রী, কেউ গৃহবধূ। পশ্চিম মেদিনীপুরের মেদিনীপুর শহর, খড়্গপুর, বেলদা সহ বিভিন্ন এলাকায় লকডাউন পরিস্থিতিতে মানষের কাছে এঁদের একটায় আবেদন, ‘আপনারা কেউ বাড়ির বাইরে বেরোবেন না। আপনাদের জন্য আমরা আছি। আপনাদের যেকোন প্রয়োজনে আমাদের ফোন করুন। আমরা আপনার প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দেবো বাড়িতে।”