স্বদেশ-সম্পাদনা-রবীন্দ্রনাথ

241
স্বদেশ-সম্পাদনা-রবীন্দ্রনাথ 1

স্বদেশ-সম্পাদনা-রবীন্দ্রনাথ 2✍️কলমে: অরূপম মাইতি

(পর্ব ১)

সাল ১৯০৫ জুলাই ৬, ব্রিটিশ সরকারের ‘বঙ্গভঙ্গ’ নামে দুরভিসন্ধির কথা প্রথম প্রকাশ করল কলকাতা প্রেস। আড়াই মাস পর অক্টোবর ১৬, ভাইসরয় লর্ড কার্জনের আদেশে সম্পন্ন হল ‘বঙ্গভঙ্গ’। সেই সময় স্বদেশী আন্দোলন উত্তাল হয়ে ওঠার পিছনে অনুঘটকের কাজ করেছিল এই ‘বঙ্গভঙ্গ’। পরবর্তী কালে ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থে (প্রকাশকাল ১৯১২) পঞ্চাশোর্ধ রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন “বাহির হইতে দেখিলে আমাদের পরিবারে অনেক বিদেশী প্রথার চলন ছিল কিন্তু আমাদের পরিবারের হৃদয়ের মধ্যে একটা স্বদেশাভিমান স্থির দীপ্তিতে জাগিতেছিল…”
অবশ্য ‘বঙ্গভঙ্গ’-এর (১৯০৫) অনেক আগে রবীন্দ্রনাথ স্বদেশীয়ানায় জারিত ছিলেন। ১৮৯৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্বদেশী শিল্পদ্রব্য প্রস্তুত, ব্যবহার ও বিপণনের উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথের অংশীদারীত্বে ৮২ হ্যারিসন রোডে ‘স্বদেশী ভাণ্ডার’ (লিমিটেড) নামে একটি দেশী কাপড়ের দোকান খোলা হয়। ‘ঘরোয়া’ গ্রন্থে অবনীন্দ্রনাথ তাঁর স্মৃতিকথায় বলেছেন “আমাদের দলের পাণ্ডা ছিলেন রবিকাকা।…মস্ত সাইনবোর্ড টাঙানো হল দোকানের সামনে – ‘স্বদেশী ভাণ্ডার’। ঠিক হল স্বদেশী জিনিস ছাড়া আর কিছু থাকবে না দোকানে। বলু (বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর) খুব খেটেছিল – নানা দেশ ঘুরে যেখানে যা স্বদেশী জিনিস পাওয়া যায় – মায় পায়ের আলতা থেকে মেয়েদের পায়ের জুতো সব কিছু জোগাড় করেছিল, তার ঐ শখ ছিল। পুরোদমে দোকান চলেছে।”
স্বদেশীয়ানার যাবতীয় পরিকল্পনা রূপায়নে ‘কাকা’-র সহচর ছিলেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রেরা। শুধু ভ্রাতুষ্পুত্র কেন, ভাগিনেয়ী হিরন্ময়ী দেবী, সরলা দেবীও ‘রবিমামা’-র স্বদেশী ভাবনার যোগ্য সাথী ছিলেন। এর আগে স্বদেশীয়ানাতে অনুপ্রাণিত হয়ে স্বর্ণকুমারী দেবী (দ্বারকানাথ ঠাকুরের প্রৌত্রী ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্থ কন্যা, রবীন্দ্রনাথের অগ্রজা, ছিলেন তাঁর থেকে পাঁচ বছরের বড়) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘সখি সমিতি’। স্বদেশী শিল্পের জাগরণ এবং অসহায় মহিলাদের সাহায্যের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘সখি সমিতি’। স্বর্ণকুমারী দেবীর কন্যা হিরন্ময়ী দেবীর হাতে ‘সখি সমিতি’ পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল ‘বিধবা শিল্পাশ্রম’ নামে। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা ‘মহিলা শিল্পসমিতি’ নামে সাপ্তাহিক মহিলা অধিবেশন বসাতেন।
যাই হোক, কুটিরশিল্পজাত স্বদেশী পণ্য বিক্রয়ের জন্য ১৯০৩ সালে ৭ নং কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটে, ‘লক্ষীর ভাণ্ডার’ নামে একটি দোকান খুলেছিলেন সরলাদেবী (স্বর্ণকুমারী দেবীর আর এক কন্যা)। যুগান্তর দলের সক্রিয় কর্মী ছিলেন তিনি। সরলাদেবীর অনেক রাজনৈতিক সহযোগীর মধ্যে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য এক ব্যক্তি ছিলেন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পটিয়ার ভাটিখাইন গ্রামের ইংরেজি শিক্ষিত অতি সম্ভ্রান্ত পরিবারের কৃতী সন্তান কেদারনাথ দাশগুপ্ত। কেদারনাথের নিজস্ব ঠিকানা ছিল কর্ণওয়ালিস স্ট্রিটের কাছাকাছি ৩৭ নং শিবনারায়ণ দাস লেন। ‘লক্ষীর ভাণ্ডার’ নামে দোকান বসানোয় কেদারনাথ এবং সরলাদেবীর উদ্যোগে প্রেরণা যুগিয়েছিলেন অনুশীলন সমিতির কোষাধ্যক্ষ, রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
দোকান তো হল, তবে কেদারনাথের বাসনা যে সোনার বাংলা গড়ার! তাই কেদারনাথ পরিকল্পনা করলেন একটি বিপ্লবী পত্রিকা প্রকাশের। পত্রিকার নাম দিলেন ‘ভাণ্ডার’। এমন একটি পত্রিকা, যেখানে চিন্তনযোগ্য বিষয় নিয়ে দেশের যোগ্য ব্যক্তিদের মতামত প্রকাশিত হবে। এমন স্বপ্নের পত্রিকা বাস্তবায়িত করতে দরকার ছিল এক খ্যাতনামা সম্পাদকের এবং সে সময় সম্পাদকের আসনে বসতে, রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কেই বা যোগ্য ছিল। ‘ভারতী’, ‘বালক’, ‘সাধনা’, ‘বঙ্গদর্শন’ ইত্যাদি সম্পাদনা করে রবীন্দ্রনাথ তখন সম্পাদনা কর্মে ছিলেন অত্যন্ত পটু।

আরও পড়ুন -  যৌবনকাল

(ক্রমশঃ)

স্বদেশ-সম্পাদনা-রবীন্দ্রনাথ 3