গল্প- বিজয়া দশমী

164

গল্প- বিজয়া দশমী 1 ✍️কলমে: সুচরিতা চক্রবর্তী

হাসপাতালে কাজ করে তিন্নি। এ এক গুরু দায়িত্ব। ইমোশন থেকে পার্বণ কিছুই এখানে মূল্যবান নয়। পুজোয় মাত্র দু’দিনের ছুটি নিজেরা এডজাস্ট করে করে নেয়। এবার দু’দিন ছুটিতে একদিনও অনির্বাণ আসতে পারেনি । কী এত কাজ ওর বুঝতে পারে না তিন্নি। সম্পর্ক টিকে আছে শুধু এডজাস্টমেন্টের ওপর। তিন্নির অভ্যেস হয়ে গেছে অনির্বাণের আচরণ।
আজ বিজয়া দশমী। ছুটি শেষ। কেমন একটা বিষণ্ণতা চারপাশে তা ঠিক নয়, কখন যে এলো আর চলে গেল! রোজ যেমন লাগে আজও তাই, শুকনো ঘাসে ফড়িং উড়ছিলো, বারান্দায় রোদ পড়েছিলো, বিড়াল বাচ্চাটা হাপুস- হুপুস করে খেলা করছিলো, বকুল গাছ থেকে দু ‘চারটে ফুল পড়েছিল রাস্তায়। বকুল ফুল খুব প্রিয় তিন্নির। সেখানেও একটা এডজাস্টমেন্ট দেখতে পায় তিন্নি। এত ছোট ফুল, গন্ধের তেমন মাদকতা নেই কেউ -কাউকে উপহারও দেয় না শুধু গাছ ভরে ফুটে ঝরে পড়া। একান্ত প্রেমিক না হলে দুটো কুড়িয়ে নেয় না কেউ।

তিন্নির ইচ্ছে হলো আজ বিজয়া দশমীর এই আবেগ থেকে সরে থাকবে , তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লো হসপিটাল থেকে। হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা দূরে চলে গেলো একেবারে উল্টো রাস্তায়। বাড়ি ফিরতে মন চাইছে না আজ। হাঁটতে হাঁটতে অনির্বাণের কথা ভাবছে, এখন যদি পেছন থেকে হন্ত -দন্ত হয়ে এসে হাতটা ধরে বলে কখন থেকে হসপিটালের বকুল গাছের নিচে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি, কখন চলে এসেছো?

আরও পড়ুন -  উত্তর প্রদেশের কনৌজে ভয়াবহ দুর্ঘটনা, বাসে আগুন লেগে ঘুমন্ত অবস্থায় পুড়ে ছাই ২০ যাত্রী

অবান্তর চিন্তা। ও তো উল্টো রাস্তায় এসেছে। অনির্বাণ কী করে জানবে? তাছাড়া আজ তো ওর স্পেশাল পার্টি। না কোনো পুজোর গন্ধ আসছে না এখানে। কাছেই একটা টেম্পোরারি হোটেল দেখলো তিন্নি। টিনের ছাউনি, দু ‘চারটে বেঞ্চ আর টেবল পাতা আছে। বেঞ্চে বসে পড়লো ধপ করে।
— কী খাবার আছে মাসি ?
মাঝবয়সী এক মহিলা কিছু একটা রান্না করছে।
—-বললো, ভাত নেই, একটু দেরী হবে।
—-তা হোক আমার তাড়া নেই।
—-শুধু ডিম ভাত হবে।
—আচ্ছা, তাই সই। আমি বসি তুমি রান্না করো।
একটা পাতলা গোছের লোক হাতে হাতে সাহায্য করছে। এখানে বিজয়ার কোনো ছোঁয়া নেই। ভালো লাগছে তিন্নির। আজকাল জাহাজ বিহীন বন্দর, ভেঙে যাওয়া মেলা, জনহীন রাস্তা বেশি ভালো লাগে তিন্নির। একান্ত নিজের লাগে নিজেকে।
সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে সামনে এলো কাগজের থালায় ধোঁয়া ওঠা ভাত, কুদরীর তারকারি আর ডিমের ঝোল।
কী যে ভালো লাগছিলো, আজ নিজেকে সে সরিয়ে এনেছে বিষণ্ণতা থেকে, উৎসব থেকে, অনেক আহ্লাদ থেকে। বকুল ফুল ঝরছে, বিড়াল খেলছে নিজের নিয়মে। সত্যি তো নিজের একটা নিয়ম আছে। কিছুতেই তা অনিয়ম করা যাবে না। এ নিয়ম কারো জন্য থেমে থাকবে না। তিন্নি দূর থেকে শুনতে পাচ্ছে দুগগা ঠাকুর মাইকি জয়.. ।
ভাতের থালায় দেখতে পাচ্ছে বোধন থেকে বিসর্জন।
আজ এই সরে আসা কাল তিন্নিকে টেনে নিয়ে যাবে জনস্রোতে। এও কালের অমোঘ নিয়ম।। এও এক এডজাস্টমেন্ট।।

গল্প- বিজয়া দশমী 2