স্বদেশ-সম্পাদনা-রবীন্দ্রনাথ

116
স্বদেশ-সম্পাদনা-রবীন্দ্রনাথ 1

স্বদেশ-সম্পাদনা-রবীন্দ্রনাথ 2✍️কলমে: অরূপম মাইতি

(পর্ব–৮)

স্বদেশ-সম্পাদনা-রবীন্দ্রনাথ 3

সাল ১৯০১ বঙ্গাব্দ ১৩০৮ পৌষ ৭। ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ নামে বোলপুরে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত বৃত্তিমুখী শিক্ষার পরিবর্তে ব্যবহারিক শিক্ষার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের মনের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ সাধন। প্রাচীন ভারতের তপোবন বিদ্যালয় থেকে তিনি এমন বিদ্যালয়ের আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন। বিদ্যালয়ের প্রথম পাঁচজন ছাত্রের অন্যতম ছিলেন পুত্র রথীন্দ্রনাথ। ১৯১৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর তিনি বিশ্বভারতীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। এরপর ১৯২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর (১৩২৮ বঙ্গাব্দের ৮ পৌষ) রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতিতে আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল বিশ্বভারতীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
বিশ্বভারতীর আদর্শ প্রচার এবং বিশ্বভারতীর সাথে দেশ-বিদেশের সম্বন্ধ রক্ষার তাগিদে একটি ইংরেজি পত্রিকার প্রয়োজন, রবীন্দ্রনাথ অনেক দিন থেকে অনুভব করছিলেন। এই উদ্দেশ্যে ১৪ এপ্রিল ১৯২৩ প্রকাশিত হল ‘দ্য বিশ্ব-ভারতী কোয়ার্টার্লি’। ত্রৈমাসিক এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যা সম্পাদনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ৮২ পৃষ্ঠার পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতে মোট ৯টি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। এর মধ্যে তাঁর নিজের লেখা ছিল ৫টি। সেগুলি হল ১। ‘Visva-Bharati’ ২। ‘My nest weary wings fluttered (Poem)’ ৩। ‘Tumultuous years being their voice (Poem)’ ৪। ‘A Vision of India’s history’ এবং ৫। ‘Creative Unity’।
প্রথম সংখ্যা প্রকাশের পরে বিশ্বভারতীর কাজে রবীন্দ্রনাথ খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বাধ্য হয়ে পত্রিকা সম্পাদনার ভার পড়ে ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে। সুরেন্দ্রনাথ সম্পাদনার দায়িত্ব থাকলেও রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে পত্রিকা চালাতেন। ‘দ্য বিশ্ব-ভারতী নিউজ’ এবং কোয়ার্টার্লিতে রবীন্দ্রনাথের মূল ইংরেজি রচনা ছাড়াও, নিজের লেখার নিজের অনুবাদ, অন্যের লেখার অনুবাদ এবং নিজের লেখার অন্যের অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে।

আরও পড়ুন -  রাধাসায়র -২১

‘সাধনা’ থেকে শুরু করে ‘বিশ্বভারতী কোয়ার্টার্লি’ এই ছ’টি সাময়িক পত্রিকায় পাঠক সমাজ বিস্তৃত রূপে রবীন্দ্রনাথকে সম্পাদক রূপে পেয়েছিলেন। তবে এছাড়াও সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য রবীন্দ্রনাথ কোন কোন সময় অন্যান্য পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। যেমন, ‘হিতবাদী’ ।
তখন তাঁর বয়স ৩১ বছর কয়েক দিন। রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক নিযুক্ত করে বঙ্গাব্দ ১২৯৮ ১৭ জৈষ্ঠ শনিবার, কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘হিতবাদী’ প্রকাশ করেন। রবীন্দ্রনাথের বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথের জামাতা এবং হেমলতা দেবীর দাদা মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায় ছিলেন পত্রিকার রাজনৈতিক বিভাগের সম্পাদক।

আরও পড়ুন -  রাগ

হিতবাদী প্রকাশের আঠাশ দিন পূর্বে ‘দ্য বেঙ্গলী’ নামে একটি ইংরেজি পত্রিকায় হিতবাদী প্রকাশের বিজ্ঞাপনে সম্ভাব্য প্রধান লেখকদের তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল। তালিকায় নাম ছিল রমেশচন্দ্র দত্ত, কালীপ্রসন্ন ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত, মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায়, ডাঃ যদুনাথ মুখোপাধ্যায়, ডাঃ অমূল্যচরণ বসু, আশুতোষ চৌধুরী, পণ্ডিত কালীবর বেদান্তবাগীশ ও স্বর্ণকুমারী দেবী। প্রথম বিজ্ঞাপনে বঙ্কিমচন্দ্রের নাম না থাকলেও ‘দ্য বেঙ্গলী’-তে প্রকাশিত পরের বিজ্ঞাপনে লেখা হয় ‘We have been requested to announce that Babu Bankim Chandra Chatterjee has kindly consented to contribute on religious subjects only to the Hitabadi.’
হিতবাদীর সাহিত্য বিভাগের সম্পাদনা ভার গ্রহণের পূর্বে বন্ধু শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে একটি পত্রে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন
“আমাদের হিতবাদী বলে একখানি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র বেরোচ্চে। একটি বড় রকমের কম্পানি খুলে কাজে প্রবৃত্ত হওয়া যাচ্চে। ২৫০০০ টাকা মূলধন। ২৫০ টাকা করে প্রত্যেক অংশ এবং একশ অংশ আবশ্যক। প্রায় অর্দ্ধেক অংশের গ্রাহক ইতিমধ্যেই পাওয়া গেছে। কৃষ্ণকমল বাবুকে প্রধান সম্পাদক, আমাকে সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক এবং মোহিনীকে রাজনৈতিক সম্পাদক নিযুক্ত করা হয়েছে। বঙ্কিম, রমেশ দত্ত প্রভৃতি অনেক ভাল ভাল লোক লেখায় যোগ দিতে রাজি হয়েচেন। যাই হোক, ইতিমধ্যে দু’তিন মাসের লেখা আমার হাতে জড় না হলে আমাকে ভারি মুস্কিলে পড়তে হবে। আবার কথা হয়েছে প্রতি সংখ্যায় একটা করে ছোটোগল্প থাকবে। তোমাকে এই সঙ্কটের সময় আমার সহযোগিতা করতে হচ্চে। গুটিকতক বেশ ছোট লঘুপাঠ্য সাহিত্য প্রবন্ধ পাঠাতে হচ্চে।…এই প্রসঙ্গে আর একটা খবর দেওয়া আবশ্যক – লেখকেরা কাগজের অংশ থেকে কিছু পরিমাণ পারিতোষিক পাবেন -…আর যদি এক আধটা Share নিতে ইচ্ছুক হও তাও আমাকে লিখো।”
পত্রাংশ পড়ে বোঝা যায়, হিতবাদীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ মানসিক রূপে খুব বেশি জড়িয়ে পড়েছিলেন। লেখা জোগাড় ছাড়াও তাঁকে পত্রিকার মূলধন সংগ্রহের জন্য শেয়ার বিক্রয় এবং সম্ভাব্য গ্রাহক-পাঠক সংগ্রহেও নজর রাখতে হয়েছিল।
(চলবে)