একটি হলুদ রবিবারে

199
একটি হলুদ রবিবারে 1

একটি হলুদ রবিবারে 2✍️কলমে: আশিস মিশ্র

(পর্ব-২৪)

একটি হলুদ রবিবারে 3

একটি হলুদ রবিবারের ২৫ পর্ব হতে চললো। না, আর নয়। তার আগে রবিবারে হেমন্তের হলুদ আড্ডায় প্রবেশের পর পুরনো কিছু স্মৃতি মনে পড়ে যায়। এই স্মৃতিলেখাটি কিছুটা কল্পকাব্য কিছুটা বাস্তব।

গ্রামের রাস্তা তখনও মোরাম বা কংক্রিটের হয়নি। বর্ষায় কাদা ঘেঁটে, মাঠের জল ঝাপটে স্কুলে যেতাম পাড়ার ১০- ১৫ জন ছেলেমেয়ে। ভয়,আনন্দ সবই থাকত। দেখতে দেখতে শরৎ এসে উঁকি দিত আকাশে। সেই নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ, মাঝে মাঝে বৃষ্টি, ধানের বিস্তৃত মাঠ, শীত শীত হাওয়া, পুজো পুজো গন্ধ, রাস্তায় নোনা মাটি জড়ো করে বল খেলা– এসব চলত। দেখতে দেখতে ধান শিস, কুয়াশা,কার্তিকের হাল্কা শীত — বুঝতেই পারতাম না হেমন্ত কখন হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়েছে বসুন্ধরার বিছানায়। দু’ জনেই তখন হালকা কম্বল জড়িয়ে রাত কাটাচ্ছে। সকালে উঠে শিশির ভেজা ঘাসে হাঁটছে। কারুর বিরুদ্ধে কারুর কোনো অভিযোগ নেই। কী মধুর সম্পর্ক তাদের। মাঝে মাঝে শুধু চিঠি লেখা। খাতায় কালিতে রঙে তুলিতে কত লেখা, ছবি আঁকা। মোবাইল, ল্যাপটপ,কম্পিউটারে তাদের কোনো ডট কম নেই। তখনও তাদের কোনো অরকুট, ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার নেই। ই- মেলও নেই। এসব যখন এলো, তখন হেমন্ত ও বসুন্ধরার সম্পর্কের জটিলতা বাড়ল। আস্তে আস্তে হেমন্তের গ্রামে এলো প্রযুক্তি বদলের ছায়া, নগরায়নের ঢেউ, বাণিজ্য – সংস্কৃতি, বাজার, পোশাক ও শরীর প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা, বসবাস,শিক্ষা ও খাদ্যের অস্থিরতা–সেখানে হেমন্তকে কেই বা খুঁজে দেখবে?

অগত্যা হেমন্তকে খুঁজতে শান্তিনিকেতন। সোনাঝুরি, খোয়াই হাট,আম্রকানন, বাউল,ভুবনডাঙার মাঠে বসে কার্তিকের চাঁদ দেখতে দেখতে দু’ কলি মনে না পড়ে তো উপায় নেই। ” আমলকি বন কাঁপে যেন তার/ বুক করে দুরু দুরুদুরু / পেয়েছে খবর পাতা খসানোর /সময় হয়েছে শুরু।”
এই খানে একদিন রবিগান গাইতে গাইতে হেঁটে যাচ্ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, রামকিঙ্কর বেইজও ছিলেন আড়ালে। শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলছেন — “হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান ঘুরতে দেখেছি অনেক / তাদের হলুদ ঝুলি ভরে গিয়েছিলো ঘাসে আবিল ভেড়ার পেটের মতন/ কত কালের পুরোনো নতুন চিঠি কুড়িয়ে পেয়েছে / এই হেমন্তের অরণ্যের পোস্টম্যানগুলি/…. / একটি চিঠি হাতে অন্য চিঠির দূরত্ব বেড়েছে কেবল/ একটি গাছ হতে গাছের দূরত্ব বাড়তে দেখিনি আমি। ”
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কি থেমে থাকতে পারেন? তিনিও বললেন –” রেখা ও অক্ষর থেকে রক্তমাংসের সমাহার / তাঁকে নিয়ে গেল অরণ্যের দিকে / ছেলেবেলার বাতাবি লেবু গাছের সঙ্গে মিশে গেল/ হেমন্ত দিনের শেষ আলো। ”

ছেলেবেলার স্মৃতি যৌবনে এসে পরিপক্ব হলো যখন, তখন পৌঢ়ত্বের ছায়া গ্রাস করছে। মনে হলো শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, জীবনানন্দ দাশ হেমন্তকে নিয়ে কতো চরণ লিখে গেছেন। প্রায় প্রতিটি কাব্যে হেমন্তের চিত্রকল্প ধরা দিয়েছে নানা ভাবে। আর শক্তি – সুনীল – বিনয় হেমন্তে ভাসবেন না, এ তো হতে পারে না। মনে পড়ে যায় ‘ ঝরা পালক ‘ -এর ‘ কবি’ কবিতাটি।
–” হেমন্তের হিম মাঠে, আকাশের আবছায়া ফুঁড়ে / বকবধূটির মতো কুয়াশায় শাদা ডানা/ যায় তার উড়ে.. “।
তখনও রাত্রি গভীর হয়নি। মধ্য অঘ্রাণের নক্ষত্ররা মিটমিট করে জ্বলছে আবছা আকাশে। হঠাৎ বসুন্ধরার ফোন হেমন্তকে। বসুন্ধরা বলে চললো —
” তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি অঘ্রাণের সুবাতাস এই সব গাছ পালা নাড়ে / নিজের মতন ক’ রে মনের মতন ক’রে নেড়ে এলোমেলো ক’রে যায় “।
(চলবে)