একটি হলুদ রবিবারে -৩

389
একটি হলুদ রবিবারে -৩ 1
একটি হলুদ রবিবারে -৩ 2

একটি হলুদ রবিবারে -৩ 3✒️কলমে: আশিস মিশ্র।                                                     পর্ব –দুই                                              ৫৩ দিন পর। আমাদের ব্রজলালচক হাইরোড বাজারে গেলাম। সন্ধে ছটা। আজ ১৭ মে। ভয়ে ভয়ে ঢুকলাম একটি এ টি এম কাউন্টারে। মুখে মাস্ক। পকেটে স্যানিটাইজার। সামান্য টাকা হাতে পেয়েই টাকার শরীরে মাখিয়ে দিলাম সেই স্যা- তরল। সাইকেলের চাকা গড়িয়ে গেল পশ্চিম দিকে। হলদিয়ার প্রবেশ দ্বারে গেটের তলায় বাপুজির দন্ডায়মান ভাস্কর্য দেহ। তার কাছে গিয়ে নানা রকম ভাবলাম। সামাজিক দূরত্ব অটুট থাকলেও সব তো খোলা। জনস্রোত চতু্র্দিকে। রাস্তায় পা ফেলতে ভয় পাচ্ছি। যেখানে পা ছুঁয়ে যাবে, সেখানেই তো থুতু আর পানের, গুটকার পিক। হায় নির্মল বাংলা। মানুষ বড়ো অসভ্য! মানুষ বড়ো কাঁদছে…।একটি হলুদ রবিবারে -৩ 4কতদিন পর কবি শিশির বিন্দু দত্তর ধুমকেতু কক্ষে ঢুকলাম। আজ রবিবারের আড্ডার কোনো বিষয় ছিলো না। শুধু নিজেদের দাড়ি গজিয়ে যাওয়া মুখগুলি দেখবো বলে আসা। মাত্র ওরা তিন। শিশির,বিক্রম ও সৌরব্রত। স্যানিটাইজারে হাত ধুয়ে বসলাম। ততক্ষণে ওরা গেয়ে উঠলো ” এরে ভিখারী সাজায়ে কি রঙ্গ তুমি করিলে..”।

ইংলিশ পেরুজালের ক্লাস বন্ধ। স্বপ্নের কোচিং সেন্টার গৌরাঙ্গ মোহন পালের( শিশির বিন্দু দত্ত)। অগত্যা অন লাইনে সে ক্লাস টেনে নিয়ে চলছে। তাকে কি মনের স্বাদ মেটে? ছাত্র – ছাত্রীরা সামনে না বসলে পড়িয়ে কি শান্তি পাওয়া যায়? এমে বি এড পাশ করে টিউশন করেই তাকে বাঁচতে হয়। বাঁচাতে হয় পরিবারকে। এস এস সি তে পাশ করেও তার স্কুলে চাকরি টা হলো না। সে ও এক রহস্য। আড়ালের ঘটনা কেবল ভুক্তভুগিরাই জানে।

একটি হলুদ রবিবারে -৩ 5

বাকি দুজন একটা জব করলেও হতাশ। মনের শান্তি নেই। এই হতাশা হাজার হাজার যুবক – যুবতীর। উচ্চ শিক্ষিত সব বেকার। আগামী দিন কী হবে, সেই চিন্তায় ঘুম উধাও। তাই মন ভালো রাখতে রবিবারের আড্ডা ও গানের ব্যান্ড চালানো। কথায় কথায় সৌরব্রত বললো, সেই সব ব্যান্ড আর কোথায়? বেশির ভাগ তো” কপি ব্যান্ড”। আর আমাদের কলেজের এক সিনিয়র দিদি বলতেন, রবীন্দ্র সংগীত চর্চার থেকে গান শোনে বেশি। চর্চা করা আর শোনার মধ্যে অনেক তফাৎ। বিক্রম সব শোনে আর মাথা নাড়ে। তাকে ছুঁয়ে যায় লালনের গান। সে গেয়ে ওঠে –” খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।” আমরা চারজনেই গলা ছাড়লাম এবার। আড্ডা জমে গেলো।

রাত আটটা। আলো -অন্ধকারে সাইকেলের চাকা আমার দ্রুত গড়িয়ে চলেছে বাড়ির দিকে। রাস্তার মাঝখানে প্রশাসনের বেড়া। কারণ হাইতি বাড়ির সেই ব্যবসায়ী করোনা আক্রান্ত হয়ছিলো।ভালো আছে শুনেছি । তাদের কেউ কেউ এখনো হাসপাতালে। তাই আমার চেনা রাস্তাও আজ বদলে গেছে। অগত্যা পাশের রাস্তা। স্ট্রিট লাইটের আলোয় কেমন রহস্যময় সেই রাস্তাটি৷ তাকেও আমার সন্দেহ। ভাইরাসের ভয়।

সেই ভয়। না। ভয় পেয়ো না বাবা। গৌরাঙ্গকে ক্লাস নাইনে এ কথা বলেছিলেন বাংলার স্যার চিত্তরঞ্জন দাস। তিনি লকডাউনের মধ্যেই পরলোকে চলে গেছেন। তাঁর কথা আমি বা গৌর ভুলতে পারিনি। গৌররের গান – জীবন চিত্তবাবুই যেন বেঁধে দিয়ে গেছেন। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় গীতি আলেখ্য করিয়ে ছিলেন ছাত্র – ছাত্রীদের নিয়ে। তাতে গৌরকে দিয়ে চিত্তবাবু দুটি গান তুলিয়ে ছিলেন। একটি গান” বড় আশা করে এসেছি গো কাছে ডেকে লও”। অন্যটি ” এরে ভিখারী সাজায়ে কি রঙ্গ তুমি করিলে..। ” গৌর গাইতে পারলো না। এক চড় কষিয়ে দিলেন চিত্তবাবু। বললেন,রবীন্দ্র সংগীতে অতো ঘাড় নড়বে না। সোজা দাঁড়িয়ে বা বসে গাইতে হয়। আবার চেষ্টা কর তুই পারবি।

চড় দিয়ে চিত্তবাবুর মন খারাপ লাগছিলো। তিনি পরে এসে সাত্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, তুই পারবি। গৌর পেরেছিলো। ওই কঠিন গান। আলেখ্য শেষে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন চিত্তবাবু। চোখের কোণে তখন আনন্দ – অশ্রু গুরু শিষ্যর। আর সেদিনই চকদ্বীপা হাইস্কুলের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে গৌরকে যে মেয়েটি প্রেম নিবেদন করেছিলো সে কি এখন সব ভুলে গেছে? সব স্মৃতি কি ভোলা যায়? (চলবে)