কুলাঙ্গার

152

কুলাঙ্গার 1✒️কলমে: রুমা সরকার বসু

সপাটে একটা চড় পড়লো প্রদীপ্তর গালে। কুলাঙ্গার ছেলে….. মাত্র চল্লিশ! তোর দাদা যে অংকে একশোয় একশো পেয়েছিলরে হতভাগা। মানসন্মান আর কিছুই রইলনা।
একচোখ জল নিয়ে মাধ্যমিকের মার্কশীট হাতে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে প্রদীপ্ত। ঘরের দেওয়ালে টাঙানো ছবি থেকে মনীষীরাও যেন করুণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে।
যে ঘরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে প্রদীপ্ত সেই ঘর অনেক ইতিহাসের সাক্ষী। ওর বাবা স্কুল শিক্ষক অনিমেষবাবু এই ঘরেই ছাত্র পড়ান। অনেক ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার তৈরীর নেপথ্যের কারিগর তিনি। এখানে পড়েই দাদা সুদীপ্ত মাধ্যমিকে জেলায় দ্বিতীয়। আজ সে একজন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার। সুদীপ্তর এমবিবিএস পাশের খবরে গর্বে বুক ভরে গিয়েছিল অনিমেষবাবুর। শুভেচ্ছা অভিনন্দনের বন্যায় সেদিন ছেলের সাথে তিনিও ভেসে গিয়েছিলেন। ছেলেকে উপযুক্ত করে তোলার আসল কৃতিত্বতো তারই।
ভুল ভেঙে ছিল বছর দশেক পরেই। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে এক নার্স কে বিয়ে করে সেখানেই থিতু হয়েছে সুদীপ্ত। একটি মেয়েও হয়েছে তাদের। সে এই পুয়োর কান্ট্রিতে আর ফিরতে চায়না।
প্রদীপ্ত স্কুল কলেজের গন্ডি সাধারণ ভাবে পেরিয়ে বর্তমানে এক বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত। বিয়ে করেছে। ছেলে টুবলুর বয়স পাঁচ।
বয়সের ভারে অনিমেষবাবু টিউশনি বন্ধ করেছেন। পড়ানোর ঘরে বসে কাগজ পড়ে আর স্মৃতি রোমন্থন করে দিন কাটে তার। সেদিন কাগজ পড়তে পড়তে দেশের অবস্থা দেখে আপন মনেই বলে ওঠেন – চোর জালিয়াতে সব ভরে গেছে… এই জন্যই এ পোড়া দেশে কেউ থাকতে চায়না। টুবলু পাশে বসেই খেলছিল। সে উঠে দাঁড়িয়ে বলে- এমন কথা বলতে নেই দাদুভাই, দেশকে ভালোবাসতে হয়.…… আমার ভারত মহান।
– এইকথা তোমাকে কে শিখিয়েছে দাদু? অনিমেষবাবু জিজ্ঞাসা করেন।
– আমার বাবা।
অনেক বছর পরে অনিমেষবাবুর গালে পুরনো চড়টা সপাটে এসে পড়লো। কুলাঙ্গার ছেলের প্রতি গর্বে প্রৌঢ় মানুষটির দুই চোখ জলে ভরে আসে।

কুলাঙ্গার 2
আরও পড়ুন -  দ্বৈধ