স্বদেশ-সম্পাদনা-রবীন্দ্রনাথ

114

স্বদেশ-সম্পাদনা-রবীন্দ্রনাথ 1✍️কলমে: অরূপম মাইতি

(২য় পর্ব)

কেদারনাথের স্বপ্ন সাকার করতে রবীন্দ্রনাথ স্থির করলেন, ‘ভাণ্ডার’ হবে ‘সমকালীন আন্দোলনের আরশি, যেখানে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে পাওয়া যাবে আন্দোলনের প্রেক্ষিতে উত্থিত জিজ্ঞাসার জবাব, স্থির করা যাবে দেশের লক্ষ্য, নির্ণীত হবে বাঙালীর গন্তব্য’। ‘ভাণ্ডার’-এর পাতায় মুদ্রিত হতে শুরু করল প্রশ্নোত্তর, আলাপ-আলোচনা প্রমুখ। বিষয়বস্তুর বৈচিত্র ছিল কাঙ্খিত। পত্রিকার পাতায় প্রশ্ন উঠল, শিক্ষার আদর্শ দুরূহতর ও পরীক্ষা কঠিনতর হওয়া ভাল না মন্দ? প্রশ্নের উত্তর দিতে আসরে নামলেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, হেরম্বচন্দ্র মৈত্র, জগদীশচন্দ্র বসু, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, মোহিতচন্দ্র সেন প্রমুখ। তত দিনে বাংলায় স্ত্রীশিক্ষা অর্ধশতকাল অতিক্রান্ত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছিল, স্ত্রীশিক্ষায় পরিবর্তন আবশ্যক কি না! উত্তর দিয়েছিলেন জ্ঞানেন্দ্রশশী গুপ্ত ও শরৎকুমারী। স্বদেশি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছিল, সাংবিধানিক আন্দোলনের প্রণালী পরিবর্তন আবশ্যিক কি না! জবাব দিয়েছিলেন বিপিনচন্দ্র পাল, অজিতকুমার চক্রবর্তী, প্রমথনাথ চৌধুরী প্রমুখ।
‘ভাণ্ডার’ পত্রিকা চলেছিল দু বছর তিন মাস। সম্পাদক রবীন্দ্রনাথকে সহায়তা করতে দ্বিতীয় বছর থেকে সহকারী সম্পাদক হয়েছিলেন প্রমথ চৌধুরী। প্রকাশক ছিলেন কেদারনাথ স্বয়ং। এত কিছু স্বত্ত্বেও ‘ভাণ্ডার’ পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। এ পত্রিকাতে রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটি স্বদেশি গান প্রকাশিত হয়েছিল। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’, ‘ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে’, ‘বিধির বাঁধন কাটবে তুমি’ ইত্যাদি। পত্রিকার পাতায় শুধু যে স্বদেশি চিন্তার প্রতিফলন হত, তা নয়, সমকালীন বিশ্বের হাল-হকিকত জানতে ‘ভাণ্ডার’ পত্রিকায় নিয়মিত বিলাতি পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন রচনার অনুবাদ প্রকাশের ব্যবস্থা করেছিলেন সম্পাদক।
সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ ও প্রকাশক কেদারনাথের কাছে ‘ভাণ্ডার’ পত্রিকা চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল। আর্থিক সঙ্গতি যদিও প্রধান অসুবিধা ছিল, তবে নির্ভুল ছাপা এবং একই সঙ্গে পত্রিকার উৎকর্ষ বজায় রাখাও ছিল অসুবিধার আরও কারণ। তার সাথে পাল্লা দিয়ে সময়মত লেখা সংগ্রহ ও পত্রিকা যথাযথ বিপণনের কাজটিও ছিল বেশ কঠিন। পত্রিকা বিপণনের জন্য সম্পাদক দায়িত্ব দিয়েছিলেন ‘স্বদেশি ও সাহিত্যের বিপণনকুশলী’ বৈদ্য এ কে সেনগুপ্তকে। গ্রাহকদের কাছে ‘ভাণ্ডার’ পত্রিকাকে জনপ্রিয় করে তুলতে তিনি একটি কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। এমন একটি ব্যবস্থা যাকে বর্তমান আধুনিক বিপণন বিজ্ঞানে ‘ইনসেন্টিভ’ নামে অভিহিত করা হয়। ঘোষণা করা হয়েছিল যে ‘ভাণ্ডার’ পত্রিকার গ্রাহক হলে, বাজার দর থেকে টাকা প্রতি ১০ পয়সা কম মূল্যে গ্রাহকেরা প্রতি মাসে তিনটি ঘোষিত পণ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। ১৩১২ সালের বৈশাখ মাসে এমন তিনটি পণ্য ছিল ‘এরিয়ান হোসিয়ারির’ মোজা, ‘বেঙ্গল সোপ ফ্যাক্টরী’-র সাবান ও ‘পাইওনিয়ার কণ্ডিমেন্ট কোম্পানি’-র চাটনি সিরাপ!
পত্রিকা প্রকাশ নিয়ে প্রকাশক কেদারনাথ ও সম্পাদক রবীন্দ্রনাথের মধ্যে মত পার্থক্য ছিল। কেদারনাথের মধ্যে স্বদেশিয়ানার প্রতি উগ্র প্রবণতা কাজ করত। প্রকারান্তরে রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন জনমত তৈরি হোক আর তার জন্য তিনি চাইতেন পত্রিকার মান বজায় রাখতে। তিনি স্পষ্ট বলতেন, “কোনও ব্যক্তি বিশেষ, সম্প্রদায় বিশেষ বা সম্পাদকের মত প্রচারের উদ্দেশ্যে ‘ভাণ্ডার’ প্রকাশ করা হইতেছে না। এই পত্রে দেশের মনস্বী কৃতী ব্যক্তিদের মত সম্পূর্ণ অপক্ষপাতের সহিত বাহির করা হইবে….।“
(ক্রমশঃ)

স্বদেশ-সম্পাদনা-রবীন্দ্রনাথ 2
আরও পড়ুন -  রাগ