যৌবনকাল

144
যৌবনকাল 1

যৌবনকাল 2✍️কলমে: দীপ মুখোপাধ্যায়

(পর্ব–৯)

যৌবনকাল 3

প্রেসিডেন্সি কলেজের উল্টোদিকে বইপাড়ার প্রবেশমুখে পনেরো নম্বর বঙ্কিম চাটুজ্জে স্ট্রিটের একটি সুপ্রাচীন বাড়ির সঙ্গে আমার সম্পর্ক সেই বাল্যকাল থেকেই। স্কুলের জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকতাম ফ্যালফ্যাল করে। হিন্দু স্কুলে তখন সবে ক্লাস নাইনে। ফুলপ্যান্ট পরলেও সেই রহস্যময় বাড়িতে মোটেই ঢোকার সাহস ছিল না। তবু একদিন বুক ঠুকে এক সহপাঠীকে সঙ্গী করে কয়েকটা সিড়ি ডিঙিয়ে উঠে পড়লাম সরাসরি দোতলায়। নজরে এল অবিন্যস্ত গ্রাফিত্তির মতো দেয়ালে হরেকরকম রাজনৈতিক পোস্টার সাঁটা। বড় বড় কাঠের জানলা।মৌমাছির মতো গুনগুন থামার লক্ষণ নেই।বুঝলাম,শব্দটা উচ্চকিত আড্ডার বাচিক প্রতিধ্বনি।সবুজ ব্যান্ড লাগানো সাদা উর্দিধারী টুপি পরা ওয়েটাররা এই টেবিল থেকে সেই টেবিলে ব্যস্ত।একটাই ছবি টাঙানো। বাল্মীকি প্রতিভার রবিঠাকুরের। সিগারেটের ধোঁয়ায় তখন চোখ জ্বলছে।এটাই আমার যৌবনকালের রাঁদেভু অ্যালবার্ট হল। থুড়িথুক্কি কলেজ স্ট্রিট কফিহাউস। এখানকার চুম্বক আকর্ষণ সাদা পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে চুটিয়ে আড্ডা মারা। মধ্যবিত্তের সেই সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিলাম অশান্ত সত্তর দশক থেকেই।মান্নাদের গাওয়া গানের চরিত্রগুলোর মতো আমিও আলাপিত হয়েছিলাম কয়েকজন আড্ডাজীবীর সঙ্গে।ভিন্ন নামে নিখিলেশ,মঈদুল,রমা রায়,অমল বা সুজাতাকে খুঁজে পেতে দেরি লাগেনি। আউট অফ ফোকাস হতে দেখেছি অনেক অগ্রজ সুহৃদবৃন্দদের।কেউ গেছেন তো নতুন কেউ ফের এসেছেন।যৌবনকালের স্পন্দন ও প্রবাহের মধ্যে অতিজীবিত হয়ে আছে এককাপ আড্ডাঘর। এই হ্যাংআউট শুধুমাত্র কবি সাহিত্যিকদের ঠেক ছিল না। ভাবুক পড়ুয়া,উঠতি অভিনেতা থেকে শুরু করে অতিবিপ্লবীদেরও ছিল নিয়মিত আনাগোনা। বহু ঘটনার ওপর যেমন সময়ের ধুলো জমে যায় অনেকেই তেমনি হারিয়ে যান বিস্মৃতির অতলে। কেউ বা আবার সময়ের বিষ্মরণকে জয় করে আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকেন। স্মৃতির অ্যালবামে টুকরো-টাকরা ছবিগুলো তাই সংযোজিত হয়। কফিহাউসের সঙ্গে যোগাযোগময়তা বেড়ে গেল কয়েকটি বানিজ্যিক পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হবার পর। তখন যত সঙ্গ তত বিহঙ্গ। উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকা যায় ঘটাং ঘটাং শব্দ করা আদিম সিলিং ফ্যানগুলোর দিকে।পোষাকের বিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। মেয়েদের সাজগোজ দেখা যায়। এমনকী ব্যক্তিজীবনের ঊর্ধ্বে নিজেকে তুলেও ধরা যায়। উচ্চকন্ঠ অগ্রাহ্য করে পাখার হাওয়া খেতে খেতে দিবানিদ্রার আহ্লাদ অবধি নিতে দেখেছি অনেককে। ওয়েটাররাও নিয়মিত অভ্যেসে বলতেন,দাদা টাইম হয়ে গিয়েছে। এবার ঝাঁপ বন্ধ হবে।আমার তাতে কী এসে যায়? নিষ্ক্রমণের গোপন পথটাও জানা ছিল যে। এখানে কালাতিপাত করে চিন্তাকে স্বপ্নের জগতে উত্তীর্ণ করার ধনাত্মক দিকগুলো এতই প্রোজ্জ্বল যে উৎক্ষিপ্ত স্বরলিপি ও বহুবাচনিক চিন্তামালাগুচ্ছ সম্ভাব্যতার নন্দনতত্ত্ব বলে মনে হত। ব্যক্তির যাথার্থ,প্রজ্ঞা ও প্রয়াসের এ যেন এক চেতনাতাড়িত সংশ্লেসপীঠ। এখানে হৃৎ-খাদ্যের চাষও রীতিমতো উচ্চফলনশীল। অসংখ্য ভাবনা ও দর্শনের তত্ত্ব-উপাত্ত ধারাবাহিক সৃষ্টিশীলতায় জারিত হয় দূরন্ত মশগুলে। কফিহাউসের একটি বিভাজন প্রসঙ্গ অবগত করি। দো-তলার আদরের নাম ছিল হাউস অফ কমন্স। তিনতলাটার হাউস অফ লর্ডস।কবি-সাহিত্যিকরা হাউস অফ কমন্সেই আড্ডা দিতেন। এখানেই দেখা যেত একমাথা রুক্ষ চুল পাজামা-পাঞ্জাবি আর কাঁধে ঝোলা দোলানো চপ্পল পায়ে কিছু অহংকারী মুখ। হাউস অফ লর্ডসে খাবারের দাম কিঞ্চিৎ বেশি। এখানে আপাত নির্জনতা উপভোগ করতেন কিছু ঝকঝকে যুবক যুবতী এবং কলেজস্ট্রিটে বই কিনতে আসা পরিশ্রান্ত ও ক্ষুধাকাতর মানুষজন। তবে হাউস অফ কমন্স ছিল অনেক মুখর ও প্রাণবন্ত। কোল্ড কফি উইথ ক্রিম কিংবা হটমিল্ক কফি থাকলেও আমাদের আকর্ষণ ছিল ইনফিউশন বা স্ট্রং ব্ল্যাক কফি। পরিমানে এতটাই যে চারটে কফি অর্ডার দিয়ে সাতজনে পান করা চলে। কফিচক্রে অংশ নিতে ভাগাভাগি পর্বে জলের গ্লাস অতিদ্রুত ফাঁকা করতে হত।
শনিবাসরীয় দুপুর থেকেই কফিহাউস ফিরে আসত নিজস্ব মেজাজে।ভিড় দেখা যেত লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকদের ঘিরে। সদ্য ভূমিষ্ট পত্রিকার গন্ধে বিভোর আনকোরাজনের লেখক হবার প্রত্যাশা বৃদ্ধি হত।রোপন হত কাব্যকলমের চারাও। যারা একদিন বলিষ্ঠ সবুজাভ হয়ে ফলবান বৃক্ষ হবার স্বপ্নে। অনেক লিটিলম্যাগের সূচনা সংখ্যা থেকে সমাধি সংখ্যার আঁতুড়ঘর এই কফিহাউস। তবুও এই আড্ডাপীঠকে ঘিরে এক বিশাল শূন্যতা আমাকে অস্বস্তি দেয়।শহরের পারদলাঞ্ছিত আপখোরাকি নন্দন-সংস্কৃতির নিরিখে নিঃসীম ও অন্তহীন মনে হয়। কফিহাউস অনেক বোঝা বয়ে এখন ঈষৎ নুব্জ যেন। কিছুটা আবার বিচ্ছিন্ন। এ এক নেমেসিস। অসংখ্য সুহৃদ-পরিজন নিয়ে কফিহাউস-সংসার আমার অস্তিত্বের সঙ্গেই যেন সম্পৃক্ত। সেই পরিমন্ডলের দিকে পিছু ফিরলে অনেক মুখ ভেসে আসে। কোনওটি স্পষ্ট। কোনওটি আবার ঝাপসা। গুঁফো রামুদা বা মহম্মদ সাহাবুদ্দিনের উষ্ঞ স্মৃতি কল্পনার খাতায় বিষণ্নতার বোঝা হয়ে বুকে ধাক্কা মারে। অধুনা কফিহাউস-রিফিউজি বনে গিয়েছি। কিন্তু আরবান আমিটি কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে বারিষ্ঠা বা ক্যাফে কফি ডের দ্বারস্থ হইনা। পুরনো চেনামুখগুলো নাই বা মিলল। আহ্লাদি বাহারে সাজুগুজু করা আধুনিক কফিহাউসের দেয়ালপৃষ্ঠে আড্ডাসখাপ্রতিম রবিঠাকুর তো এখনও ঝুলছেন আমার অপেক্ষায়।

আরও পড়ুন -  মিথ্যা আস্ফালন

( চলবে)