স্বদেশ-সম্পাদনা-রবীন্দ্রনাথ

180
স্বদেশ-সম্পাদনা-রবীন্দ্রনাথ 1

স্বদেশ-সম্পাদনা-রবীন্দ্রনাথ 2✍️কলমে: অরূপম মাইতি

(পর্ব–৭)

স্বদেশ-সম্পাদনা-রবীন্দ্রনাথ 3

সাহিত্যাদর্শ, ধর্মভাবনা, স্বদেশবোধ ও সমাজ-সংস্কারের ক্ষেত্রে উনিশ শতকে যা উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছে, তার ভরকেন্দ্র ছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার। বাঙালীর মননকে গড়ে তুলতেও এই পরিবারের অবদান ছিল প্রভূত। মূলত ঠাকুর পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলার একাধিক পত্রিকা পাঠকের মনে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছিল। উনিশ ও বিশ শতকে প্রকাশিত এই সব পত্রিকা একদিকে রবীন্দ্রনাথের লেখা পেয়ে ধন্য হত, আবার রবীন্দ্রনাথও তাদের মান নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট থাকতেন। পরে পরে এসব পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বও তাঁকে নিতে হয়েছিল।

রবীন্দ্রজীবনী পাঠে জানা যায়, ‘সাধনা’-র জন্য তিনি সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকতেন। উড়িষ্যা, কলকাতা বা রাজশাহী, জমিদারীর কাজে বা পদ্মায় নৌকা সফরকালেও ‘সাধনা’র চাহিদা পূরণে ব্যস্ত থাকতেন। সাধনায় ‘ব্রাহ্মণ’ (ফাল্গুন ১৩০১) ও ‘পুরাতন ভৃত্য’ (চৈত্র ১৩০১)প্রকাশের পরে তৎকালীন কুলীন ব্রাহ্মণ সমাজ কবিতার মর্মবাণীকে মেনে নিতে পারেননি। এক দিকে ‘সাধনা’ দিয়েই পাঠকসমাজ যেমন লেখক রবীন্দ্রনাথকে চিনেছিল তেমনই ‘সাধনা’ সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি সাহিত্যের একটি অভিনব ধারার প্রবর্তন করেছিলেন।
চিত্র, সাহিত্য, কাব্য, নাটক, সংগীত বিবিধ সৃজন ক্ষেত্রে ঠাকুর পরিবারের এক বিরল প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। তিনি চেয়েছিলেন ঠাকুরবাড়ি থেকে একটি পত্রিকা প্রকাশ হোক। তাঁর ইচ্ছেকে মর্যাদা দিয়ে ‘ভারতী’-র আবির্ভাব। এই পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ দুটি ধারার প্রবর্তন করেছিলেন। এক, সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সমাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে প্রবন্ধ লিখে জাতীয় ভাবনা সুনির্দিষ্ট পথে প্রবাহিত করা এবং একই সঙ্গে, সাহিত্যের মাধ্যমে পাঠকের মনোরঞ্জন। সমাজ ও দেশের কাছে একজন সম্পাদকের যে দায়বদ্ধতা তা ‘ভারতী’ সম্পাদনা করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন।

আরও পড়ুন -  শুভদীপ রায়ের দুটি কবিতা

রবীন্দ্রনাথ যখন ‘ভারতী’-র সম্পাদক, সে সময় ভারতীয় রাজনীতি ছিল চূড়ান্ত অস্থির। বাল গঙ্গাধর তিলকের গ্রেফতারি, আয়ার্স্টের হত্যাকাণ্ড, শিবাজীর দেশপ্রেম, হিন্দুমেলার বর্ধিত কার্যকলাপ, প্লেগের আবির্ভাব, চরমপন্থী মতবাদের উত্থান, পুনাতে গোবধ নিবারণী সভা প্রতিষ্ঠা, গণদেবতার পূজার ব্যাপক প্রচলনের সর্বজনীন রূপ, ইংরেজদের দিয়ে জনমত ও সংবাদপত্র প্রতিরোধ প্রচেষ্টাসহ নানাবিধ কার্যকলাপে ভারতীয় রাজনীতি উত্তাল হয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কলমের মাধ্যমে এসব নিয়ে দারুণ ভাবে লেখালেখি করেছিলেন। বলা যায় সময়ের প্রেক্ষিত রবীন্দ্রনাথকে সুসম্পাদক হিসাবে যোগ্য আসনে বসিয়েছিল।
রামমোহন রায় প্রবর্তিত ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে একটি সভা প্রতিষ্ঠা হয়েছিল যার নাম ছিল ‘তত্ত্বরঞ্জিনী’। পরে নাম পরিবর্তন করে সভার নাম রাখা হয় ‘তত্ত্ববোধিনী’। ১৮৪৩ সালের ১৬ আগস্ট অক্ষয়কুমার দত্তের সম্পাদনায় সভার মুখপত্র রূপে প্রথম প্রকাশিত হয় তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর । বেদান্ত-প্রতিপাদ্য ব্রহ্মবিদ্যার প্রচার পত্রিকার মুখ্য উদ্দেশ্য হলেও জ্ঞান-বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজতত্ত্ব ও দর্শনবিষয়ক রচনাও স্থান পেত পত্রিকার পাতায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাঙালির অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক দিক থেকে স্বাধীনতালাভের উপযুক্ত করে নিজেদের গঠন করার আহ্বান জানিয়ে এই পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হত নিয়মিত। এভাবে তখনকার বাংলার সংস্কৃতি ও সভ্যতার উন্নতিতে তত্ত্ববোধিনী বিশেষ অবদান রেখেছিল।

আরও পড়ুন -  ভেঙে দিল ঢেউ

অক্ষয়কুমারের পরে নবীনচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অযোধ্যানাথ পাকড়াশী, হেমচন্দ্র বিদ্যারত্ন, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ঘুরে ১৩১৮ বঙ্গাব্দে ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। চার বছর তিনি সম্পাদক ছিলেন। দায়িত্ব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ পত্রিকার বিষয় ও লেখক উভয় বিষয়ে পরিবর্তন এনেছিলেন। পত্রিকার আয়তনও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৬ থেকে বেড়ে হয়েছিল ২৪। সম্পাদক রূপে নিজে তো লিখতেনই, সাথে সাথে লিখিয়ে নিতেন দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অজিতকুমার চক্রবর্তী, ক্ষিতিমোহন সেন, জগদানন্দ রায় প্রমুখদের দিয়ে। ব্রাহ্মধর্ম আলোচনার পাশাপাশি সংস্কারমূলক তর্কবিতর্ক ছাপতে শুরু করেছিলেন। যদিও সাহিত্য গুরুত্ব পেয়েছিল সর্বাধিক।

পত্রিকা প্রচারের উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে পত্রিকার পাতায় লেখা হয়েছিল
“গত বৈশাখ মাস হইতে শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় এই পত্রিকার সম্পাদন ভার গ্রহণ করিয়াছেন। পত্রিকা আকার এবং প্রবন্ধ-প্রাচুর্যে যথেষ্ট পরিমাণে পরিবর্ধিত হইয়া একেবারে নতুন ভাবে বাহির হইতেছে। প্রতিমাসেই শ্রীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শ্রীযুক্ত বিধুশেখর শাস্ত্রী প্রভৃতি বঙ্গ সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম লেখকগণের রচনা এবং সম্পাদক মহাশয়ের সারগর্ভ প্রবন্ধাবলী প্রকাশিত হয়। ইহা ভিন্ন বিশেষজ্ঞদের লিখিত কৃষি, বিজ্ঞান প্রভৃতি নানা বিষয়ের তথ্যপূর্ণ রচনা সকল বাহির হইতেছে।”
তত্ত্ববোধিনীর সম্পাদনার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের সঙ্গে পত্রিকার একটি যোগসূত্র গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এই উদ্দেশ্যে নতুন বিভাগ খুলেছিলেন ‘ব্রহ্ম বিদ্যালয়/আশ্রমকথা’। একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই সময় বিশ্বভারতীতে একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ব্রাহ্মণ ছাত্রগণ, অব্রাহ্মণ শিক্ষকদের প্রণাম করবে কি না, তাই নিয়ে নানা কথা উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট ভাষায় প্রণামের সমর্থনে মত দিয়েছিলেন এবং সেই মতামত তত্ত্ববোধিনীতে প্রকাশিত হয়েছিল। পত্রিকা যাতে শুধু ব্রাহ্ম সমাজের মুখপত্র না থাকে, তার জন্য তিনি চেষ্টায় ত্রুটি রাখেননি। এখানেই তাঁর লেখা ‘জনগণ মন অধিনায়ক জয় হে’ প্রথম প্রকাশিত হয়, যা পরবর্তী কালে দেশের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পায়। সব দিক থেকে তাঁর সম্পাদনায় তত্ববোধিনী একটি নতুন গতি লাভ করেছিল। চার বছর ব্যপী সম্পাদনা সময়ে তত্ববোধিনী ধর্মের বেষ্টনী ছাড়িয়ে সমকালীন সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিল।

আরও পড়ুন -  কবির শরীর - ১০

(চলবে)