স্বদেশ-সম্পাদনা-রবীন্দ্রনাথ

226
Advertisement

✍️কলমে: অরূপম মাইতি

Advertisement

( পর্ব –১১)

Advertisement
Advertisement

এলাহাবাদের দ্য পাইওনীয়ার, দ্য বাঙ্গালী প্রমুখ পত্রিকা কার্জনের বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে সম্পাদকীয় লেখার পর থেকে একটু একটু করে বিক্ষোভ আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করেছিল। তাতে রীতিমত বিরক্ত হয়ে কার্জন ১৯০৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ভারতসচিব ব্রডরিককে লিখলেন, ‘বাঙালীরা নিজেদের একটা মহা জাতি মনে করে এবং তারা এমন একটা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে যখন দেশ থেকে ইংরেজরা বিতাড়িত হয়েছে এবং জনৈক ‘বাবু’ কলকাতার লাট-প্রাসাদে অধিষ্ঠিত। এই সুখ-স্বপ্নের প্রতিকূল যে-কোনও ব্যবস্থা তারা নিশ্চয়ই ভীষণভাবে অপছন্দ করবে। আমরা যদি দুর্বলতাবশত: তাদের হট্টগোলের কাছে নতি স্বীকার করি তবে কোনও দিনই আর বাংলার আয়তন হ্রাস বা বাংলা ব্যবচ্ছেদ সম্ভব হবে না। আপনি ভারতবর্ষের পূর্ব-সীমান্তে এমন একটা শক্তিকে সংহত ও সুদৃঢ় করবেন যা এখনই প্রচণ্ড, এবং ভবিষ্যতে যা সুনিশ্চিতভাবেই ক্রমবর্ধমান অশান্তির উত্‍স হয়ে উঠবে।

ইংরেজ প্রশাসন ভয় পাচ্ছিল না জানি উনিশ শতকের জাগরণ, ইউরোপীয় সাহিত্য-সংস্কৃতি-দর্শন-বিজ্ঞান-ইতিহাসের উদার পাঠ এদেশের মানুষের চেতনার বন্ধ দরজায় আঘাত হানছে। রাজনীতি আর বিশিষ্টজনদের মধ্যে আটকে থাকছে না। প্রজাদের মধ্যেও অধিকারবোধ জাগ্রত হচ্ছে। বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা সফল করতে কার্জন পূর্ববঙ্গ সফরে বেরোলেন। ঢাকায় নবাব সলিমুল্লাহকে এক লক্ষ পাউন্ড ঋণ দিলেন এবং নব্য জাতীয়তাবোধকে খতম করতে তাঁকে হাতিয়ারে পরিণত করলেন। সেদিনই পরোক্ষে পাকিস্তান নামক এক দেশের ভাবনা প্রোথিত হয়। অন্য দিকে পরাক্রমী হিন্দু নেতাদের মধ্যেও প্রভূত পরিমাণে বিতৃষ্ণার জন্ম হয়। ১৯০৪ সালে রংপুর, বগুড়া ও পাবনা অন্তর্ভুক্ত হয় হস্তান্তরযোগ্য জেলার তালিকায় এবং তার পাঁচ মাস পরে রাজশাহী, দিনাজপুর, মালদহ, জলপাইগুড়ি ও কুচবিহারকেও হস্তান্তরের জন্য সুপারিশ করা হয়। তবে এসব এত গোপনে হচ্ছিল যে প্রস্তাব পরিত্যক্ত হয়েছে ভেবে গণবিক্ষোভও স্তিমিত হয়ে আসে।
এ ছিল কার্জনের একটি কৌশল। এর পিছু পিছু, বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনকে সামনে রেখে শিক্ষাক্ষেত্রেও, কার্জন এমন কিছু সংকোচনমূলক সুপারিশ গ্রহণ করেছিলেন যে কমিশনের অন্যতম সদস্য ডঃ গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় রিপোর্টের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে স্বতন্ত্র প্রতিবাদী মন্তব্য পেশ করেন। আগস্টের গোড়ায়, কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হলে দেশ জুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়।

এসব কিছুর পরিপ্রেক্ষিতে সে বছরের জুন মাসে ‘নবপর্যায়ে বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় দীনেশচন্দ্র সেনের সাহিত্য নিয়ে আলোচনার সূত্রে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘বিলিতি ইউনিভার্সিটির ব্যয়বহুল আয়োজন দেশীয় জীবনযাত্রার জন্য সংগতিপূর্ণ নয়। আমাদের সমাজ শিক্ষাকে সুলভ করিয়া রাখিয়াছিল—দেশের উচ্চনিচ্চ সকল স্তরেই শিক্ষা নানা সহজ প্রণালীতে প্রবাহিত হইতেছিল। কিন্তু বিলিতি আদর্শে শিক্ষা যদি দুর্মূল্য হয় তবে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান অত্যন্ত বৃহৎ হয়ে উঠবে। হৃদয়ে হৃদয়ে যেখানে স্পর্শ নাই, যেখানে সুস্পষ্ট বিরোধ ও বিদ্বেষ আছে, সেখানে দৈববিড়ম্বনায় যদি দানপ্রতিদানের সম্বন্ধ স্থাপিত হয় তবে সে-সম্বন্ধ হইতে শুধু নিষ্ফলতা নহে, কুফলতাও প্রত্যাশা যায়। জাপানের মতো সুযোগ ও আনুকূল্য পেলে সহজেই ভারতীয়রা সেই শিক্ষা আয়ত্ত করতে পারে।‘ এই প্রসঙ্গে জগদীশ চন্দ্র বোস ও প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষের উল্লেখ করে তিনি এও বলেছিলেন, ‘এ স্থলে আমাদের একমাত্র কর্তব্য, নিজেরা সচেষ্ট হওয়া। আমাদের দেশে ডাক্তার জগদীশ বসু প্রভৃতির মতো যে-সকল প্রতিভাসম্পন্ন মনস্বী প্রতিকূলতার মধ্যে থাকিয়াও মাথা তুলিয়াছেন, তাঁহাদিগকে মুক্তি দিয়া তাঁহাদের হস্তে দেশের ছেলেদের মানুষ করিয়া তুলিবার স্বাধীন অবকাশ দেওয়া; অবজ্ঞা-অশ্রদ্ধা-অনাদরের হাত হইতে বিদ্যাকে উদ্ধার করিয়া দেবী সরস্বতীর প্রতিষ্ঠা করা; জ্ঞানশিক্ষাকে স্বদেশের জিনিস করিয়া দাঁড় করানো; আমাদের শক্তির সহিত, সাধনার সহিত, প্রকৃতির সহিত তাহাকে অন্তরঙ্গরূপে সংযুক্ত করিয়া তাহাকে স্বভাবের নিয়মে পালন করিয়া তোলা।’
বঙ্গভঙ্গ, ইউনিভার্সিটি বিল ও দেশের কথা এই তিনটি সাময়িক প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঐক্য ও আত্মশক্তির কথা বলেছিলেন। একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আকারে সেই ভাবনা তিনি তুলে এনেছিলেন ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধে।

(ক্রমশঃ)