পাথরের বেদী

76

✒️কলমে: তথাগগত চক্রবর্তী

বেলার দিকটায় আজকাল আর তেমন বেরোননা বিনয়বাবু। শুধু ঐ পেনশানের দিনটি ছাড়া। তবে আজ বেরিয়েছিলেন। ফিরলেন যখন, ঘড়ির কাঁটা দুপুর দুটোর ঘর ছাড়িয়েছে। ঘরে এসে জামা প‍্যান্ট ছেড়ে একটা গামছা পরে পাখার নীচে বসলেন তিনি । গিন্নী মলিনাদেবী বললেন”কোথায় গিয়েছিলে গো? এতো দেরী হলো?” উত্তর দিলেননা বিনয়বাবু। শুধু বললেন, “একটু জল দাও তো।” উঠে গিয়ে জলের একটা বোতল এনে স্বামীর সামনে রাখেন তিনি। বোতলের বেশীর ভাগ জলটা ঢকঢক করে খেয়ে ফেলেন বিনয়বাবু। তারপর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে একটা বিড়িতে ফুঁ দিতে দিতে বললেন, “বিকেলের দিকে একটু সময় হবে তোমার? বেরোতে পারবে?” অবাক হয়ে মলিনাদেবী বললেন ‘কোথায়?’ আরাম করে বিড়িটা ধরালেন বিনয়বাবু, তারপর বললেন, ” ঐযে , রাধাবাজারে। ওখানে একটা মার্বেলের দোকান আছে না?” “বেদীটা বানিয়ে দেবে?”–আগ্রহের সঙ্গে বললেন মলিনাদেবী। মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন বিনয়বাবু। বললেন,” ঐ টাকাটা ম‍্যাচিওর করেছে, আজকে তুলে নিয়ে এলাম।” এতোক্ষনে বিনয়বাবুর বাইরে বেরোনোর রহস‍্য সমাধান হলো। মলিনা বললেন, “হ‍্যাঁগো, কত পেলে?” একটু হতাশ ভাবে বললেন বিনয়বাবু–“এই চল্লিশের কাছাকাছি” মলিনা আনন্দে বলে উঠলেন “চল্লিশ হাজার! তাহলে আরামে হয়ে যাবে।”
বিনয় ভট্টাচার্য। ডাক ও তার বিভাগের সিনিয়ার পিওন হিসাবে রিটায়ার করেছেন কয়েক বছর আগে। ছেলেটিকে মানুষ করেছেন, মেকানিকাল ইন্জিনিয়ারিং এ এম টেক। নামী কোম্পানির চাকুরে। হিল্লি দিল্লি ঘুরে বেড়ায়। এখন বোধহয় মথুরার কাছে আছে। ওখানের কি একটা প্রোজেক্টের ইন-চার্জ। বার দুয়েক বিদেশও ঘুরে এসেছে। বাবুকে নিয়ে খুব গর্ব বিনয়বাবুর। সারাজীবন বাবুর উন্নতির কথাটাই ভেবেছেন তিনি। নিজের উন্নতির ব‍্যাপারটা মাথা ঘামাননি। ফলে রিটায়ারমেন্টের সেটেলমেন্ট আর যা কিছু জমানো পুঁজি ছিলো সবকিছু চেঁছেপুঁছে একটা দু কামরার ফ্ল‍্যাট হয়েছে বটে কিন্তু তাকে সাজানোর কথা চিন্তাতেও আসেনি। এদিকে মলিনার খুব সখ ঠাকুরের জন‍্যে একটি শ্বেতপাথরের বেদী বানিয়ে তার ওপর পাথরের রাধা-কৃষ্ণ মূর্তী রাখবেন তিনি। আজ এই টাকাটা পেয়ে এতোদিনের স্বপ্ন পরিনতির পথে।
ভাত খেয়ে একটু দিবানিদ্রার অভ‍্যেসটি হয়েছে বিনয়বাবুর। সাধারনত বিকেলের দিকে উঠে পড়েন। আজ কিন্তু ঘুম ভেঙে দেখলেন, ঘরে টিউবলাইট জ্বলছে। ধড়মড় করে উঠে বসলেন। আরে, আজতো রাধাবাজার যেতে হবে। উঠে দেখলেন মলিনা অলরেডি তৈরী হয়ে নিয়েছেন। একটা নতুন শাড়ী, একটু কায়দা করে বাঁধা চুল, মুখে হাল্কা পাউডারের সামান‍্য রূপটান, বেশ লাগছে–মনে মনে ভাবলেন বিনয়। চোখেমুখে জল দিয়ে এককাপ করে চা খেয়েই বেরিয়ে পড়লেন দুজনে। একটা টোটো নিয়ে সোজা দোকানের সামনে। করুনাময়ী মার্বেলস। বড়ো কাঁচের দরজা। একটু থমকালেন বিনয়বাবু, এটা ঠেলে না টানে। একটু নজর করতেই নজরে পড়লো দরজার ওপরে লেখা আছে USH। বোধহয় বাঁদিকের Pটা উঠে গেছে। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন। ও বাবা, এতো এসি দোকান। ঢুকতেই একটা ঠান্ডা আবহাওয়া অনুভব করলেন তাঁরা। বিনয়বাবু ভাবলেন, দাম বেশী হবে। বড়োলোকের দোকান। কিন্তু যাবেন কোন দিকে? গোটা দোকানটা জুড়ে মার্বেল আর টাইলসের ডিসপ্লে। হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন তাঁরা। হঠাৎই একটি ছেলে এগিয়ে আসে তাঁদের দিকে। একমুখ হেসে বলে”কেমন আছেন মেসোমশাই?” অবাক চোখে তাকিয়ে থাকেন বিনয়বাবু, ছেলেটি কেমন যেন চেনা চেনা, অথচ ঠিক বুঝতে পারলেন না। বাবুর বন্ধু কেউ? ছেলেটি হাসিমুখে বললো–“চিনতে পারছেন না, আমি দেবেশ।” না, তবুও বুঝতে পারেন না বিনয়বাবু। মনে মনে বলেন– দেবেশ, দেবেশ, কই নাতো। আবার একটু হেসে বলে ছেলেটি, “আমি সাধন দত্তের ছেলে”। এবারে মুখ হাঁ হয়ে যায় বিনয়বাবুর–তুমি পোষ্টমাষ্টারবাবুর ছেলে! এই দেখো , আমি তো চিনতেই পারি নি।” হাতের ইশারায় দুটো চেয়ার আনিয়ে নিয়ে ছেলেটি তাঁদের বসতে দিলো। বললো, “বলুন মাসিমা, কি লাগবে”। মলিনাদেবী আমতা আমতা করে বললেন, “আসলে বাবা একটা ঐ পাথরের বেদী তৈরী করবো ঠাকুরের “। বেশতো, দেবেশ বলে, “মাপটা বলুন।” মলিনাদেবী আমতা আমতা করেন, “মাপ, মানে ইয়ে, মাপতো নিয়ে আসিনি” । ইতিমধ‍্যেই কোন অদৃশ‍্য হাতের ইশারায় দুটো ছোট ঠান্ডা পানীয়ের বোতল এসে গেছে দুজনের হাতে। ছেলেটি বললো,” বুঝেছি, শুধু প্ল‍্যানিংটা করেছেন, এইতো”। বিনয়বাবু হেসে বলেন, “একদম ঠিক বলেছো বাবা দেবেশ, আসলে আমাদের আইডিয়াটা ঠিক –“। দেবেশ বলে–“ঠিক আছে, কোন চিন্তা করবেন না, সব ব‍্যবস্থা হয়ে যাবে। আমি নিজে ছেলে পাঠিয়ে দেবো, সে মাপ নিয়ে সমস্ত হিসেব করে এস্টিমেট দিয়ে দেবে। আপনার ঠিকানাটা একটু লিখে দিন তো মেসোমশাই”, বলে একটা রাইটিং প‍্যাড এগিয়ে দিলো। বিনয়বাবু লিখে দিলেন। এবারে দোকানের একটা কার্ড এগিয়ে দিলো দেবেশ। –“এতে আমার মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে। যখনই দরকার পড়বে সোজা রিং করবেন। আপনি আর বাবা একসঙ্গে চাকরী করেছেন এতোদিন। কোন অসুবিধে হবে না।”
একরাশ তৃপ্তি নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এলেন দুজনে। সেই পুরনো দিনের মতো মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে ফুচকা খেলেন কয়েকটা, তারপর টোটো ধরে সোজা ঘরে ফিরে এলেন।
ফিরে এসে বিনয়বাবুর অনুরোধে আর এক প্রস্থ চা শেষ করার আগেই কলিং বেল বাজলো। দরজা খুলে দেখা গেলো একটি রোগা রোগা চেহারার কমবয়সী ছেলে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ধরা বিনয়বাবুর লেখা প‍্যাডের সেই কাগজটা। বললো “দেবেশদা পাঠালেন”।
তারপর প্রায় আধঘন্টা মাপজোক করে প্রশ্ন করলো, কিভাবে হবে বেদীটা। বুঝিয়ে দিলেন মলিনাদেবী। নীচ থেকে তিনটে ধাপ ওপরের দিকে উঠে যাবে, একেবারে ওপরের ধাপে থাকবে মূর্তীটা। ছেলেটি বললো–“মূর্তীটার বেসের মাপ কতো?”আতান্তরে পড়লেন কর্তা-গিন্নী।” না, মানে মূর্তীতো কেনা হয়নি”। ছেলেটি আনমনে বললো, “যদি ষোলো ইন্চি বাই ষোলো ইন্চিও হয়, তাহলে ধাপ শুরু হবে এইখান থেকে”, বলেই মেঝের ওপর পেন্সিলে একটা দাগ দিলো।
বিনয় বাবু জিজ্ঞেস করলেন ,”মোটামুটি ব‍্যাপারটা বুঝেছো তো বাবু, ও ভালো কথা, তোমার নাম কি?” ছেলেটি বললো ‘হরি’। “তা হরি, মোটামুটি কিরকম খরচ হবে বলো তো? মানে এই আন্দাজ আর কি”। হরি একটু চিন্তা করে বললো–“ধরুন যদি চূড়া করেন মন্দিরের মতো, তাহলে তিরিশ মতো লাগবে।” “আর যদি চূড়া বাদ দিয়ে হয়, তাহলে?” চোখমুখ কুঁচকে হরি বললো,” তা ধরে নিন, পঁচিশ মতো। এটা অবশ‍্য আমি আমার রেটটা বললাম, আপনি অন‍্য জায়গাতে রেট নিয়ে ট‍্যালি করতে পারেন”। বিনয় বাবু বললেন ,”মানে কনট্রাক্ট দিলে ঐ রেট, বেশ আর আমি যদি নিজে মাল কিনে দি, তাহলে?” হরি বলে উঠলো–“তাহলে শুধু লেবার চার্জ দেবেন। একজন মিস্ত্রী আর একজন যোগাড়ে লাগবে। সাতশো আর পাঁচশো, মোট বারোশ এক দিনে।” কদিন লাগবে?” এবারে মলিনাদেবী বলেন। হরি বললো–“এটা বলা খুব মুশ্কিল ম‍্যাডাম, এখানে কাজ আছে। প্রথমে মেঝেটা একটু চিপিং করতে হবে, তারপরে কাঠ দিয়ে খাঁচা করে সিমেন্ট দিয়ে ধাপ তৈরী করে তারপরে পাথর লাগাতে হবে। তা, মোটামুটি এক সপ্তাহ তো লাগবেই”। বিনয়বাবু মনে মনে একটা হিসেব করে নিলেন, প্রায় নয় হাজার টাকার কাছাকাছি। মলিনাদেবী বললেন–“বাবারে , সাত দিন! ঘরদোর যা নোংরা হয় না।” হরি বললো, তাহলে স‍্যার, আমি আসি, আপনি মনস্থির করে দেবেশদাকে বলে দেবেন। ও ভালো কথা, দেবেশদা আপনার নম্বরটা চাইছিলো স‍্যার।” নম্বরটা নিয়ে হরি চলে যায়।
রাত্রে খাওয়াদাওয়া সেরে বিড়িতে সুখটান দিচ্ছিলেন বিনয়বাবু। হঠাৎ ফোনটা বাজলো। ওপারে দেবেশ–“মেসোমশাই, সিরাজুল গিয়েছিলো তো, কি ঠিক করলেন?” আশ্চর্য হলেন বিনয়বাবু, ” ওর নামতো বললো হরি!” হাহা করে হাসলো দেবেশ, “এই পাথরের কাজে যারা আছে, প্রায় সবাই মুসলিম। যাকগে, এটা ঠিক করে নিন কন্ট্রাক্ট দেবেন না নিজে করবেন।” বিনয়বাবু বললেন, “কোনটা ভালো হবে বলোত বাবা, আমিতো ঠিক বুঝতে পারছিনা”। “কোন চিন্তা করবেন না, নিজের কাজ সবসময়েই ভালো হয়। বাবাকে আপনার কথা বলছিলাম। এই নিন মেসোমশাই, বাবার সঙ্গে কথা বলুন”
বেশ কয়েক বছর পরে পোষ্টমাষ্টারবাবুর সাথে কথা হলো বিনয়বাবুর । বড়ো ভালো লাগলো। তবে হরির আসল নাম যে সিরাজুল সেটা শুনে ইষৎ ক্ষুন্ন হলেন মলিনাদেবী। “হ‍্যাঁগো, ঠাকুরের পূজোর বেদী বানাবে মুসলমান লোক? এ আবার কি বাবা! আমার বাপের বাড়ীতে ঠাকুরঘরে মুসলমানের ঢোকা নিষেধ ছিলো”। “সে আর কি করবে, যস্মিন দেশে যদাচার”। ঘুমিয়ে পড়লেন বিনয়বাবু।
পরের দিন চা খেতে খেতে মনস্থির করে নিলেন বিনয়বাবু। না কনট্রাক্টে দেবেন না, নিজেই করবেন। খরচা বেশী পড়বে একটু। ও দেখা যাবে। যথা সময়ে দেবেশকে জানিয়ে দিলেন তিনি। দেবেশের কথামতো মার্বেল আর ব‍্যাকগ্রাউন্ডের টাইলস পছন্দ করলেন কর্তা-গিন্নী। দেবেশের দেওয়া ক‍্যাশমেমো দেখে চোখ কপালে উঠলো তাঁদের। প্রায় পঁচিশের কাছাকাছি। তবুও পরোয়া করলেন না বিনয়বাবু। হোক খরচ। মলিনার এতোদিনের ইচ্ছে।
দুটি অত‍্যন্ত কমবয়েসী ছেলে কাজে এলো পরের দিন থেকে। ইরফান ওরফে ভোলা আর হামিদ ওরফে ছোটু। তাদের দেখেইতো মলিনাদেবী বলে উঠলেন–হ‍্যাঁগো, ওদের তো এখনো গোঁফও গজায়নি, ওরা কাজ করবে কিগো।” তবে ছেলে দুটি কাজ করে বটে, একদম মুখ বুজে। কিছু বললেও জবাব দেয় না, শুধু হাসে।
গোলমাল বাঁধলো যখন ওরা খেতে বসলো। বাথরুম থেকে হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে আসতেই প্রথমজন, জবর ধাতানি খেলো মলিনাদেবীর কাছে। “এই ছোঁড়া, কি নাম তোর, ভোলা, সাবান দিয়ে হাত ধুয়েছিস তো? মাথা নেড়ে না বলতেই আবার ধমক-“যা, সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে আয়! সারাদিন ঐ নোংরার মধ‍্যে কাজ করছিস, আগে যা”। ভোলাও মানে মানে তাই করে। ছেলে দুটি দুপুরের খাবার নিয়েই এসেছিলো। টিফিন কৌটো খুলে খেতে বসলো দুজন। আবার উঁকি মারেন মলিনাদেবী, “কি খাবার এনেছিস রে?” ছেলে দুটি লজ্জায় হেসে মুখ নীচু করে। মলিনাদেবী ঝুঁকে দেখেন একজনের কাছে সরষে দিয়ে কি একটা ঝোল মতন, আর বোধহয় চিচিঙ্গা খুব সরু করে কেটে একটা তরকারী। আর একজনের কাছে কাঁচা পিঁয়াজ আর আচার একটু। চিচিঙ্গা বলে যেটাকে সন্দেহ করছিলেন তিনি সেটা আসলে মাছ। খুব ছোট মাছ। ভোলাদের গ্রামের নালাতে গামছা ফেললেই নাকি এই মাছ অনেক ওঠে।
বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে মলিনাদেবীর। এইভাবে কি মানুষ খেতে পারে? “তোরা একটু আস্তে খা তো বাবা”, বলেই অভিজ্ঞ হাতে গ‍্যাস জ্বেলে দুটো ডিমের ওমলেট করে দুটো প্লেটে নিয়ে যান তিনি। ছেলে দুটো আবার হাসে, কিন্তু খেয়ে নেয়।
পরের দিন স্বামীর কাছে অনুযোগ করেন মলিনাদেবী, “হ‍্যাঁগো, পাথরভাঙা পরিশ্রম করে ছেলেদুটো, ভালো করে না খেলে যে শরীর খারাপ হবে ওদের!তুমি একটু ভালো দেখে মাছ নিয়ে এসোতো বাপু”। অভিজ্ঞ বিনয়বাবু বোঝেন, ছেলে দুটো ঠিক ফ‍্যাক্টর নয়, আসলে এ হ’লো মলিনার অতৃপ্ত মাতৃত্বের প্রকাশ। অতএব ভোলা আর ছোটুর মেনুতে রোজই পরিবর্তন হতে থাকে। কোনদিন কাতলার পেটি, কোনদিন চিকেন, ডিম তো আছেই। ছেলেদুটোর কাজ সত‍্যিই অক্লান্ত। চার পাঁচ দিনের মধ‍্যেই প্রথম ধাপের কাজ শেষের মুখে। এইবার একটু একটু বুঝতে পারছেন তাঁরা। ধাপগুলো হচ্ছে আটকোনা। দেখতে অনেকটা ফুলের পাপড়ির মতো। আরো ছোট হয়ে যখন উপরের দিকে উঠবে তখন দারুন দেখতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপ শেষ হবার পরে একদিন ভোলা জিজ্ঞেস করে মলিনাদেবীকে , “ও দাদী, তুমি ওখানে লাইট ফিট করবে না?” ” অবাক হয়ে বলেন মলিনা “লাইট? কোথায় লাইট লাগাবো?” ভোলা বলে, “কেন ঐ বেদীটায়? ঠাকুরের লাইট না লাগালে ঠাকুর যে অন্ধকারে থাকবে দাদী।” তাইতো, এব‍্যাপারটাতো ভেবে দেখেননি তিনি। বিনয়বাবুও এই প্রশ্নের কোন উত্তর দিলেন না। হিসেব করা তিনি ছেড়েই দিয়েছেন। ডেইলি লেবার চার্জ বারোশ থেকে কমে হয়েছে হাজার, দেবেশের বদান‍্যতায় অবশ‍্য। তবুও আটদিন কাজ হয়ে গেলো। এখনো শেষ হলো না। আরও যে কদিন হবে, বুঝতে পারছেন না তিনিও। এরমধ‍্যে আবার লাইট। চুপ করে থাকা ছাড়া উপায় কি?
তবে শুধু লাইটেই ব‍্যাপারটা আটকে থাকলোনা। পাড়ারই কার একটা বাড়ীতে গিয়ে এক নতুন বুদ্ধি ধার করে এনেছেন মলিনাদেবী। শুধু বেদী হলে হবেনা। রাধা-কৃষ্ণ কি বেদীর ওপর থাকবেন? এমা তা হয় নাকি? বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করতে গেলে সিংহাসন লাগবে। পাথরের বেদীর ওপর পাথরের সিংহাসন। তা না হলে অকল‍্যান, অমঙ্গল ইত‍্যাদি প্রভৃতি। বোঝা কমার কোন লক্ষ্মনই নেই।
দশম দিনে গিয়ে কাজ শেষ হলো। মানে তখনো পালিশ বাকী। এদিকে লাইট আর সিংহাসনের দাবী ক্রমে জোরালো হচ্ছে। বিনয়বাবু বুঝতে পারছেন, তিনি এখন কোণঠাসা। ভোলা আর ছোটু আর তাদের দাদীর বিরোধী শক্তি এতোটাই জোরালো যে তাঁর গৃহকর্তার মসনদ টলটলায়মান। এদিকে রাজকোষ ঘাটতির প্রবল সম্ভাবনা। দেশের প্রধানমন্ত্রীর অবস্থাটা এবার হাড়েহাড়ে বুঝতে পারছেন তিনি। তবে তিনি বুর্জোয়া নন, প্রতিক্রিয়াশীলও নন, এটা প্রমান করতে তিনি বদ্ধপরিকর। অতএব সর্বদলীয় বৈঠক ডাকলেন তিনি। তিনি, গিন্নী এবং ভোলা।
সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো আগামীকাল লাইট লাগানো হবে, ভোলারাই সিংহাসন করে দেবে, যেহেতু এটা তারা নিয়মিত করে থাকে। আর লাইট লাগাবে তাদেরই এক বন্ধু নিয়ামৎ, লাইটের ব‍্যাপারে যার স্থান নাকি বাবা বিশ্বকর্মার ঠিক পরেই। বাজেট? নো চিন্তা, আমরা তো আছি দাদু।
শুধু ছোট্ট একটি নিবেদন ,না বিনয়বাবু এই ষড়যন্ত্রের কিছুই জানতে পারলেন না। যে তিনজন কাল আসবে, সেকেন্ড হাফে আসবে। কাজ শেষ করে যাবে। তবে রাত্রে মাংসভাত খেয়ে যাবে। উঁহু, চিকেন নট অ্যালাউড, খাসি।
পরের দিন বাজারে যাওয়ার আগে যেন চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধের মহড়া হয়ে গেলো। মলিনাদেবী বললেন, “শোনো, আজ একটু খাসির মাংস এনে দাওতো। বেশী নয়, এই এককিলো আড়াইশো মতন” লুঙ্গিটা কি ঢিলে হয়ে গেলো? শক্ত করে একটা গিঁট মেরে বিনয়বাবু বললেন–“ও, বেশী নয়, মাত্র এককিলো আড়াইশো! কেন? আমার শ্বশুরকূলের সবাই কি নিমন্ত্রিত নাকি?” শ্বেতপাথরের বেদীর অনারে?” এইবার শুরু হবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ। দীর্ঘ‍্য দাম্পত্য জীবনে বিনয়বাবু জানেন এই একটিমাত্র অস্ত্রেই মলিনাবধ সম্ভব। কিন্তু এমন পাশুপৎ অস্ত্রও কিনা ফেল মারলো। মলিনাদেবী বললেন, “থামোত তুমি, ছেলেগুলোর পাতে একটু করে মাংস দেবো না শুধু ঝোল দেবো? যা বলছি করো। ” সাবধানে পুরো ব‍্যাপারটা বুঝে নিয়ে ব‍্যাজার মুখে বাজার চললেন তিনি। না, রাজকোষ ঘাটতি অনিবার্য।
সেদিন দুপুরের পর থেকে ঘরে সে এক মারাত্মক অবস্থা। রাজা দক্ষের যজ্ঞস্থলে এমনই একটা ক‍্যাওস হয়েছিলো বোধহয়। এদিকে মার্বেল পালিশের ঘড়ঘড়, ওদিকে লাইট মিস্তিরির ঠ‍্যাক ঠ‍্যাক, কখনো দেয়ালে ড্রিল করার মারাত্মক আওয়াজ, সারা ঘরে ধূলোয় ধূলো–বিনয়বাবুর মাঝে মাঝে ভূল হচ্ছিলো নিজের ঘরে আছেন না তাকে কেউ হিটলারের কনসেনট্রেশন ক‍্যাম্পে পাঠিয়েছে। এই নিদারুন পরিস্থিতিতেও ভোলা ঘরের এককোনে বসে বসে কিছু টুকরো মার্বেল দিয়ে একমনে কাজ করে চলেছে। যাক একসময়ে এই দুস্বপ্নের রাত্রি, থুড়ি, সন্ধ্যা শেষ হলো। ছেলেগুলো সমবেত ভাবে ঘরটা পরিষ্কার করার পরে একটু স্বস্তি পেলেন বিনয়বাবু। ঘড়িতে তখন মাত্র রাত্তির দশটা।
এবারে খাওয়াদাওয়ার পালা। এবং হিসেব চুকানোর। বিনয়বাবু তিনজনকেই ডাকলেন। হাত পা মুখ ধুয়ে এসে ভোলা তাকে অগ্রাহ‍্য করে সোজা ঢুকে গেলো রান্নাঘরে। “ব‍্যাটা, পয়সা পেমেন্ট করবো আমি আর যতো ষড়যন্ত্র দাদীর সঙ্গে! দাঁড়া ব‍্যাটা, তোর দেখাচ্ছি মজা।”
মজাটা কিন্তু তাকেই দেখিয়ে দিলো ছেলে তিনটে। পালিশ করা আর সিংহাসন তৈরী করার জন‍্যে একটা পয়সাও এক্সট্রা নিলো না ভোলা আর ছোটু। আর লাইট মিস্ত্রী নিয়ামতের ডিমান্ড মোটে তিনশো টাকা, শুধু লাইটের দাম। যেহেতু ভোলা তার ভাই এবং ভাইয়ের দাদীর জন‍্যে কাজ করেছে সে, ওর বেশী নিতেই পারবেনা সে।
ওদিকে মলিনাদেবী এককিলো আড়াইশো মাংস তিনটে চারবাটির টিফীনকৌটোয় সমানভাবে ভাগ করতে ব‍্যস্ত। ছেলেগুলো ভাত খাবেনা। অনেক রাত্তির হয়ে গেছে। তাই টিফিনবাটিতে শুধু মাংসটা যদি দাদী দিয়ে দেন। নিজেদের জন‍্যে আর কিছুই রাখলেন না মলিনাদেবী। ত়ার স্বামী মাংসাশী নন্, তিনিও এটা খুব পছন্দ করেননা। ঐ প্রেসার কুকারে একটু আলু সেদ্ধ করে নিলে আজকের রাতের মতো বুড়োবুড়ির হয়ে যাবে। আর তাছাড়া ভাত যখন খাবেনা ছেলেগুলো, মাংসতো একটু বেশী দিতেই হবে।
সব গুছিয়ে ছেলেগুলো যখন বেরলো, তখন পাক্কা পৌনে এগারোটা। যাবার আগে ভোলা শেষবারের মতো বললো–“সিংহাসনটা কিন্তু চব্বিশ ঘন্টা একদম হাত দেবেনা দাদী। কাল সন্ধ‍্যের পরে ওটা শক্ত হয়ে যাবে ।” মলিনাদেবী বললেন–“তোরা সাবধানে যাস বাবা”। বাইকে স্টার্ট দেওয়ার শব্দ আর মলিনাদেবীর দুগ্গা দুগ্গা মিলিয়ে একাকার হয়ে গেলো।
বিনয়বাবু দরজায় তালা দিতে দিতে মলিনাদেবী চট করে দুটো বড়ো বড়ো আলু হকিন্সে বসিয়ে গ‍্যাস জ্বেলে দিলেন। এইবার কর্তা-গিন্নী এসে দাঁড়ালেন বেদীটার সামনে। সত‍্যি অপূর্ব হয়েছে। আটকোনা করে ধাপগুলো যেন একটা ফুলের পাপড়ির মতো ছোট হতে হতে উঠে গেছে ওপরের দিকে। ধাপগুলোর মাঝখান দিয়ে একটা টকটকে লাল মার্বেলের পথ নেমে এসেছে ওপর থেকে নীচে, যেন এই পথ দিয়েই রাধামাধব হেঁটে উঠবেন। একদম ওপরের ধাপে সিংহাসন, যেটিতে চব্বিশ ঘন্টার কারফিউ বলবৎ আছে। এবারে লাইটটা জ্বালালেন বিনয়বাবু, সাবধানে। ঘরের আলো নিভিয়ে দিলেন। তিনদিক থেকে তিনটে রঙের আলো পড়ছে সিংহাসনের ওপর। একেবারে দারুন মোহময় পরিবেশ। তাকিয়ে থাকতে থাকতে মলিনাদেবী ভাবছিলেন,–ঠাকুর, সিংহাসন তো তৈরী করলে, তুমি কবে আসবে ঠাকুর! সময় যে আর বেশী নেই। দুচোখ জলে ভরে এলো তাঁর। আর বিনয় বাবু ভাবছিলেন, কতোদিন ধরে তিলতিল করে রেকারিংএ যে সন্চয়টা করেছিলেন তিনি, একটা মাত্র শ্বেতপাথরের বেদী করতে তার প্রায় পুরোটাই শেষ হয়ে গেলো। এখনো রাধা-কৃষ্ণের মূর্তী কেনা বাকি। দেখা যাক, কিভাবে ম‍্যানেজ করা যায়। এতোদূর যখন এগিয়েছেন, পিছিয়ে যাওয়া যায় না।
হকিন্সের সুতীব্র বাষ্পীয় আওয়াজ জানিয়ে দিলো আলু সেদ্ধ হয়ে গেছে।

পাথরের বেদী 1
আরও পড়ুন -  রাধাসায়র -২১